
হিজাব নিয়ে বিতর্কের জেরে আজারবাইজানের সেনাবাহিনী দেশটির প্রেসিডেন্ট ইলহাম আলিয়েভের ছবি সরিয়ে ফেলছে এমন দাবিতে একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে।
তবে যাচাইয়ে দেখা গেছে, ভিডিওটি এআই দিয়ে তৈরি করা হয়েছে। মূল ছবিটি সিরিয়ার ক্ষমতাচ্যুত প্রেসিডেন্ট বাশার আল-আসাদের ছবি সরিয়ে ফেলার ভিডিও থেকে নেওয়া হয়েছে।
৬ সেকেন্ডের ভিডিওতে দেখা যায়, রাস্তার মাঝের আইল্যান্ডে স্থাপন করা একটি বিলবোর্ডে আজারবাইজানের প্রেসিডেন্ট ইলহাম আলিয়েভের ছবি রয়েছে। মুখোশ পরা, কাঁধে অস্ত্র ঝোলানো দুই ব্যক্তিকে বিলবোর্ডটি উপড়ে ফেলতে দেখা যায়। তাঁদের পোশাক দেখে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য বলে মনে হয়।
‘ব্রিগেডিয়ার জেনারেল এম এ হক পেইজ’ নামের একটি ফেসবুক পেজ থেকে প্রেসিডেন্টের ছবি–সংবলিত বিলবোর্ড উপড়ে ফেলার ভিডিওটি পোস্ট করা হয়। প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত ভিডিওটি ২২ লাখ বার দেখা হয়েছে এবং এতে ২৩ হাজারের বেশি প্রতিক্রিয়া পড়েছে।
ভিডিওটির ক্যাপশনে দাবি করা হয়েছে, ‘স্কুলে হিজাব নিষিদ্ধ করার মতো এক বোকামিপূর্ণ সিদ্ধান্তের কারণে আজারবাইজানি সেনাবাহিনী রাস্তাঘাট থেকে প্রেসিডেন্ট ইলহাম আলিয়েভের ছবি সরিয়ে ফেলতে শুরু করেছে! যে দেশের ৯৬ শতাংশ মানুষই মুসলিম, সেখানে এমন একটি সিদ্ধান্ত নেওয়া হলো—এর উদ্দেশ্য কী?’
মো. আবদুল হক বা এম এ হক গত সংসদ নির্বাচনে ঢাকা–২ আসন থেকে জামায়াতের মনোনয়নে অংশ নেন। নির্বাচনে তিনি বিএনপির আমানউল্লাহ আমানের কাছে পরাজিত হন। ‘ব্রিগেডিয়ার জেনারেল এম এ হক পেইজ’–এ তাঁর বিভিন্ন কর্মকাণ্ড বিশেষ করে বিভিন্ন টিভি বিতর্কগুলো নিয়মিত পোস্ট করা হয়।
লিংক: এখানে
এ বিষয়ে জানতে চাইলে আজ শুক্রবার বিকেল ৫টা ১২মিনিটে এম এ হক প্রথম আলোকে বলেন, ‘পেজটি আমিই পরিচালনা করি। হিজাব বিতর্কে আজারবাইজানের সেনাবাহিনী দেশটির প্রেসিডেন্টের ছবি সরিয়ে ফেলছে—এমন একটি ভিডিও এক্সে পেয়েছিলাম। মনে হয়েছিল, ভিডিওটি ফেসবুকে শেয়ার করা দরকার, তাই পোস্ট দিয়েছি। এআই সম্পর্কে আমার তেমন ধারণা নেই। আমি শিগগির বিষয়টি সংশোধন করব।’
তবে সন্ধ্যা সোয়া ছয়টা পর্যন্ত পোস্টটি ওই পেজ থেকে সরানো বা সংশোধন করা হয়নি।
প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত ফেসবুকেই ৩০টির অধিক পেজ ও প্রোফাইলে একই দাবিতে ভিডিওটি ছড়িয়ে পড়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের এক্স ও ইনস্টাগ্রাম প্ল্যাটফর্মেও ছড়িয়েছে।
প্রথম লিংক, দ্বিতীয় লিংক, তৃতীয় লিংক, চতুর্থ লিংক, পঞ্চম লিংক
ভিডিওটি এআই দিয়ে তৈরি
ছড়িয়ে পড়া ভিডিওটি পর্যালোচনা করে কয়েকটি অসংগতি দেখা যায়। ভিডিওর প্রথম দিকে বিলবোর্ড উপড়ে ফেলতে দুজন ব্যক্তিকে দেখা গেলেও পরের অংশে তাঁদের একজনের অবয়ব অস্পষ্ট হয়ে যায়। ভিডিওতে ডান পাশে থাকা একজন ব্যক্তিকে হঠাৎ অদৃশ্য হয়ে যেতে দেখা যায়। তাঁর পোশাকটি মাটিতে পড়ে থাকে।
