
এখন সকাল-বিকেল হাঁটতে হয়। কাজের কারণে সকালে না পারলে সন্ধ্যায় পুষিয়ে দিতে হয়। গত ১৯ জানুয়ারি এ রকম এক সন্ধ্যায় উদ্ভ্রান্তের মতো পুষিয়ে দেওয়া হাঁটতে গিয়ে দিনাজপুর শহরের মুন্সীপাড়ায় আলো-আঁধারিতে ছোট একটি দেয়ালে হোঁচট খাই। প্রায় পড়েই গিয়েছিলাম; তাকিয়ে দেখি, ওটা কবর।
কবরের স্মৃতিফলকে লেখা ‘আবু আহমেদ আসাদুল্লাহ ১৯৬৯ গণ–অভ্যুত্থানে ২১/১/৬৯ ঢাকায় গুলিবিদ্ধ, স্বাধীনতাযুদ্ধে গুলিতে ১৪/৪/৭১ শহীদ হন।’
কাছেই আসাদুল্লাহদের বাড়ি। গিয়ে দেখি, সেটি মাটির সঙ্গে গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে চব্বিশের গণ–অভ্যুত্থানের সময়। লোকজন ব্যাখ্যা দিলেন, রহিম ভ্রাতৃদ্বয় (সাবেক বিচারপতি এম ইনায়েতুর রহিম ও সাবেক সংসদ সদস্য ইকবালুর রহিম) এবং শহীদ আসাদুল্লাহদের বাড়ি পাশাপাশি। রহিম ভ্রাতৃদ্বয়ের বাড়িতে আগুন দিলে শহীদ আসাদুল্লাহদের বাড়িও ধ্বংস হয়ে যায়।
আমার মনে শুধু একটিই প্রশ্ন, যারা আগুন দিতে এসেছিল, তারা কারা? আসাদুল্লাহর কথা জানত না কেউ? নাকি এটা আমাদের ইতিহাস রক্ষা না করা ইতিহাসের প্রতি উদাসীনতার টাটকা অথবা বাসি ফল? কিংবা শাস্তি।
ফেসবুকে আসাদুল্লাহর কবরের ছবি পোস্ট করার পর কেউ লেখেন ‘শহীদ আসাদুল্লাহ আমার বন্ধুর বড় ভাই। ১৯৭১ সালে উনি শহীদ হন। আল্লাহ তাঁকে বেহেশত নসিব করুন।’ কেউ জানান, আসাদুল্লাহ তাঁর ‘মামার দিকের আত্মীয়’। সহপাঠীদের অনেকেই এখনো জীবিত নামজাদা মানুষজন। তাঁদের অনেকেই হাত তুলে বলেছেন ‘আমি চিনি’, ‘আমি চিনি’; কিন্তু আপনারা চেনালেন না কেন? আসাদুল্লাহ আসবেন না এই প্রশ্নের জবাব চাইতে; কিন্তু আমরা কেউ জবাবদিহি এড়াতে পারব কি?
