
লেখক-অধ্যাপক সলিমুল্লাহ খান বলেছেন, জুলাইয়ের গণ-অভ্যুত্থানের পর বাংলাদেশ কোন পথে যাবে, তার কোনো পূর্বনির্ধারিত ছক এখনো নেই। ইতিহাস থেকে শিক্ষা না নেওয়ার কারণে একই ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তির ঝুঁকি রয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেছেন, জুলাইকে বুঝতে হলে শুধু ২০২৪ সালের ঘটনাপ্রবাহ নয়, বাঙালি মুসলমানের রাজনৈতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক বিকাশ, ১৯৪৭-এর দেশভাগ, ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন এবং ভাষা ও সংস্কৃতির দীর্ঘ ইতিহাসকে একসঙ্গে বিবেচনা করতে হবে।
এশীয় শিল্প ও সংস্কৃতি সভার (সিএএসি) রজতজয়ন্তী উপলক্ষে আয়োজিত সেমিনারে এ কথা বলেন অধ্যাপক সলিমুল্লাহ খান। রজতজয়ন্তী উপলক্ষে আজ রোববার বিকেলে রাজধানীর বাংলামোটরের প্ল্যানার্স টাওয়ারে সিএএসি কার্যালয়ে পুনর্মিলনী, সেমিনার ও মুক্ত আলোচনার আয়োজন করে এশীয় শিল্প ও সংস্কৃতি সভা।
অধ্যাপক সলিমুল্লাহ খান বলেন, মানুষ যা চোখে দেখে, বাস্তবতা সব সময় তা নয়। বিজ্ঞান যেমন দৃশ্যমানতার বাইরে গিয়ে বাস্তবতাকে বোঝার চেষ্টা করে, তেমনি বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতাকেও শুধু দৃশ্যমান ঘটনা দিয়ে বিচার করলে চলবে না।
গ্রিক দার্শনিক অ্যারিস্টটলের ‘বুদ্ধির বিচারে মঙ্গল’ ধারণার কথা তুলে ধরে সলিমুল্লাহ খান বলেন, যুক্তিরও সীমা আছে। রবীন্দ্রনাথের ‘আনন্দলোকে মঙ্গলালোকে’ ধারণার সমালোচনা করে তিনি বলেন, পৃথিবীকে শুধু মঙ্গল ও সৌন্দর্যের জায়গা হিসেবে দেখলে শোষণ, কান্না ও নিপীড়নের বাস্তবতা আড়ালে থেকে যায়।
ভবিষ্যতের পথ প্রসঙ্গে স্পেনের কবি আন্তোনিও মাচাদোর কবিতা তুলে ধরে সলিমুল্লাহ খান বলেন, পথ আগে থেকে তৈরি থাকে না; চলার মধ্য দিয়েই পথ তৈরি হয়। তাঁর ভাষায়, বাংলাদেশও এমন একটি পর্যায়ে আছে, যেখানে জুলাইয়ের আগে বা পরে ভবিষ্যতের জন্য কোনো নির্দিষ্ট পথরেখা তৈরি ছিল না। এখন পর্যন্ত যে পথ তৈরি হয়েছে, সেটি পেছনে ফিরে দেখে মূল্যায়ন করা প্রয়োজন।
জুলাই বাংলাদেশের ইতিহাসবোধকে নতুন করে ভাবার সুযোগ তৈরি করেছে। এ সুযোগ কাজে লাগাতে হলে কোনো একটি মতাদর্শ, রাজনৈতিক দল বা গোষ্ঠীর তৈরি করা একক ব্যাখ্যার মধ্যে জুলাইকে আটকে না রেখে এর পেছনের দীর্ঘ ইতিহাস, সামাজিক বৈচিত্র্য, রাজনৈতিক আকাঙ্ক্ষা ও সাংস্কৃতিক পরিবর্তনগুলোকে একসঙ্গে দেখতে হবে।অধ্যাপক সলিমুল্লাহ খান
বাংলাদেশের বুদ্ধিবৃত্তিক ইতিহাস বুঝতে হলে ১৯২০-এর দশকের ‘বুদ্ধির মুক্তি আন্দোলন’-এর দিকে তাকাতে হবে বলে মনে করেন অধ্যাপক সলিমুল্লাহ খান। তিনি বলেন, সে সময়ের বুদ্ধিজীবীরা জ্ঞানকে মুক্তির প্রধান শর্ত হিসেবে দেখেছিলেন। কিন্তু তাঁদের চিন্তার মধ্যেও সীমাবদ্ধতা ছিল। ধর্ম, সমাজ ও বাঙালি মুসলমানের আত্মপরিচয়ের প্রশ্নে তখন যে বিতর্ক তৈরি হয়েছিল, তার অনেকটাই পরবর্তী সময়েও রয়ে গেছে। তাঁর মতে, বাংলাদেশের বুদ্ধিজীবীদের একটি বড় সংকট হলো তাঁরা বিভিন্ন রাজনৈতিক ও মতাদর্শিক শিবিরে ভাগ হয়ে গিয়ে নিজেদের অবস্থানের বাইরে গিয়ে অনেক প্রশ্ন বিবেচনা করতে পারেন না।
বাঙালি মুসলমানের আত্মপরিচয় ও সাংস্কৃতিক বিকাশ বোঝার জন্য কাজী নজরুল ইসলামকে নতুন করে মূল্যায়ন করা জরুরি বলে মনে করেন অধ্যাপক সলিমুল্লাহ খান। তাঁর মতে, নজরুল একই সঙ্গে হিন্দু ও মুসলমান—উভয় সম্প্রদায়ের মানুষের কাছে গ্রহণযোগ্যতা তৈরি করতে পেরেছিলেন। আন্তোনিও গ্রামসির ‘হেজিমনি’ ধারণার উল্লেখ করে তিনি বলেন, এটি আদেশ বা জোর করে প্রতিষ্ঠা করা যায় না; মানুষের আস্থা ও অনুসরণের মধ্য দিয়ে তৈরি হয়। নজরুলের ক্ষেত্রে এমন একটি সাংস্কৃতিক নেতৃত্বের উদাহরণ দেখা যায়।
