
‘তিনি কেবল বাংলা কথাসাহিত্যের এক শক্তিশালী ও সহজাত শিল্পীই নন, বরং জীবনকে “চলমান উৎসব” বানিয়ে সংকট ও অসুস্থতাকে জয় করা এক অদম্য প্রাণশক্তি।’ আজ শুক্রবার বিকেলে ধানমন্ডির বেঙ্গল শিল্পালয়ে কথাসাহিত্যিক নাসরীন জাহানের প্রকাশিতব্য নতুন উপন্যাস ‘ফিনিক্স তোমাকে মায়াবাসি’র প্রচ্ছদ উন্মোচন অনুষ্ঠানে এভাবেই উঠে এল তাঁর জীবনবোধ ও সৃষ্টিশীল সত্তার নানা দিক।
প্রকাশনা সংস্থা অন্যপ্রকাশের উদ্যোগ ও বেঙ্গল ফাউন্ডেশনের সহযোগিতায় এ আয়োজন শুধু একটি বইয়ের প্রকাশনা অনুষ্ঠানের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি, এটি রূপ নিয়েছিল লেখকের সাহিত্য, স্মৃতি ও জীবনসংগ্রামের গভীর এক উদ্যাপনে।
অন্যপ্রকাশের প্রধান নির্বাহী মাজহারুল ইসলামের স্বাগত বক্তব্যের মধ্য দিয়ে শুরু হয় আয়োজন। অনুষ্ঠানের সভাপতি, সাহিত্যিক হাসনাত আবদুল হাই তাঁর বক্তব্যে বলেন, নাসরীন জাহান এমন বিরল এক ব্যক্তিত্ব, যাঁর জীবন থেকে লেখালেখিকে আলাদা করে দেখা যায় না। নোবেলজয়ী লেখক আর্নেস্ট হেমিংওয়ের বিখ্যাত উক্তি ‘মুভেবল ফিস্ট’ বা ‘চলমান উৎসব’–এর কথা স্মরণ করে তিনি বলেন, নাসরীন জাহান জীবনকে ঠিক তেমনি এক নিরন্তর উৎসবের মতো যাপন করেছেন। গত দুই বছর ধরে কঠিন ব্যাধিতে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন থাকা সত্ত্বেও এবং শরীরে নানা জটিল অস্ত্রোপচারের মধ্য দিয়ে গিয়েও তাঁর সেই জীবনযাপনের চরিত্র বদলায়নি; তিনি এখনো আগের মতোই প্রাণবন্ত, হাস্যোজ্জ্বল ও কৌতুকপ্রিয়।
২০১৭ সালে সাহিত্যে নোবেলজয়ী কাজুও ইশিগুরোর ‘ক্লারা অ্যান্ড দ্য সান’ বইয়ের উদাহরণ টেনে মাজহারুল ইসলাম বলেন, ২০২০ সালের ৯ সেপ্টেম্বর বইটির প্রচ্ছদ উন্মোচন হয়েছিল, আর বইটি প্রকাশিত হয় ২০২১ সালের ২ মার্চ। উন্নত বিশ্বে বই প্রকাশের আগেই প্রচ্ছদ উন্মোচনের রেওয়াজ দীর্ঘদিনের। ‘হারপারকলিন্স’–এর মতো শীর্ষ প্রকাশনা সংস্থাও গুরুত্বপূর্ণ অনেক বইয়ের প্রচ্ছদ প্রকাশের আগেই আনুষ্ঠানিকভাবে পাঠকের সামনে তুলে ধরে। বাংলাদেশে এ ধরনের উদ্যোগ এটি দ্বিতীয়। এর আগে বই প্রকাশের আগেই ফরিদুর রেজা সাগরের একটি বইয়ের প্রচ্ছদ উন্মোচন করা হয়েছিল।
হাসনাত আবদুল হাই আরও বলেন, ‘এই কঠিন শারীরিক সংকটকে জয় করার পেছনে নাসরীনের অদম্য মনোবল কাজ করেছে। তিনি রোগশয্যায় থেকেও প্রতিদিন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অণুকবিতা, অণুগল্প ও প্রবচন লিখে চলছেন, যার প্রতিটিতে রয়েছে গভীর সাহিত্যগুণ ও সমাজের প্রতি দায়বদ্ধতা।’
