প্রাক্কলিত ব্যয় ছিল ৬৭ কোটি ৩ লাখ টাকা। প্রতিযোগিতা বাড়ায় প্রস্তাবিত দর দাঁড়িয়েছে ৫৭ কোটি ৬৬ লাখ টাকা।
মূল দরপত্রেও এমন প্রতিযোগিতা থাকলে সরকারের আরও অনেক টাকা সাশ্রয় হতো।
শুধু মাধ্যমিক স্তরের বই ছাপানোয় প্রায় ২৫৯ কোটি ৪৭ লাখ টাকা সাশ্রয় হতে পারত।
২০২৭ শিক্ষাবর্ষের বিনা মূল্যের পাঠ্যবই ছাপানোর মূল দরপত্রে প্রতিযোগিতার ঘাটতি ছিল বলে অভিযোগ আছে। তবে পুনঃ দরপত্রে প্রতিযোগিতা বেড়েছে। এর মধ্যে ৩৪ লটে প্রতিযোগিতা বাড়ায় প্রাক্কলিত ব্যয়ের তুলনায় দর কমেছে প্রায় ১৪ শতাংশ বা ৯ কোটি ৩৭ লাখ টাকা। আর নতুন চার বইয়ের ২৩ লটে কমেছে আরও সাড়ে ৮ শতাংশ বা ৪ কোটি ৬০ হাজার টাকা। এতে সরকারের মোট সাশ্রয় হয়েছে প্রায় ১৪ কোটি টাকা।
জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ডের (এনসিটিবি) হিসাব বলছে, পুনঃ দরপত্রের ৩৪টি লটে বই ছাপানোর প্রাক্কলিত ব্যয় ছিল ৬৭ কোটি ৩ লাখ টাকা। প্রতিযোগিতা বাড়ায় ঠিকাদারদের প্রস্তাবিত দর দাঁড়িয়েছে ৫৭ কোটি ৬৬ লাখ টাকা।
এনসিটিবির কর্মকর্তারা বলছেন, মূল দরপত্রেও এমন প্রতিযোগিতা থাকলে সরকারের আরও অনেক টাকা সাশ্রয় হতো। পুনঃ দরপত্রে ব্যয় কমার একই হার মূল দরপত্রের মোট মূল্যের সঙ্গে তুলনা করে দেখা গেছে, শুধু মাধ্যমিক স্তরের বই ছাপানোর কাজেই প্রায় ২৫৯ কোটি ৪৭ লাখ টাকা সাশ্রয় হতে পারত।
আগামী শিক্ষাবর্ষের প্রাক্-প্রাথমিক থেকে নবম-দশম শ্রেণি পর্যন্ত প্রায় ৩১ কোটি পাঠ্যবই ছাপার কাজ চলছে। এর মধ্যে মাধ্যমিক স্তরের বই ২২ কোটির বেশি। বাকিগুলো প্রাথমিক স্তরের। সব মিলিয়ে বই ছাপানোর সম্ভাব্য ব্যয় প্রায় ১ হাজার ৯০০ কোটি টাকা। সরকারের লক্ষ্য, বছরের শুরুতেই শিক্ষার্থীদের হাতে বই পৌঁছে দেওয়া।
পুনঃ দরপত্রে বদলে গেল চিত্র
প্রতিবছর পাঠ্যবই ছাপানোর দরপত্রে কিছু লট (বই মুদ্রণ ও সরবরাহের একটি নির্দিষ্ট অংশ) বাতিল হয়। কোনো প্রতিষ্ঠান প্রয়োজনীয় যোগ্যতা পূরণ করতে পারে না। আবার কেউ প্রয়োজনীয় নথি জমা দেয় না। চলতি বছরও এমন কারণে ৩৪টি লটে পুনঃ দরপত্র আহ্বান করা হয়। লটগুলোর মধ্যে রয়েছে ইবতেদায়ির প্রথম থেকে পঞ্চম শ্রেণির একটি, ষষ্ঠ শ্রেণির পাঁচটি, সপ্তম শ্রেণির ছয়টি, অষ্টম শ্রেণির দুটি এবং নবম শ্রেণির ২০টি।
এনসিটিবির নথি অনুযায়ী, এসব লটে প্রাক্কলিত ব্যয় ছিল ৬৭ কোটি ৩ লাখ ৪৯ হাজার ৩৭৮ টাকা। ঠিকাদারদের প্রস্তাবিত দর অনুযায়ী, ব্যয় কমেছে ৯ কোটি ৩৬ লাখ ৯৯ হাজার ৫৯১ টাকা। সাশ্রয়ের হার প্রায় ১৩ দশমিক ৯৮ শতাংশ।
