
নিরাপত্তাকৌশল যাতে সরকারপ্রধানকে জনগণের কাছ থেকে দূরে ঠেলে না দেয়, সেদিকে বিশেষভাবে লক্ষ রাখতে প্রেসিডেন্ট গার্ড রেজিমেন্টের (পিজিআর) সব কর্মকর্তার প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
আজ রোববার দুপুরে ঢাকা সেনানিবাসে পিজিআরের ৫১তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানে এ কথা বলেন প্রধানমন্ত্রী।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘গণতান্ত্রিক সরকারের প্রধান হিসেবে আমি জনগণের বিশ্বাস এবং ভালোবাসার ওপর আমার আস্থা ও নির্ভরতা বজায় রাখতে চাই। সুতরাং নিরাপত্তাকৌশল যাতে সরকারপ্রধানকে জনগণের কাছ থেকে দূরে ঠেলে না দেয়।’
তারেক রহমান বলেন, ‘নিরাপত্তাকৌশল এমনভাবে বিন্যাস করা জরুরি, জনগণ যাতে নিজেদের সরকারপ্রধান থেকে বিচ্ছিন্ন মনে না করেন। সেদিকে বিশেষভাবে লক্ষ রাখার জন্য আমি আপনাদের প্রতি বিশেষভাবে আহ্বান জানাই।’
প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, ‘সেনাবাহিনী থেকে বিশেষভাবে নির্বাচিত, প্রশিক্ষিত সদস্যরা এ রেজিমেন্টে দায়িত্ব পালনের জন্য নির্বাচিত হয়ে থাকেন। আপনাদের কার্যক্রমের মাধ্যমেই পিজিআরের দক্ষতা ও একনিষ্ঠতা ফুটে উঠবে, এটি আমার প্রত্যাশা।’
পিজিআরের কাজটি অবশ্যই চ্যালেঞ্জিং উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘এর কারণ রাষ্ট্রঘোষিত অতি গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিবর্গের নিরাপত্তা প্রদানের পাশাপাশি বিভিন্ন রাষ্ট্রীয় আনুষ্ঠানিকতার দায়িত্ব পালন করাও আপনাদের অন্যতম কর্তব্য। এ দায়িত্ব পালনে আপনাদের নানা রকমের পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয়। এসব দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে আপনাদের বিশ্বস্ততা, দায়িত্ববোধ এবং কর্তব্যপরায়ণতা আপনাদের নিঃসন্দেহে একটি সুশৃংঙ্খল বাহিনী হিসেবে পরিচিত করেছে।’
সুশৃঙ্খলতার স্বীকৃতিস্বরূপ পিজিআর চলতি বছর ‘ন্যাশনাল স্ট্যান্ডার্ড’ পুরস্কারের জন্য মনোনীত হয়েছে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘একটি বাহিনী হিসেবে এটি অবশ্যই আপনাদের জন্য অত্যন্ত গৌরবের। এই সাফল্যের জন্য আমি আপনাদের আবারও অভিনন্দন জানাই। যেকোনো প্রতিকূল পরিস্থিতিতেও আপনাদের ইস্পাতকঠিন দায়িত্ববোধ অবশ্যই প্রশংসনীয়।’
সশস্ত্র বাহিনীকে জনগণের সাহস এবং একটি দেশের গৌরবের প্রতীক উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেন, ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে সশস্ত্র বাহিনীর সাহসী ভূমিকা সেনাবাহিনীকে বাংলাদেশের গৌরবময় ইতিহাসের সঙ্গে অবিচ্ছিন্ন এবং অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িয়ে ফেলেছে। তিনি বলেন,‘আমি বিশ্বাস করি, সশস্ত্র বাহিনী যদি দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ থেকে কঠোর নিয়মানুবর্তিতা অনুসরণ এবং পেশাদারত্ব বজায় রাখে, তাহলে দেশের সার্বভৌমত্ব আর কখনো হুমকির মুখে পড়বে না।’
পিজিআরের প্রতি প্রত্যাশা রেখে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আমি আশা করব, পিজিআরের মতো বিশেষায়িত বাহিনীর সর্বোচ্চ সফলতার জন্য আধুনিক নিরাপত্তাকৌশল এবং প্রযুক্তিগত দক্ষতা অর্জনের পাশাপাশি প্রতিটি সদস্যের সাহস, সততা, বিশ্বস্ততা, সর্বোচ্চ পেশাদারত্ব, নিয়মানুবর্তিতা এবং সর্বোপরি “চেইন অব কমান্ড” অনুসরণ—এ বিষয়গুলো কঠোরভাবে মেনে চলা অপরিহার্য।’
