মালয়েশিয়ার কেন্দ্রীয় সরকারি কার্যালয়ে অভ্যর্থনা অনুষ্ঠানে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিম। গতকাল পুত্রজায়ায়
মালয়েশিয়ার কেন্দ্রীয় সরকারি কার্যালয়ে অভ্যর্থনা অনুষ্ঠানে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিম। গতকাল পুত্রজায়ায়

প্রধানমন্ত্রীর মালয়েশিয়া সফর

নানা খাতে সহযোগিতা এগিয়ে নিতে মনোযোগ

শ্রমবাজারের পাশাপাশি নানা খাতে সহযোগিতা এগিয়ে নেওয়ার বিষয় এসেছে যৌথ বিবৃতিতে।

জনশক্তি নিয়োগের পাশাপাশি অগ্রাধিকার ভিত্তিতে সুনির্দিষ্ট কিছু খাত চিহ্নিত করে ব্যবসা ও বিনিয়োগ বাড়াতে সম্মত হয়েছে বাংলাদেশ ও মালয়েশিয়া। এর পাশাপাশি প্রতিরক্ষা খাতে অংশীদারত্বের জন্য ঢাকা ও কুয়ালালামপুর একটি পথনকশা তৈরি করতে একমত হয়েছে।

বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ও মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিমের মধ্যে দ্বিপক্ষীয় বৈঠকের পর গতকাল সোমবার এক যৌথ বিবৃতিতে এ কথা বলা হয়।

কূটনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, শ্রমবাজারের পাশাপাশি নানা খাতে সহযোগিতা এগিয়ে নেওয়ার বিষয়টি প্রতিফলিত হয়েছে যৌথ বিবৃতিতে।
দক্ষিণ–পূর্ব এশিয়ার দেশ মালয়েশিয়ায় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের প্রথম রাষ্ট্রীয় সফর দুই দেশের সম্পর্কের নতুন অধ্যায় রচিত হওয়ার ইঙ্গিত দিচ্ছে।

দুই দিনের মালয়েশিয়া সফরের দ্বিতীয় দিন গতকাল সকালে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান তাঁর স্ত্রী জুবাইদা রহমানকে নিয়ে পুত্রজায়ায় প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে পৌঁছালে প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিম ও তাঁর স্ত্রী ওয়ান আজিজাহ ওয়ান ইসমাইল তাঁদের স্বাগত জানান। সেখানে তাঁদের লালগালিচা সংবর্ধনা দেওয়া হয়।

সংবর্ধনা অনুষ্ঠানের পর প্রথমে একান্ত বৈঠকে মিলিত হন তারেক রহমান ও আনোয়ার ইব্রাহিম। পরে তাঁদের নেতৃত্বে দুই দেশের প্রতিনিধিদলের দ্বিপক্ষীয় বৈঠক হয়। বৈঠকের পর সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে সহযোগিতার বিষয়ে একটি সমঝোতা স্মারকে সই করে দুই দেশ। এ ছাড়া সন্ত্রাসবাদ দমন বিষয়ে গবেষণা ও সক্ষমতা বৃদ্ধিতে সহযোগিতা এবং বিনিয়োগ–সংক্রান্ত বিষয়ে দুটি দ্বিপক্ষীয় দলিল বিনিময় করে বাংলাদেশ ও মালয়েশিয়া। বৈঠক শেষে দুই শীর্ষ নেতা যৌথ সংবাদ সম্মেলনে অংশ নেন।

পরে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান তাঁর সম্মানে মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রীর দেওয়া রাষ্ট্রীয় ভোজসভায় অংশ নেন। মধ্যাহ্নভোজের পর মালয়েশিয়ার রাজা সুলতান ইব্রাহিম ইবনে আলমারহুম সুলতান ইসকান্দারের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন তারেক রহমান এবং তাঁর সহধর্মিণী জুবাইদা রহমান। এ সময় মালয়েশিয়ার রানি জারিথ সোফিয়া উপস্থিত ছিলেন।