উনসত্তরের ঘটনাপ্রবাহে প্রবল স্রোত তোলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র আসাদের মৃত্যু। আসাদের পুরো নাম আমানুল্লাহ মোহাম্মদ আসাদুজ্জামান। সেটি ২০ জানুয়ারির কথা। পাকিস্তানি সামরিক শাসক আইয়ুব খানের বিরুদ্ধে সংঘটিত গণ-অভ্যুত্থানে শহীদ হন আসাদ। তাঁর বাড়ি নরসিংদীর শিবপুর উপজেলার ধানুয়া গ্রামে। তিনি তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়নের নেতা ছিলেন।
আমার মনে শুধু একটিই প্রশ্ন, যারা আগুন দিতে এসেছিল, তারা কারা? আসাদুল্লাহর কথা জানত না কেউ? নাকি এটা আমাদের ইতিহাস রক্ষা না করা ইতিহাসের প্রতি উদাসীনতার টাটকা অথবা বাসি ফল? কিংবা শাস্তি।
১৯৬৯ সালের পরদিন অর্থাৎ ২১ জানুয়ারি আবার ছাত্রদের ওপর গুলি চালায় আধা সামরিক বাহিনী ইপিআর বা ইস্ট পাকিস্তান রাইফেলস। এবার গুরুতর আহত হন বুয়েটের ছাত্র আরেক আসাদ। তিনিই দিনাজপুরে রাস্তার পাশে কবরে শুয়ে থাকা আবু আহমেদ আসাদুল্লাহ। ইপিআরের পায়ের কাছে পড়ে থাকা আসাদুল্লাহর পানির জন্য চিৎকারের ছবি পরের দিনের পত্রিকায় ছাপা হয়েছিল। এই ছবি সারা দেশের মানুষকে আরও প্রতিবাদী করে তোলে। আসাদুল্লাহর সেই ছবি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের জাদুঘরে এখনো অযত্নে রাখা আছে। খবর পাওয়ার পর ছবিটির হদিস করতে প্রায় দুই সপ্তাহ লেগে যায়। নতুন বন্দোবস্তে সবকিছুর তাল যেন কেটে গেছে!
উনসত্তরে আসাদুল্লাহ হাসপাতালে অন্যায্য চিকিৎসায় যতই কাতরান, ততই বিদ্রোহের আগুন তেতে ওঠে। আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় ২৮ দিনের মাথায় ১৮ ফেব্রুয়ারি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে সামরিক বাহিনীর সদস্যদের হাতে খুন হন ড. সৈয়দ মোহাম্মদ শামসুজ্জোহা। তাঁকে গুলি করে ও বেয়নেট দিয়ে খুঁচিয়ে হত্যা করা হয়। সম্ভবত তিনিই দেশের প্রথম শহীদ বুদ্ধিজীবী অধ্যাপক। এরপর বিদ্রোহের আগুন ক্রমে ঘৃণায় রূপ নিতে থাকে। মুসলিম লীগ আর স্থানীয় সরকারের আইয়ুবপন্থী প্রতিনিধিদের অফিস ও বাড়িতে আগুন দেওয়ার ঘটনা ঘটতে থাকে। প্রতিবাদী মিছিলে গুলি চলে জেলায় জেলায়।
আসাদুল্লাহর এক সহপাঠী এই লেখককে লিখেছেন, ‘…যে দিনাজপুর জিলা স্কুলের সামনে দিয়ে আমরা একসময় স্কুলে যেতাম, ঠিক সেখানেই সে শহীদ হয়। সেখানেই তাকে দাফন করা হয়।’
অবস্থা বেগতিক দেখে আইয়ুব খান পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নর মোনায়েম খানকে সরিয়ে দেন। ১৯৬৯ সালের ২৩ মার্চ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জনপ্রিয় শিক্ষক মির্জা নূরুল হুদাকে (এম এন হুদা) গভর্নর হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। গভর্নর হিসেবে শপথ নিয়েই তিনি ছুটে যান হাসপাতালে আহত ছাত্রদের দেখতে। আসাদুল্লাহসহ অনেকে তখন হাসপাতালে; কিন্তু ততক্ষণে অনেক দেরি হয়ে গেছে। ক্যান্টনমেন্টের হিসাব ছিল অন্য রকম। তারা আইয়ুব খানকে ছুটি দিয়ে মার্শাল ল জারি করে।