দরপত্রের তথ্যেও প্রতিযোগিতার চিত্র দেখা গেছে। যেমন ৭৪৫ নম্বর লটে দরপত্র কিনেছিলেন ৩৪ জন ঠিকাদার। তাঁদের মধ্যে পাঁচজন দর জমা দেন। তাঁদের বেশির ভাগই ছিলেন ভিন্ন প্রতিষ্ঠানের। অন্যদিকে ৯৪৭ নম্বর লটে দরপত্র কিনেছিলেন ৩৭ জন। জমা পড়ে ৩২টি দরপত্র।
৯৪৭ নম্বর লটে প্রতি ফর্মা ২ টাকা ৮৭ পয়সা দর দিয়ে বই ছাপানোর কাজ পায় মহানগর প্রিন্টিং অ্যান্ড পাবলিকেশন। প্রতিষ্ঠানটির মালিক গিয়াস উদ্দিন প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমার লাভ কম হবে। তবে লস হবে না।’
বাংলাদেশ মুদ্রণশিল্প সমিতির সাবেক সভাপতি তোফায়েল খান মনে করেন, সিন্ডিকেটের নেতারা নিজেদের সক্ষমতার চেয়ে বেশি কাজ পেয়েছেন। ফলে পরের দরপত্রে আগের সমঝোতা আর টেকেনি।
এ ছাড়া আগামী শিক্ষাবর্ষে চতুর্থ ও ষষ্ঠ শ্রেণিতে দুটি করে মোট চারটি নতুন বই যুক্ত হচ্ছে। এই চার বইয়ের দরপত্রও সম্পন্ন করেছে এনসিটিবি। এসব বইয়ের জন্য ২৩ লটে এনসিটিবির বরাদ্দ ছিল ৫৩ কোটি ৯৪ লাখ টাকা। দরপত্র বিশ্লেষণে দেখা গেছে, এসব লটে ঠিকাদারেরা দর প্রস্তাব করে ৪৯ কোটি ৩০ লাখ টাকা। অর্থাৎ সরকারের বাঁচে ৪ কোটি ৬০ হাজার টাকা।
‘দুর্নীতির প্রমাণ’
বিনা মূল্যের পাঠ্যবই ছাপানোর দরপত্রে গোপনীয় দর ফাঁস, সিন্ডিকেট ও অতিরিক্ত ব্যয়ের অভিযোগ ওঠে। এ নিয়ে প্রথম আলোতে গত ১৮ সেপ্টেম্বর প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছিল। এর পরিপ্রেক্ষিতে ৬ অক্টোবর এনসিটিবিতে অভিযান চালায় দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)।
সার্বিক বিষয়ে কথা বলতে এনসিটিবির চেয়ারম্যান মোহাম্মদ ফখরুল মাওলার সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়। তবে তিনি এ বিষয়ে এনসিটিবির সদস্য (পাঠ্যপুস্তক) মোহাম্মদ আবু নাসেরের সঙ্গে কথা বলার পরামর্শ দেন।
আবু নাসের প্রথম আলোকে বলেন, পুনঃ দরপত্রে দর কমে যাওয়া স্বাভাবিক। তাঁর ভাষায়, ‘স্বাভাবিকভাবেই কোনো টেন্ডারে পুনঃ দরপত্র হলে দর কমে যায়। এটা পুরোনো প্রক্রিয়া। এর সঙ্গে মূল দরপত্রের তুলনা করাটা ঠিক হবে না।’ মূল দরপত্রে যোগসাজশের অভিযোগের বিষয়ে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে কি না, জানতে চাইলে এনসিটিবির এই সদস্য বলেন, ব্যবস্থা নেওয়ার মতো সুযোগ তাঁদের হাতে নেই।
তবে পুনঃ দরপত্রে খরচ কমার ঘটনাকে এনসিটিবির কর্মকর্তাদের সঙ্গে ঠিকাদারদের যোগসাজশের দুর্নীতির প্রমাণ বলে মনে করেন ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, গৎবাঁধা কথা বলে দুর্নীতির অভিযোগ থেকে পার পাওয়ার সুযোগ নেই। সরকারকে মুদ্রণমালিকদের পাশাপাশি এনসিটিবির কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নিতে হবে।