প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা ও প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখপাত্র মাহদী আমিন সাংবাদিকদের বলেন, প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে শীর্ষ পাঁচটি প্রতিষ্ঠানের নির্বাহী প্রধানেরা সাক্ষাৎ করেছেন। তাদের মধ্যে আছে পেট্রোনাস গ্রুপ, আজিয়াটা, এয়ার এশিয়া, পেরোডুয়া ও এমএমসি পোর্ট। এ সাক্ষাতের মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে মালয়েশিয়ার সঙ্গে বাংলাদেশের বিনিয়োগ ও বাণিজ্য বৃদ্ধি করা এবং বাংলাদেশের কর্মসংস্থানকে আরও বেগবান করা।

► কর্মী নিয়োগের জন্য নতুন এমওইউর খসড়া তৈরির সিদ্ধান্ত। ► মুক্ত বাণিজ্যচুক্তি নিয়ে আলোচনা করবে দুই দেশ। ► জ্বালানি খাতে বিনিয়োগের অনুরোধ। ► শিক্ষা ও সেমিকন্ডাক্টর শিল্পে সহযোগিতায় সম্মত দুই দেশ।

ফেব্রুয়ারিতে জাতীয় নির্বাচনে জয়ের পর প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার চার মাসের মাথায় গত রোববার তারেক রহমান প্রথম রাষ্ট্রীয় সফরে মালয়েশিয়া যান। সেখান থেকে তিনি গতকাল বিকেলে পাঁচ দিনের সফরে চীনের উদ্দেশে কুয়ালালামপুর ছাড়েন। গতকাল রাতে তিনি চীনের দালিয়ানে পৌঁছান। দালিয়ানে বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামের বার্ষিক সম্মেলনে যোগ দেবেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। এরপর তিনি চীনের রাজধানী বেইজিং যাবেন।

বাবা ও মায়ের পর ছেলের সঙ্গে যুক্ততা

বাংলাদেশ ও মালয়েশিয়ার শীর্ষ নেতারা গতকাল আনুষ্ঠানিক বৈঠকের পর যৌথ সংবাদ সম্মেলনে অংশ নেন।

প্রথম রাষ্ট্রীয় সফরের জন্য মালয়েশিয়াকে বেছে নেওয়ায় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে ধন্যবাদ জানান প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিম। তিনি বলেন, বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর প্রয়াত বাবা ও মায়ের সঙ্গে তাঁর পরিচয় ছিল। একজন যুবনেতা হিসেবে মৌচাক ক্যাম্পে (গাজীপুরে স্কাউটের আন্তর্জাতিক সমাবেশ) তিনি সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছিলেন। আর উপপ্রধানমন্ত্রী হিসেবে সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার সঙ্গে বেশ কয়েকবার দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে দেখা হয়েছিল। এর চেয়েও বড় কথা হলো তারেক রহমান এবং তাঁর পরিবার চরম কষ্ট ও সংগ্রাম সহ্য করেছে।

আনোয়ার ইব্রাহিমকে ধন্যবাদ জানিয়ে তারেক রহমান বলেন, গত ফেব্রুয়ারিতে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করার পর প্রথম শুভেচ্ছা বার্তাগুলোর একটি পেয়েছিলেন প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিমের কাছ থেকে। তিনি মালয়েশিয়া সফরেরও আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন। প্রধানমন্ত্রী হিসেবে প্রথম বিদেশ সফরে স্ত্রীকে সঙ্গে নিয়ে মালয়েশিয়ায় আসতে পেরে অত্যন্ত আনন্দিত।

বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তাঁর বক্তৃতায় সাবেক রাষ্ট্রপতি ও তাঁর বাবার ১৯৭৯ সালে মালয়েশিয়া সফরের প্রসঙ্গ টেনে বলেন, ওই সফর দুই দেশের রাজনৈতিক সম্পর্ককে আরও শক্তিশালী করেছিল এবং শ্রমবিষয়ক সহযোগিতার ভিত্তি স্থাপন করেছিল। তারেক রহমান তাঁর মা ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার ১৯৯৩ সালের মালয়েশিয়া সফরের কথাও স্মরণ করেন।

