‘আগস্ট আবছায়া’ থেকে

১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের হত্যাকাণ্ডের ঘটনাকে কেন্দ্র করে রচিত হয়েছে মাসরুর আরেফিনের প্রথমা প্রকাশন প্রকাশিত উপন্যাস আগস্ট আবছায়া। এই উপন্যাস থেকে তুলে ধরা হলো বঙ্গবন্ধুর হত্যাকাণ্ডের সেই মুহূর্তকে।

দরজার পাল্লা গিয়ে পড়েছে আলমারির ওপর, আলমারিভর্তি জিনিস ঝনঝন করে পড়েছে ঘরের মেঝেতে। বঙ্গবন্ধুর কান খাড়া হলো। তিনি সব বুঝলেন, তিনি অদৃশ্য ও অনুপস্থিত কাউকে—সম্ভবত শেখ রেহানাকে—বললেন, ‘ওরা কী চায় আমারে দেখতে দাও।’ এরপর হুদার দিকে তাকালেন তিনি, বললেন, ‘তাহলে এসব তুমিই করছ? কী চাও তুমি?’ হুদা বলল, ‘আমরা আপনাকে নিতে এসেছি, আপনি অ্যারেস্টেড। সঙ্গে চলুন।’ এ কথা বলেই হুদা হঠাৎ দৌড়ে নিচে নেমে গেল। সিঁড়ির নিচে বারান্দায় এসে সে নিজে নিজে বলতে লাগল, ‘আমি পারছি না, আমি পারছি না।’ দৌড়ে নূর তার পাশে এসে দাঁড়াল, হাত রাখল, তার কাঁধ ধরে তাকে জোর ঝাঁকি দিল একটা, বলল, ‘কামালকে পারলা আর এই শয়তানটারে পারছ না? মানে কী?’ আবার তারা দুজন ছুটে ওপরে চলে এল। হুদা বঙ্গবন্ধুর কাছে পৌঁছে গেছে। হুদা চিৎকার করে উঠল, ‘মুহিউদ্দিন, ফায়ার।’ মুহিউদ্দিন তখনো বিড়বিড় করে বলছে, ‘স্যার, আপনি আসুন।’ নূর সিঁড়ির ল্যান্ডিংয়ে, নূরের পাশে রিসালদার মোসলেম উদ্দিন, তার পাশে রিসালদার সারওয়ার, তাদের দুজনের পেছনে সুবেদার মেজর ওয়াহাব জোয়ারদার। নূর মোসলেমকে জিজ্ঞাসা করল, ‘মুহিউদ্দিন ওনাকে স্যার স্যার করে কথা বলছে কেন? সমস্যা কী?’ দেখলাম বঙ্গবন্ধু মুহিউদ্দিনকে গালাগালি করছেন, বলছেন, ‘শুয়ারের বাচ্চারা, তোরা আমার বাসায় কেন? তোদের এত বড় আস্পর্ধা কোত্থেকে এল? আমার বউ-ছেলে–মেয়ে থাকে এইখানে। এত বড় সাহস তোদের?’ মুহিউদ্দিন তখন আবার বলল, ‘স্যার, আপনি আসুন।’ বঙ্গবন্ধু এবার বললেন, ‘তোরা কামালকে মেরে ফেলছিস, তাই না? তোদের এত বড় সাহস? আমার বাসায়? আমার সিঁড়িতে তোরা? তোরা কী চাস? তোরা কী করতে চাস?’ মুহিউদ্দিনকে ধাক্কা মেরে সিঁড়ির পাশের দেয়ালে ঠেলে দিল হুদা। সে বঙ্গবন্ধুর মুখের সামনে, বঙ্গবন্ধুর দুই সিঁড়ি নিচে দাঁড়িয়ে এবার বলল, ‘আমি আপনাকে নিয়ে যেতে এসেছি।’ 

বঙ্গবন্ধু প্রচণ্ড রেগে গেলেন, তাঁর সব ভয় ওই রাগের সঙ্গেই অদৃশ্য হয়ে গেল। হঠাৎ ঘুম থেকে জেগে উঠলেন যেন তিনি, হুদাকে বললেন, ‘তুই আমারে মারতে চাস? কামাল কই? তোরা কামালরে কী করছিস?’ হুদা পাগলের মতো চিৎকার করে উঠল, তার বাঁ হাত তখন মুহিউদ্দিনের ঘামে ভেজা পিঠের ওপর, তার নিজের কপাল থেকে তখন ঘাম বেয়ে পড়ছে, ঢুকে যাচ্ছে সোজা তার চোখের ভেতরে। সে বলল, ‘কামাল তার জায়গাতেই আছে। আপনি আমাদের তুই তুই করে বলবেন না। আপনি বন্দী। আপনি চলেন।’ এবার বঙ্গবন্ধু সিঁড়িতে এক ধাপ নেমে ডান হাত তুলে ধাক্কা দিলেন হুদার বুকে, খুব জোরে নয়, খুব আস্তেও নয়। হুদা একমুহূর্তের জন্য পাশে পড়ল, মুহিউদ্দিনের গায়ের ওপর। বঙ্গবন্ধু গর্জন করে উঠলেন সিঁড়িঘর কাঁপিয়ে, এত জোরে যে আমি ভয় পেয়ে গেলাম, আমি, যে কিনা ওখানে নেই। তিনি বললেন, ‘কী? তোদের এত সাহস? পাকিস্তান আর্মি আমারে মারতে পারে নাই। আমি বাঙালি জাতিরে ভালোবাসি। বাঙালি আমারে ভালোবাসে। আমাকে কেউ মারতে পারে না। তোরা আমারে মারতে পারিস না। তোরা এই সব করিস না। তোরা ভুল পথে আছিস, তোদেরে কেউ ভুল বুঝাইছে। তোরা ভদ্রলোকের বাসায় বেডরুমে ঢুকে গেছিস ভোররাতে? তোরা আমাদের আর্মি, তোরা দেশ রক্ষার হাতিয়ার।’ এর পরের কথাগুলো স্পষ্ট বোঝাও যাচ্ছে না। চিৎকার বেশি। কথার মাঝে মাঝে চিৎকার—মা, চিৎকারের মধ্যে কথা। তিনি চিৎকার করছেন, সিঁড়ির আরও কেউ কেউ চিৎকার দিচ্ছে, মাতাল রিসালদার মোসলেম তুমুল চিৎকার করে বলছে, ‘থামেন, থামেন, অনেক শুনছি।’ 