দেশের উচ্চশিক্ষা ও বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন সলিমুল্লাহ খান। তিনি বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়গুলো এখন শিক্ষা ও জ্ঞানচর্চার চেয়ে ভর্তি, পরীক্ষা ও র্যাঙ্কিং নিয়ে বেশি ব্যস্ত। অথচ জ্ঞানের গুরুত্বপূর্ণ বিকাশ বিশ্ববিদ্যালয়ের বাইরেও ঘটে। তাঁর মতে, বিশ্ববিদ্যালয়ের বাইরে যে বুদ্ধিবৃত্তিক ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড তৈরি হচ্ছে, সেগুলোকে গুরুত্ব দেওয়া এবং নিজেদের সীমাবদ্ধতা নিয়ে আত্মবিশ্লেষণ করা জরুরি।
সলিমুল্লাহ খানের মতে, জুলাই বাংলাদেশের ইতিহাসবোধকে নতুন করে ভাবার সুযোগ তৈরি করেছে। এই সুযোগ কাজে লাগাতে হলে কোনো একটি মতাদর্শ, রাজনৈতিক দল বা গোষ্ঠীর তৈরি করা একক ব্যাখ্যার মধ্যে জুলাইকে আটকে না রেখে এর পেছনের দীর্ঘ ইতিহাস, সামাজিক বৈচিত্র্য, রাজনৈতিক আকাঙ্ক্ষা ও সাংস্কৃতিক পরিবর্তনগুলোকে একসঙ্গে দেখতে হবে।
জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর বাংলাদেশের সাম্প্রতিক ইতিহাস ও অতীতের সংকটগুলো নতুন করে পর্যালোচনা করা জরুরি বলে মনে করেন লেখক ও গবেষক সহুল আহমদ। তিনি বলেন, বাংলাদেশে গত কয়েক দশকে রাজনৈতিক আন্দোলনের ধরন বদলে গেছে। দলীয় নেতৃত্বের বদলে সমন্বয়কভিত্তিক আন্দোলন, স্বতঃস্ফূর্ত উদ্যোগ ও ইন্টারনেটনির্ভর যোগাযোগ নতুন ধরনের রাজনৈতিক পরিসর তৈরি করেছে। শাহবাগ ও শাপলা চত্বরের আন্দোলনের পর বিভিন্ন মত ও অবস্থানের মানুষের মধ্যে যে বিতর্ক ও মেরুকরণ তৈরি হয়েছিল, তার মধ্য দিয়েই পরে একটি অভিন্ন পরিসর ও ভাষার বিকাশ ঘটে, যা জুলাইয়ের আন্দোলনকে বোঝার ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ।
আলোচনায় গবেষক ও সাংবাদিক তাহমিদাল জামি বলেন, বুদ্ধিজীবীর কাজ শুধু কোনো একটি বয়ান জনগণের ওপর আরোপ করা নয়; বরং গণ–অভ্যুত্থানে অংশ নেওয়া বিভিন্ন শ্রেণি ও গোষ্ঠীর আকাঙ্ক্ষাগুলোকে ব্যাখ্যা করা এবং সেগুলোকে স্পষ্ট করে তোলা। তিনি আরও বলেন, জুলাইয়ের পর এই জায়গায় বড় ধরনের ঘাটতি দেখা গেছে। একই সঙ্গে জুলাই বাংলাদেশের ইতিহাস, পরিচয় ও সংস্কৃতির বহুত্বকে নতুন করে দেখার সুযোগ তৈরি করেছে। এ সুযোগ কাজে লাগিয়ে দীর্ঘ ইতিহাসকে নতুনভাবে পর্যালোচনা এবং জুলাইয়ের বিভিন্ন আকাঙ্ক্ষা ও অভিজ্ঞতাকে সংগঠিতভাবে আলোচনায় আনা বুদ্ধিজীবীদের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব।
সেমিনারে স্বাগত বক্তব্যে এশীয় শিল্প ও সংস্কৃতি সভার সভাপতি জহিরুল ইসলাম বলেন, ২৫ বছর ধরে এশীয় শিল্প ও সংস্কৃতি সভা এমন একটি সাংস্কৃতিক পরিসর তৈরির চেষ্টা করেছে, যেখানে কোনো মতাদর্শ বা ব্যক্তিকে প্রশ্নাতীত ধরে নেওয়া হবে না। জ্ঞানকে শুধু ভোগ করার পরিবর্তে জ্ঞান সৃষ্টি ও প্রচলিত জ্ঞানকাঠামোকে প্রশ্ন করার আত্মবিশ্বাস তৈরি করাই তাঁদের চর্চার অন্যতম লক্ষ্য। বর্তমান অনিশ্চিত সময়ে মানুষের সামনে কী করণীয়, সমাজ ও রাষ্ট্র কোন পথে যাবে—এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে বুদ্ধিজীবীদের কাজ হলো বৃহত্তর বাস্তবতার সঙ্গে ঘটনাগুলোর সম্পর্ক বোঝার একটি ‘মানচিত্র’ তৈরি করে দেওয়া।
সেমিনারে আরও বক্তব্য দেন সাংবাদিক মিনহাজুল ইসলাম।