এআই শনাক্তকরণে ব্যবহৃত কয়েকটি ওয়েবসাইটে ভিডিওটি পরীক্ষা করে দেখা যায় সেটি এআই প্রযুক্তি দিয়ে তৈরির প্রবল সম্ভাবনা রয়েছে।
এ ছাড়া আজারবাইজানের স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে দেশটির সেনাবাহিনীর প্রেসিডেন্টের ছবি সরিয়ে ফেলার দাবির সমর্থনে নির্ভরযোগ্য কোনো প্রতিবেদন পাওয়া যায়নি।
মূল ভিডিওটি সিরিয়ার
রিভার্স সার্চ করে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওটির মূল দৃশ্যটি পাওয়া যায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে। ২০২৬ সালের মে মাসে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশিত একাধিক ভিডিওতে সিরিয়ার ক্ষমতাচ্যুত প্রেসিডেন্ট বাশার আল-আসাদের ছবি সরিয়ে ফেলার দৃশ্য দেখা যায়। ভিডিওগুলো সিরিয়ার আলেপ্পো শহরের বলে উল্লেখ করা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট পোস্টগুলোতে দাবি করা হয়, ২০২৪ সালের নভেম্বরে শহরটিতে বিদ্রোহী গোষ্ঠীর প্রবেশের পর এসব দৃশ্য ধারণ করা হয়েছিল।
অনলাইনে পাওয়া ভিডিওগুলো পর্যালোচনা করে দেখা যায়, মূল দৃশ্যে বিলবোর্ডে বাশার আল-আসাদের ছবি রয়েছে। অন্যদিকে, সম্প্রতি ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে সেই ছবির জায়গায় আজারবাইজানের প্রেসিডেন্ট ইলহাম আলিয়েভের ছবি দেখা যায়।
আজারবাইজানে সরকারি স্কুলের পোশাকবিধি নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। ২০২৬ সালের ৭ জুলাই দেশটির সাধারণ শিক্ষা আইনে সংশোধনী আনা হয়। পরে ২১ সেপ্টেম্বর স্কুলের পোশাক–সংক্রান্ত নিয়মে পরিবর্তন আনা হয় এবং ৬ অক্টোবর শিক্ষকদের পোশাক–সংক্রান্ত পৃথক বিধিমালা অনুমোদন করা হয়।
নতুন নিয়মে হিজাবের নাম সরাসরি উল্লেখ না থাকলেও, তা প্রয়োগের ক্ষেত্রে হিজাব পরা শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের বাধার মুখে পড়ার অভিযোগ উঠেছে। বিবিসি, আল-জাজিরা ও স্থানীয় সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, একাধিক স্কুলে হিজাব পরা শিক্ষার্থীদের ক্লাসে প্রবেশ করতে দেওয়া হয়নি। কিছু শিক্ষককেও মাথার স্কার্ফ খুলতে বলা হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। এর প্রতিবাদে শিক্ষার্থীদের ক্লাস বর্জন ও অভিভাবকদের বিক্ষোভের খবরও প্রকাশিত হয়েছে।
১২ অক্টোবর আজারবাইজানের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানায়, স্কুলের পোশাকবিধি কার্যকর করা নিয়ে সৃষ্ট ঘটনায় জনশৃঙ্খলা বিঘ্নিত করার অভিযোগে ৩৭ জনকে আটক করা হয়েছে।
আজারবাইজান মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশ হলেও রাষ্ট্রটি ধর্মনিরপেক্ষ। দেশটির সংবিধানে ধর্মনিরপেক্ষ শিক্ষাব্যবস্থার পাশাপাশি ধর্মীয় স্বাধীনতা ও শিক্ষার অধিকারও স্বীকৃত। সরকার স্কুলে অভিন্ন পোশাকবিধি ও ধর্মনিরপেক্ষ শিক্ষার নীতির কথা বলছে। অন্যদিকে, বিশ্লেষকেরা মনে করছেন, নতুন নিয়মের প্রয়োগ ধর্মীয় স্বাধীনতা ও শিক্ষার অধিকারের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে। এ নিয়ে দেশটিতে বিতর্ক অব্যাহত রয়েছে।