
কথাসাহিত্যিক হাসনাত আবদুল হাই বলেছেন, একজন সাহিত্যিককে শুধু সাহিত্যতত্ত্ব নিয়ে কাজ করলে চলবে না; তাঁকে প্রকৃতি, দর্শন ও বৈশ্বিক চিন্তাধারার সঙ্গে পরিচিত হতে হবে। নিজের খেয়ালখুশিমতো আয়েশ করে উপন্যাস লেখার দিন শেষ হয়ে গেছে। বিনোদনের জন্য উপন্যাস লেখা হলেও তা দীর্ঘস্থায়ী বা কালজয়ী হবে না।
আজ শনিবার সন্ধ্যায় সাহিত্য পত্রিকা ‘কালি ও কলম’ আয়োজিত তরুণ সাহিত্যিকদের পুরস্কার প্রদান অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এ মন্তব্য করেন।
তরুণ কবি ও লেখকদের সাহিত্যচর্চায় উৎসাহ ও স্বীকৃতি দিতে এবার চারজনকে দেওয়া হয় সিটি ব্যাংক-নিবেদিত ‘কালি ও কলম তরুণ কবি ও লেখক পুরস্কার ২০২৫’।
আজ রাজধানীর ধানমন্ডির বেঙ্গল শিল্পালয়ে এই পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠান হয়। কবিতায় রনক জামান তাঁর ‘এই গ্রাম কুড়িয়ে পেয়েছি’ গ্রন্থের জন্য, প্রবন্ধ ও গবেষণায় রাফাত আলম ‘বাংলাদেশ পাঠ: সাহিত্যিক ও সাংস্কৃতিক ক্রিয়াশীলতার অনুষঙ্গে’ বইয়ের জন্য, কথাসাহিত্যে হামিম কামাল ‘ত্রিস্তান’ গ্রন্থের জন্য এবং শিশু-কিশোর সাহিত্যে রবিউল কমল ‘দস্যু ও দুই দুরন্ত’ গ্রন্থের জন্য পুরস্কার পান।
মুক্তিযুদ্ধ ও বিপ্লব বিভাগে মানসম্মত গ্রন্থ না পাওয়ায় এবার কোনো পুরস্কার দেওয়া হয়নি। প্রতিটি পুরস্কারের অর্থমূল্য দুই লাখ টাকা। ২০০৮ সাল থেকে দেওয়া এ পুরস্কারে এবার নিয়ে ৭১ জন তরুণ কবি ও লেখক স্বীকৃতি পেয়েছেন।
অনুষ্ঠানে ও গবেষণার ক্ষেত্রে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) ব্যবহার নিয়েও কথা বলেন কথাসাহিত্যিক হাসনাত আবদুল হাই। তিনি বলেন, প্রবন্ধ ও গবেষণা মানুষের মননশীলতার ফসল; এর জন্য ধৈর্য, অধ্যবসায় ও কঠোর পরিশ্রম প্রয়োজন। তথ্য সংগ্রহে গুগল, উইকিপিডিয়া বা এআই ব্যবহার করা যেতে পারে; কিন্তু এআই দিয়ে নিজের লেখা লিখিয়ে নেওয়া কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।
মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস প্রসঙ্গেও কথা বলেন তিনি। বলেন, দেশে মুক্তিযুদ্ধের যে ইতিহাস লেখা হয়েছে, তার কোনোটিই পুরোপুরি নিরপেক্ষ ও বস্তুনিষ্ঠ হতে পারেনি। যখন যে রাজনৈতিক দল ক্ষমতায় এসেছে, তারা নিজেদের দৃষ্টিভঙ্গি অনুযায়ী ইতিহাসকে সাজিয়েছে। নতুন প্রজন্মের জন্য তাই মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস নিরপেক্ষ ও বস্তুনিষ্ঠভাবে পুনর্লিখন একটি বড় চ্যালেঞ্জ। পূর্ববর্তী প্রজন্ম যা পারেনি, নতুন প্রজন্ম তা পারবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
জন্মলগ্ন থেকেই কালি ও কলম পত্রিকার সঙ্গে যুক্ত রয়েছেন বলে জানালেন অধ্যাপক আবুল আহসান চৌধুরী। তিনি বলেন, এই পত্রিকা দেশের সাহিত্য ও সংস্কৃতির দীর্ঘ যাত্রায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। দীর্ঘদিন টিকে থাকার পাশাপাশি পত্রিকাটি সাহিত্যচর্চা ও সাহিত্যবোধ নির্মাণেও অবদান রেখেছে।
তরুণ লেখকদের জন্য কালি ও কলম নতুন প্রেরণার উৎস তৈরি করেছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, আগের প্রজন্মে তরুণ লেখকদের প্রাতিষ্ঠানিক স্বীকৃতি বা পুরস্কারের সুযোগ ছিল খুবই কম। এ জন্য কালি ও কলম কর্তৃপক্ষকে অভিনন্দন, ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা জানান তিনি। বক্তব্যের শেষে তরুণ লেখকদের উদ্দেশে বঙ্কিমচন্দ্রের ‘নব্য লেখকদের প্রতি’ নিবন্ধের কথাও স্মরণ করিয়ে দেন।
অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য দেন লেখক ও সিটি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও সিইও মাসরুর আরেফিন। তিনি আক্ষেপ করে বলেন এ ধরনের উদ্যোগে পৃষ্ঠপোষকতা সবাই করে না; কিন্তু সিটি ব্যাংক সব সময় এ ধরনের উদ্যোগের সঙ্গে থাকতে চায়।
মাসরুর আরেফিন বলেন, ‘সৃষ্টিশীল কোনো ভালো কাজে আপনি সবাইকে পাশে পাবেন না। আপনি যদি একটা ফ্যাক্টরি (কারখানা) খুলতে চান, পাশে ব্যাংক আছে। আপনি একটা রেস্টুরেন্ট (রেস্তোরাঁ) দিতে চান, পাশে ব্যাংক আছে। সাহিত্যের জন্য, শিল্পের জন্য তো দেখি না কেউ আছে। থাকলেও তা খুব কম। আমরা মনে করি এটা আমাদের দায়িত্ব, আমাদের দায়িত্ব এখানে থাকা। আছি, থাকব। ডেফিনেটলি (নিশ্চিতভাবে) আমরা এসব উদ্যোগে থাকব।’
অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন বেঙ্গল ফাউন্ডেশনের মহাপরিচালক লুভা নাহিদ চৌধুরী। মঞ্চে অতিথিদের স্বাগত জানান কালি ও কলমের সম্পাদকীয়মণ্ডলীর সদস্য ফারুক মাহমুদ।
পুরস্কার বিতরণ পর্ব শেষে গান পরিবেশন করেন শিল্পী প্রিয়াংকা গোপ।