
দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি বেহাল বলে অভিযোগ করেছেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক ও জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম। তিনি বলেছেন, ‘অন্তর্বর্তী সরকারের সময় আমরা আইনশৃঙ্খলার যে বেহাল দেখেছিলাম, তখন বলা হয়েছিল, নির্বাচিত সরকার এলে আইনশৃঙ্খলার পরিবেশ উন্নত হবে। কিন্তু নির্বাচিত দলীয় সরকার আসার পরও আইনশৃঙ্খলার পরিবেশের কোনো উন্নয়ন দেখা যাচ্ছে না। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ অনেক কাজে ব্যস্ত। তিনি সংবিধান সংশোধন করতে ব্যস্ত, কিন্তু আইনশৃঙ্খলার পরিবেশের পরিবর্তন বা সংস্কার করতে তাঁর সেই ব্যস্ততা আমরা দেখি না।’
মঙ্গলবার সন্ধ্যায় রাজধানীর কাকরাইলে ইনস্টিটিউশন অব ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার্স, বাংলাদেশে (আইডিইবি) ‘জুলাই নারী সমাবেশ ২০২৬’-এ প্রধান অতিথির বক্তব্যে নাহিদ এ কথাগুলো বলেন। জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের দ্বিতীয় বর্ষপূর্তি উপলক্ষে এনসিপির ঘোষিত মাসব্যাপী কর্মসূচির অংশ হিসেবে এই সমাবেশের আয়োজন করে দলের নারী সংগঠন জাতীয় নারীশক্তি।
ধর্ষণসহ বিভিন্ন অপরাধের কথা উল্লেখ করে নাহিদ বলেন, বর্তমান সরকার যদি গতানুগতিকভাবে চলে, আগের সরকারের মতোই অবস্থান নেয় এবং নারীদের জন্য সামাজিক–রাজনৈতিক নিরাপত্তা নিশ্চিত না করে, তাহলে এই সরকার জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে নারীদের অবদান ও সবার প্রত্যাশার পক্ষে সম্মান প্রদর্শন করবে না। সরকারের প্রতি আহ্বান থাকবে, অবিলম্বে সংস্কারপ্রক্রিয়া বাস্তবায়ন এবং জুলাই সনদ বাস্তবায়ন করা। সংবিধান সংশোধনের মাধ্যমে নয়, সংবিধান সংস্কার পরিষদের মাধ্যমে এই সংস্কার বাস্তবায়ন করতে হবে।
জুলাই অভ্যুত্থানের পর মামলা–বাণিজ্য কারা করেছে, তা দেখেছেন উল্লেখ করে এনসিপির আহ্বায়ক বলেন, ‘মামলা–বাণিজ্যের মাধ্যমে বিচারপ্রক্রিয়াকে ভন্ডুল করে দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে। বর্তমান সরকার এসে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রধানকে সরিয়ে দিয়েছে। এটা কী কারণে, তা জানি না। বিচারপ্রক্রিয়া প্রশ্নবিদ্ধ হচ্ছে, ধীরগতিতে হচ্ছে, শহীদ পরিবারগুলো বিচার পাচ্ছে না।’
‘এই প্রশ্ন যৌক্তিক’
এনসিপির সঙ্গে জুলাই আন্দোলনে অংশ নেওয়া নারীরা আর নেই, চলে গিয়েছে—এখনো বিভিন্ন সময় এভাবে ফ্রেমিং করার চেষ্টা করা হয় উল্লেখ করে দলটির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম সমাবেশে বলেন, ‘আমাদের বারবার একটা প্রশ্নের সম্মুখীন হতে হয়েছে, জুলাই অভ্যুত্থানে নারীরা সম্মুখসারিতে ছিলেন, আজকে তাঁরা নেই কেন? আমি মনে করি, এই প্রশ্নটা যৌক্তিক। এই প্রশ্ন নিয়ে আমাদের কাজ করতে হবে।’
এর পেছনে সমাজবাস্তবতার দায় দেখেন নাহিদ। তিনি বলেন, ‘জুলাই অভ্যুত্থানে অংশ নেওয়া সেই নারীরা এখনো জুলাইয়ের পক্ষে আছেন। তাঁরা এখনো নতুন বাংলাদেশের পক্ষে আছেন, সংস্কার ও বিচারের পক্ষে আছেন। দেশ, জাতীয় ও তরুণদের কোনো সংকট হলে অবশ্যই সেসব নারী, আমাদের মায়েরা-বোনেরা আবারও আমাদের পক্ষে এসে দাঁড়াবেন।’
২০২৪ সালের আজকের দিনটিকে ‘ঐতিহাসিক’ উল্লেখ করে নাহিদ বলেন, ২০২৪ সালের ১৪ জুলাই বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের কর্মসূচি ছিল তৎকালীন রাষ্ট্রপতি, দুঃখের বিষয় বর্তমান সময়েও তিনি আছেন, তাঁকে স্মারকলিপি দেওয়া। এটা ছিল ধারাবাহিক কর্মসূচির অংশ।