তত দিনে আসাদুল্লাহর একটা পা পচতে শুরু করে। তাঁর পা পূর্ব পাকিস্তানের প্রতি পশ্চিম পাকিস্তানের অবজ্ঞা–অবহেলার প্রতীক হয়ে ওঠে। পা কেটে ফেলতে হয়। স্পাইনাল কর্ডও আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তৎকালীন ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ এবং রাজনৈতিক নেতারা, বিশেষ করে মাওলানা ভাসানীর চাপে ইয়াহিয়ার আমলে বুয়েট কর্তৃপক্ষ ও পূর্ব পাকিস্তান সরকার তাঁকে চিকিৎসার জন্য ইংল্যান্ডে পাঠায়। দীর্ঘ চিকিৎসা শেষে ফেরত আসেন হুইলচেয়ারে। কয়েক মাস পরই শুরু হয় অসহযোগ আন্দোলন।
১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে আসাদুল্লাহর বাড়ির সবাই এপ্রিলের প্রথম সপ্তাহে গ্রামের বাড়িতে আশ্রয় নেন। শুধু আসাদুল্লাহ থেকে যান বাড়িতে। হয়তো ভেবেছিলেন, হুইলচেয়ারে থাকা একজন শারীরিক প্রতিবন্ধী অসহায় মানুষকে কে আর খুন করবে। দিনাজপুর জেলা ও শহর ২৬ মার্চ থেকে ১৪ এপ্রিল সকাল পর্যন্ত বাঙালি ইপিআর, পুলিশ ও মুক্তিকামী ছাত্র–জনতার দখলে ছিল। এপ্রিলের ১৪ তারিখে সৈয়দপুর সেনানিবাস থেকে পাঞ্জাব রেজিমেন্টের সঙ্গে তরবারি, বল্লম, রামদাসহ উন্মত্ত কয়েক শ সিভিলিয়ান অবাঙালি দিনাজপুর-সৈয়দপুর সড়ক ধরে আর্টিলারি সেলের ছত্রচ্ছায়ায় দিনাজপুর শহরে ধীরে ধীরে এগোতে থাকে।
পাকিস্তানিদের তীব্র হামলায় টিকতে না পেরে শহর থেকে যাওয়া মানুষজন পালাতে থাকে। শহরের নারী-শিশুরা কয়েক দিন আগেই শহর ছেড়ে ভারত সীমান্তের কাছের গ্রামগুলোতে আশ্রয় নিয়েছিল। ভারত ১৪ এপ্রিলের আগে সীমান্ত খুলে দেয়নি।
একেবারে শেষ সময় যখন হানাদার বাহিনী ও উন্মত্ত অবাঙালিরা মাত্র কয়েক শ মিটার দূরে, তখন হুইলচেয়ারে আসাদুল্লাহ বাড়ি থেকে বেরিয়ে সাধারণ মানুষের সঙ্গে এগোতে থাকেন। প্রতিবন্ধিতার কারণে অন্যদের থেকে তিনি অনেক পেছনে পড়ে যান। বাড়ি থেকে ১৫০–২০০ গজ দূরে জিলা স্কুলের ফটকের সামনে অবাঙালিরা তাঁকে ধরে ফেলে। এরপর ধারালো অস্ত্র দিয়ে কুপিয়ে ও গুলি করে হত্যার পর তাঁকে ফেলে রাখে। কয়েক দিন পর শহর পরিষ্কারে নামা পরিচ্ছন্নতাকর্মীরা তাঁকে রাস্তার পাশেই মাটিচাপা দেন। স্বাধীনতার পর পাড়ার তরুণেরা তাঁর কবরটি বাঁধানোর উদ্যোগ নেন।
আসাদুল্লাহর এক সহপাঠী এই লেখককে লিখেছেন, ‘…যে দিনাজপুর জিলা স্কুলের সামনে দিয়ে আমরা একসময় স্কুলে যেতাম, ঠিক সেখানেই সে শহীদ হয়। সেখানেই তাকে দাফন করা হয়।’
উনসত্তরে গুলি খেয়ে বেঁচে যাওয়া গণ–অভ্যুথানের সামনের সারির কর্মী আর একাত্তরের শহীদ আবু আহম্মদ আসাদুল্লাহর রাস্তার পাশের কবরটি এখনো পুরোপুরি সংরক্ষণের ব্যবস্থা করা হয়নি। আমরা কবে শিখব আমাদের বীরদের মর্যাদা দিতে, তাঁদের মনে রাখতে, ইতিহাস লিখতে।
লেখক: গবেষক (wahragawher@gmail.com)