বঙ্গবন্ধু একনাগাড়ে বলা কথাগুলো থামালে হুদা বলল, ‘এসব নাটকীয় কথাবার্তা রাখেন। আপনি চলেন আমার সঙ্গে। আপনি বন্দী।’ এতগুলো কথা বলে বঙ্গবন্ধুর যেন শক্তি শেষ। তিনি এবার শান্ত ও ক্লান্ত গলায় বললেন, ‘এইভাবে নিয়ে যেতে চাস? আমারে পাইপের তামাক নিতে দে।’ এটুকু বলেই তিনি উল্টো দিকে ঘুরলেন। হুদা তাঁর পেছন পেছন যাচ্ছে। মুহিউদ্দিনও সঙ্গে যাচ্ছে। নূর, মোসলেম, সারওয়ার সিঁড়ির মাঝখানের ল্যান্ডিংয়ে ওভাবেই দাঁড়িয়ে। স্থির। নূর শুধু চেঁচিয়ে বলল, ‘কোনো ফোন যেন না করতে পারে।’ 

বঙ্গবন্ধু এখন তাঁর বেডরুমে। হুদা হাতে নিল তাঁর এরিনমোর তামাকের কৌটা ও পাশে রাখা দেশলাই বাক্স। বেডরুমে মাত্র তিনজন—বঙ্গবন্ধু, হুদা ও মুহিউদ্দিন। বঙ্গবন্ধু তাদের দুজনকে ফিসফিস করে কিছু একটা বললেন। কথাগুলো আমি শুনতে পেলাম না, শুধু শুনলাম দুটো শব্দ—‘ক্যান্টনমেন্ট’ ও ‘শাফায়াত জামিল’। তাঁর কথা শেষ হতেই হুদা বলল, ‘সরি, টেলিফোন করতে পারবেন না। চলেন।’ 

তাঁরা তিনজন কামরা থেকে বের হলেন। বঙ্গবন্ধু প্রচণ্ড ঘামছেন, বাসার সব ফ্যান বন্ধ, আগস্টের ভ্যাপসা গরম। বঙ্গবন্ধু ‘কামাল, কামাল’ বলছেন এবং মাথা নাড়ছেন ডানে-বাঁয়ে। আমি একমুহূর্তের জন্য ভাবলাম, তিনি তাঁর বড় ছেলেটার জন্য কাঁদছেন নাকি? সিঁড়ির বারান্দার মুখে তাঁরা এবার। বঙ্গবন্ধু সামনে, হুদা একটু পেছনে তাঁর বাঁ পাশে। হুদার পেছনে মুহিউদ্দিন, তার পাশে ও পেছনে তিনজন সেপাই, তাদের অস্ত্র যার যার হাতে। পাশের ঘর থেকে, শেখ রেহানার ঘর, কে যেন লাল রঙের একটা শাড়ি হাতে নিয়ে সামান্য মাথা বের করে তাদের দেখেই আবার ঘরের ভেতরে ঢুকে গেল। ওই ঘর থেকে কারও হাসি শুনলাম যেন। 

বঙ্গবন্ধুকে শুনলাম কাকে যেন বলছেন, ‘বেয়াদবি করছিস কেন? আমি তোদের জাতির পিতা।’ 

আমি একঝলকের জন্য দেখলাম, নূর মাঝখানের ল্যান্ডিং থেকে হাত তুলে বুড়ো আঙুলে চুটকি বাজিয়ে হুদাকে একটা ইঙ্গিত দিল। একঝলক। 

হুদা ঝট করে বঙ্গবন্ধুকে টপকে নিচে নেমে গেল, নূরের পাশে গিয়ে দাঁড়াল। বঙ্গবন্ধু কেমন সচকিত হয়ে উঠলেন। 

নূর চিৎকার দিয়ে উঠল, ‘স্টপ।’ 

তারপর আবার, ‘স্টপ। দিস ম্যান হ্যাজ নো রাইট টু লিভ। স্টেপ অ্যাসাইড।’ 

বঙ্গবন্ধুর একেবারে পেছনে দাঁড়ানো মেজর মুহিউদ্দিন এবং ওই তিন সৈনিক মুহূর্তের মধ্যে সিঁড়িবারান্দায় তিনতলায় ওঠার দিকটাতে সরে গেল। 

নূর চিৎকার করছে, ‘স্টপ দেয়ার, স্টপ।’ নূর কনুই দিয়ে গুঁতা দিল হুদাকে। নূরের ও হুদার স্টেনগান বঙ্গবন্ধুর বুকের সোজা উঠল। 

নূর বলল, ‘প্লিজ।’

তারপরই গুলি। বার্স্ট ফায়ার।