নাহিদ বলেন, ‘সেই ১৪ জুলাই আমরা দেখতে পেলাম ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনা শিক্ষার্থীদের রাজাকার বলে কটূক্তি করল। এর প্রতিবাদে মেয়েরাই প্রথম হলের তালা ভাঙল। রোকেয়া হলসহ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঁচটি ছাত্রী হল থেকে মেয়েরা বের হয়ে এল, সারা বাংলাদেশে ছেলেমেয়েরা হলের তালা ভেঙে বের হয়ে এসে প্রতিবাদ জানাল। তারা এই আন্দোলনে প্রথমবারের মতো সরাসরি একটা রাজনৈতিক অবস্থান নিল সরকারের বিরুদ্ধে।’
এর ফলে ১৫ জুলাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নারী শিক্ষার্থীদের টার্গেট করা হয়েছিল উল্লেখ করে নাহিদ বলেন, শেখ হাসিনার বক্তব্যের প্রতিবাদে ডাকা সমাবেশে নারী শিক্ষার্থীদের ব্যাপকভাবে আক্রমণ করা হলো, নির্যাতন করা হলো, আহত করা হলো। ঢাকা মেডিকেলে শত শত শিক্ষার্থী সেদিন আহত হয়ে গিয়েছিলেন। সেই দৃশ্য সারা দেশের মানুষকে আলোড়িত ও আন্দোলিত করেছে৷ পুরো বিশ্বে সেই নারী নির্যাতনের দৃশ্য ছড়িয়ে পড়েছিল।
‘নারী হিসেবে আক্রমণ করা হচ্ছে’
১৪ ও ১৫ জুলাই নারীদের অগ্রযাত্রার কারণেই আন্দোলন গণ-অভ্যুত্থানের দিকে ধাবিত হয়েছিল উল্লেখ করে তৎকালীন বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সমন্বয়ক নাহিদ বলেন, শুধু ১৪ ও ১৫ জুলাই নয়, শুরু থেকেই এ আন্দোলনে নারীদের একটা ব্যাপক অংশগ্রহণ ছিল। গণ-অভ্যুত্থানে অনেক নারীই সরাসরি অংশ নিয়েছেন, আহত ও শহীদ হয়েছেন। এই আন্দোলনে নারীদের অংশগ্রহণ, ভূমিকা, আত্মত্যাগ—এটা সব সময় বক্তব্যে বলা হয়। কিন্তু দুঃখের বিষয়, গত দুই বছরে সব রাজনৈতিক দল বা সামগ্রিক রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে সেটা আসলে প্রতিফলিত হয়নি। নারীরা এই আন্দোলনের একটা প্রধান জায়গায় ছিলেন বলেই নারীদের আন্দোলনে, অভ্যুত্থানে ও অভ্যুত্থানের পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন সময় স্পেসিফিকভাবে (নির্দিষ্টভাবে) আক্রমণ করা হচ্ছে, নারী হিসেবে আক্রমণ করা হয়েছে।
এ ধরনের কাজ থেকে সবাইকে বিরত থাকার আহ্বানের পাশাপাশি নারীদের সাইবার বুলিংয়ের বিষয়টিকে আইনে যথাযথ সংবেদনশীলতার সঙ্গে অন্তর্ভুক্ত করার দাবি জানান নাহিদ ইসলাম।
জুলাই অভ্যুত্থানে অংশ নেওয়া নারীরা রাজনৈতিক নিরাপত্তাহীনতার মধ্যে আছেন বলে মনে করেন নাহিদ। নারীশক্তির প্রতি আহ্বান রেখে তিনি বলেন, দলমত–নির্বিশেষে জুলাইয়ের সব নারীর পক্ষে দাঁড়াতে হবে, তাঁদের ঐক্যবদ্ধ করতে হবে। নারীরা যাতে রাজনৈতিক ও সামাজিকভাবে এগিয়ে আসতে পারেন, সেটা নিয়ে কাজ করতে হবে।
এনসিপির দক্ষিণাঞ্চলের সংগঠক মনজিলা ঝুমা ও জাতীয় ছাত্রশক্তির জ্যেষ্ঠ সহসভাপতি রাফিয়া রেহনুমা সমাবেশ সঞ্চালনা করেন। নারীশক্তির আহ্বায়ক মনিরা শারমিনের সভাপতিত্বে সমাবেশে অন্যদের মধ্যে সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা ফরিদা আখতার, এনসিপির সংসদ সদস্য আবদুল্লাহ আল আমিন, সংরক্ষিত আসনের সংসদ সদস্য নুসরাত তাবাসসুম, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের শহীদ মেহেরুন্নেসার বাবা মোশাররফ হোসেন, শহীদ মাহমুদুর রহমান সৈকতের বোন সাবরিনা আফরোজ সেমন্তী, শহীদ মোহাম্মদ আদিলের মা আয়েশা আক্তার, শহীদ মো. পারভেজের বোন সেলিনা আক্তার, ‘জুলাই কন্যা’ লামিয়া রায়হান, স্বর্ণা আক্তার রিয়া, কুররাতুল আইন কানিজ, তাহমিনা শারমিন, শাহজাদি ফারহানা কথা প্রমুখ বক্তব্য দেন।