গল্পকার সেলিম মোরশেদ নাসরীন জাহানের লেখার বর্ণনাভঙ্গি ও জাদুবাস্তবতার প্রশংসা করে বলেন, ‘নাসরীন জাহানের ভেতরে সহজাত লেখকসত্তা এত বেশি, যা বাংলা সাহিত্যে খুব কম লেখকের মধ্যে দেখা যায়। তাঁর লেখার যে শক্তি, তা অনেক সাহিত্য আলোচনায় যথাযথভাবে উঠে আসেনি। তিনি বাইরের বাস্তবতাকে এমন অন্তর্দৃষ্টি ও অনুভূতির মধ্য দিয়ে লেখেন, যা সাধারণ বর্ণনাকেও অন্য মাত্রা দেয়। আমার মনে হয়, তাঁর সাহিত্যকর্ম নিয়ে আরও গভীর আলোচনা হওয়া দরকার।’
গল্পকার ও ঔপন্যাসিক পারভেজ হোসেন আশির দশকের আড্ডার স্মৃতি তুলে ধরে বলেন, ‘নাসরীন জাহানের বিশেষত্ব হলো, তিনি যে জীবন যাপন করেন, যে জীবন দেখেন ও বোঝেন, তার তলে আরেকটি জীবন খুঁজে পান। সেই জীবনের কথা লিখতে গিয়ে তিনি শুধু চিন্তা দিয়ে লেখেন না, তাঁর সমস্ত শরীর, মজ্জা ও সত্তা লেখার সঙ্গে মিশে যায়। এই প্রচেষ্টায় তিনি জীবনের একটা বড় সময় ব্যয় করেছেন। কতটা সফল হয়েছেন, সে আলোচনা আলাদা; কিন্তু জীবনের অন্তরালের জীবনকে সাহিত্যে হাজির করার চেষ্টা তাঁর লেখার বিশেষ জায়গা।’
গবেষক ও কথাশিল্পী ফয়জুল লতিফ চৌধুরী নাসরীন জাহানের সাহিত্যের মনস্তাত্ত্বিক ও গবেষণামূলক দিক নিয়ে আলোচনা করেন।
অনুষ্ঠানের মূল আকর্ষণ, কথাসাহিত্যিক নাসরীন জাহান রোগশয্যা ও শারীরিক নানা প্রতিকূলতা পেছনে ফেলে নিজের অনুভূতি ব্যক্ত করতে গিয়ে বলেন, মৃত্যু নিয়ে কোনো পূর্বপরিকল্পনা ছাড়াই হঠাৎ যখন তিনি লিখতে শুরু করলেন, তখন নিজের ভেতরের এক গভীর বোধ কাজ করেছে। তিনি বলেন, মানুষ সাধারণত মরে যাবে ভেবে যে আক্ষেপ বা হতাশার মধ্যে থাকে, সেই ভাবনাটাকে তিনি একেবারে বন্ধ করে দিয়েছেন। ধরে নিয়েছেন যে তিনি হয়তো এ পৃথিবীতে আসেনইনি, ফলে পৃথিবীর সঙ্গে তাঁর সম্পর্কের দরজা তিনি বন্ধ করতে চাননি।
নিজের ঘুরে দাঁড়ানোর অভিজ্ঞতা তুলে ধরে নাসরীন জাহান বলেন, যখনই তিনি কলম হাতে নেন, মনে হয় মৃত্যু তাঁর সামনে দাঁড়িয়ে বলে—আমাকে নিয়ে লেখো, আমাকে নিয়ে লেখো। কিন্তু তিনি টানা লিখতে শুরু করলে ফ্যান্টাসি বাড়তে থাকে, পৃথিবীর রূপ, রস ও জীবন তাঁর চোখের সামনে নতুন করে ভেসে ওঠে। ছয় মাস আগেও যিনি সেলফি তুলতে পারতেন না, তিনি মোবাইল ধরে কথা বলা ও ফেসবুকে পোস্ট দেওয়া শুরু করেছেন। আর এটিই হয়ে উঠেছে তাঁর বাঁচার ও সজীব থাকার মূল পথ। তিনি বলেন, ‘জীবনের সজীবতা দিয়ে কালো অন্ধকার ও মৃত্যুকে দূরে ঠেলে দিচ্ছি।’