নতুন অধ্যায়ের সূচনা

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেন, ‘আমি আত্মবিশ্বাসী যে আজকের এ আলোচনা বাংলাদেশ-মালয়েশিয়া সম্পর্কের ক্ষেত্রে একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা করবে।’

বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সম্প্রসারণ, জ্বালানি সহযোগিতা, হালাল অর্থনীতি, কর্মী পাঠানো, সেমিকন্ডাক্টর শিল্প, কৃষি, শিক্ষা ও জন-যোগাযোগসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে দুই দেশের মধ্যে সহযোগিতা বাড়ানোর বিষয়ে আলোচনা হয়েছে বলে জানান তারেক রহমান।

তারেক রহমান বলেন, ‘আমি প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিমকে আরও বেশি বাংলাদেশি কর্মী নিয়োগ এবং দ্রুত শ্রমবাজার উন্মুক্ত করার বিষয়টি বিবেচনার অনুরোধ জানিয়েছি। পাশাপাশি অনিয়মিত শ্রমিকদের বৈধকরণ এবং আটক বাংলাদেশিদের সম্ভাব্য প্রত্যাবাসনের বিষয়টিও উত্থাপন করেছি। আমরা একমত হয়েছি যে শ্রমিক নিয়োগপ্রক্রিয়া হতে হবে স্বচ্ছ, ন্যায্য ও সাশ্রয়ী, যাতে মধ্যস্বত্বভোগীদের ভূমিকা কমে এবং শ্রমিকদের ব্যয় কমে।’

মানবসম্পদ সহযোগিতা, বিশেষ করে অর্থনীতিকে টিকিয়ে রাখার জন্য শ্রমিকদের কথা উল্লেখ করে আনোয়ার ইব্রাহিম বলেন, একই সঙ্গে এই খাত নিয়ে অনেক বিতর্ক ও উদ্বেগও তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে মানবিক দিক, শ্রমিকদের সঙ্গে আচরণ এবং এই পুরো প্রক্রিয়াটিকে আরও স্বচ্ছ ও ন্যায়সংগত করার চ্যালেঞ্জ রয়েছে।

মালয়েশিয়ায় বাংলাদেশি শ্রমিকদের শোষণ ও নিপীড়নের অভিযোগের প্রসঙ্গ টেনে আনোয়ার ইব্রাহিম বলেন, শ্রমিকদের শোষণ করা, তাঁদের সঙ্গে খারাপ আচরণ করা এবং কেবল নিজেদের স্বার্থে তাঁদের ব্যবহার করার এ প্রবণতা কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না। তিনি বলেন, শ্রমিক নিয়োগপ্রক্রিয়াটি যেন স্বচ্ছ হয়, তা নিশ্চিত করতে দুই দেশকে অবশ্যই নেতৃত্ব দিতে হবে; এটি যেন উভয় দেশের চাহিদা মেটানোর পাশাপাশি শ্রমিক ও তাঁদের পরিবারের স্বার্থ রক্ষা করে।

দুই দেশের সম্পর্কোন্নয়নের ওপর গুরুত্বারোপ করে আনোয়ার ইব্রাহিম বলেন, ‘দুই দেশের সম্পর্ক আরও মজবুত করতে আমাদের দ্রুত এফটিএ (মুক্ত বাণিজ্যচুক্তি) সই করা এবং সব খাতে একটি বড় অংশীদারিত্ব তৈরি করার চ্যালেঞ্জ নিতে হবে।’

শ্রমিক নিয়োগে নতুন এমওইউ

বৈঠকের পর এক যৌথ বিবৃতিতে বলা হয়, মালয়েশিয়ায় বাংলাদেশি কর্মীদের অব্যাহত, নিরাপদ ও পারস্পরিক লাভজনক অভিবাসন নিশ্চিত করতে জয়েন্ট ওয়ার্কিং গ্রুপের (জেডব্লিউজি) বৈঠক ডাকার সিদ্ধান্ত হয়েছে। যাতে ওই বৈঠকের আলোচনার সূত্র ধরে কর্মী নিয়োগের বিষয়ে নতুন একটি সমঝোতা স্মারকের (এমওইউ) খসড়া তৈরি করা যায়।