একটি বিশেষায়িত বাহিনী হিসেবে সাহস, দক্ষতা, কৌশল এবং সর্বাধুনিক প্রযুক্তিতে পিজিআরেরও পিছিয়ে থাকার সুযোগ নেই উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, যেকোনো বাহিনীর সামনে প্রচলিত চ্যালেঞ্জের বাইরেও বর্তমানে আর্থসামাজিক ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতি এবং তথ্যপ্রযুক্তির অবাধ বিকাশের ফলে বহুমাত্রিক নিরাপত্তা–চ্যালেঞ্জ তৈরি হয়েছে। তাই তো সাইবার যুদ্ধ, ইলেকট্রনিক ওয়ারফেয়ার, ড্রোনযুদ্ধ কিংবা তথ্যযুদ্ধ এসব নতুন নতুন ক্ষেত্রগুলো উপেক্ষা করার সুযোগ নেই।
এসব বহুমাত্রিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় শুধু পিজিআরই নয়, প্রতিটি বাহিনীকেই আধুনিক ও যুগোপযোগী প্রশিক্ষণের মাধ্যমে নিজেদের সার্বক্ষণিক প্রস্তুত রাখা জরুরি বলে মন্তব্য করেন প্রধানমন্ত্রী।
তারেক রহমান বলেন, ‘সশস্ত্র বাহিনীর পাশাপাশি পিজিআর কিংবা এসএসএফের মতো সফিস্টিকেটেড বাহিনীগুলোকে সরকার আরও আধুনিকায়নের পরিকল্পনা নিয়েছে। এ বিষয়ে যথানিয়মে পদক্ষেপ গ্রহণ করা হচ্ছে।’
বক্তব্যের শুরুতে শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানকে স্মরণ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘রাষ্ট্রপতি এবং রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তির নিরাপত্তায় ১৯৭৫ সালের এই দিনে প্রথমে “রাষ্ট্রপতির দেহরক্ষী ইউনিট” নামে একটি নতুন রেজিমেন্ট আত্মপ্রকাশ করেছিল। পরবর্তীকালে তৎকালীন সেনাবাহিনীর প্রধান মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমান ১৯৭৫ সালের ১৯ সেপ্টেম্বর “রাষ্ট্রপতির দেহরক্ষী ইউনিট”কে “প্রেসিডেন্ট গার্ড রেজিমেন্ট” হিসেবে নামকরণ করেন। নতুন এ নামকরণ রেজিমেন্টের কার্যক্রমকে আরও দৃঢ় ও গতিশীল করতে ইতিবাচক প্রভাব রাখে।’
পিজিআরের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর এই দিনে নিজের জীবনের সবচেয়ে শোকাবহ এবং হৃদয়বিদারক ঘটনার কথা তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আমার পিতা বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষক প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের শাহাদাতের কথা মনে পড়ছে। ১৯৮১ সালের ৩০ মে চট্টগ্রাম সার্কিট হাউসে প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের শাহাদাতবরণের সময় কর্তব্য পালনরত পিজিআরের কয়েকজন সদস্যও শহীদ হয়েছিলেন। আজকের এই বিশেষ দিনে আমি পিজিআরের সেই শহীদদের গভীর শ্রদ্ধায় স্মরণ করছি। আল্লাহর দরবারে তাঁদের আত্মার মাগফিরাত কামনা করছি।’
প্রধানমন্ত্রী বলেন, দায়িত্ব পালনের সময় তাঁদের নির্মম মৃত্যুর মাধ্যমে রাষ্ট্র ও সরকারপ্রধানের নিরাপত্তার প্রতি অটল আনুগত্য, কর্তব্যপরায়ণতা এবং জীবন উৎসর্গের যে চূড়ান্ত দৃষ্টান্ত উপস্থাপিত হয়েছে, এটি অবশ্যই পিজিআরের সদস্যদের জন্য একটি দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে।
অনুষ্ঠানে যোগ দিয়ে প্রধানমন্ত্রী কেক কেটে প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর উদ্বোধন করেন। তিনি পিজিআর সদর দপ্তরে একটি গাছের চারা রোপণ করেন। এ সময় তিনি চট্টগ্রামে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের সঙ্গে শহীদ হওয়া পাঁচ পিজিআর সদস্যের পরিবারের খোঁজ নেন এবং তাঁদের সঙ্গে কুশল বিনিময় করেন।
প্রতিবছর ৫ জুলাই প্রেসিডেন্ট গার্ড রেজিমেন্টের ( পিজিআর) প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী পালিত হয়। ১৯৭৫ সালের এই দিনে স্বাধীন বাংলাদেশে রাষ্ট্রপতির নিরাপত্তা ও প্রটোকল নিশ্চিত করতে বিশেষায়িত এই বাহিনী গঠিত হয়। ঢাকা সেনানিবাসে পিজিআর সদর দপ্তরে বার্ষিক দরবার ও সুসজ্জিত কুচকাওয়াজের মাধ্যমে দিনটি উদ্যাপন করা হয়।
পিজিআর মূলত বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর একটি বিশেষায়িত ইউনিট। এটি বঙ্গভবনে মহামান্য রাষ্ট্রপতির দৈনন্দিন নিরাপত্তা ও অন্যান্য সামরিক দায়িত্ব পালন করে।