মুক্ত বাণিজ্যচুক্তির পথে

দ্বিপক্ষীয় বৈঠকের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিল মালয়েশিয়া-বাংলাদেশ মুক্ত বাণিজ্যচুক্তির (এমবিএফটিএ) আলোচনা। বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়ায় মালয়েশিয়ার দ্বিতীয় বৃহত্তম ব্যবসায়িক অংশীদার—বিষয়টি তুলে ধরে দুই পক্ষই দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য ও বিনিয়োগ বাড়ানোর ওপর জোর দেয়। ২০২৭ সালের মধ্যে দুই পক্ষের জন্যই লাভজনক একটি মুক্ত বাণিজ্যচুক্তিতে পৌঁছানোর জন্য আলোচনা এগিয়ে নিতে দুই পক্ষই বৈঠকে সম্মত হয়।

জ্বালানি সহযোগিতা

বৈঠকে বাংলাদেশের তরফে জ্বালানি খাতে সহযোগিতা জোরদার করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়। এলএনজি সরবরাহ ও এলএনজি অবকাঠামো গড়ে তোলার ক্ষেত্রে সহযোগিতার বিষয়ে দুই দেশের রাষ্ট্রায়ত্ত কোম্পানি পেট্রোনাস ও পেট্রোবাংলার মধ্যে যে সমঝোতা স্মারক রয়েছে, তার সব সুযোগ কাজে লাগানোর ওপর দুই পক্ষই জোর দেয়।

মালয়েশিয়ার কোম্পানিগুলোকে বঙ্গোপসাগরে তেল ও গ্যাস অনুসন্ধানের পাশাপাশি কয়লা ও চুনাপাথরের মতো খনিজ উত্তোলন এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে রূপান্তরসহ বাংলাদেশের জ্বালানি খাতে বিনিয়োগের আমন্ত্রণ জানানো হয়।

ডিজিটাল ও সেমিকন্ডাক্টর শিল্প

সেমিকন্ডাক্টর শিল্প ও পরিসেবায় মালয়েশিয়ার দক্ষতা ও জ্ঞান বাংলাদেশে দ্রুত বিকাশমান তথ্যপ্রযুক্তি এবং প্রকৌশল খাতের সঙ্গে যুক্ত করতে সম্মত হন দুই প্রধানমন্ত্রী। বৈঠকে বাংলাদেশের পক্ষে একটি দ্বিপক্ষীয় মেধা সহযোগিতা কাঠামো তৈরি করার প্রস্তাব দেওয়া হয়, যার অধীন উভয় দেশ বিশেষজ্ঞ বিনিময় করতে পারবে।

প্রতিরক্ষা ও নিরাপত্তা সহযোগিতা

যৌথ বিবৃতিতে বলা হয়, প্রতিরক্ষা খাতে সহযোগিতার বিষয়ে যে সমঝোতা স্মারক সই হয়েছে, তা পুরোপুরি কার্যকর করার বিষয়ে সিদ্ধান্ত হয়েছে। প্রতিরক্ষা সহযোগিতার পথনকশা ঠিক করতে এ খাতের সহযোগিতা–বিষয়ক যৌথ কমিটির বৈঠক ডাকার বিষয়ে দুই দেশ সম্মত হয়েছে।

সন্ত্রাসবাদ ও সব ধরনের সহিংস চরমপন্থা প্রতিরোধ ও মোকাবিলায় দুই দেশ গোয়েন্দা তথ্য বিনিময়, তথ্য আদান-প্রদান, সক্ষমতা বৃদ্ধির উদ্যোগ, প্রশিক্ষণ কর্মসূচি এবং সর্বোত্তম চর্চা বিনিময়ের মাধ্যমে সহযোগিতার বিষয়ে দুই দেশ সম্মত হয়েছে।