রবি–বাংলালিংকের পাল্টাপাল্টি প্রস্তাব

মুঠোফোন সেবার মান বাড়ানোর অপেক্ষা কি দীর্ঘ হচ্ছে

গ্রামাঞ্চল ও প্রত্যন্ত এলাকায় মুঠোফোনের নেটওয়ার্ক সেবার মান বাড়াতে কম ফ্রিকোয়েন্সির তরঙ্গ গুরুত্বপূর্ণ। এ জন্য ‘ই-জিএসএম’ ব্যান্ডের স্পেকট্রাম বরাদ্দের উদ্যোগ নিয়েছে বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন (বিটিআরসি)।

মোবাইল অপারেটর রবি ও বাংলালিংকের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে বিটিআরসি এই তরঙ্গ নিলামের সিদ্ধান্ত নিলেও এখন বেঁকে বসেছে বাংলালিংক। টেলিযোগাযোগ নীতিমালা চূড়ান্ত না হওয়া পর্যন্ত নিলামের সিদ্ধান্ত পিছিয়ে দেওয়ার অনুরোধ করেছে অপারেটরটি। অন্যদিকে রবি বলছে, সেবার মান বাড়াতে এখনই নিলাম হওয়া উচিত।

মুঠোফোনের সংকেত বা সিগন্যাল চলাচল করে বেতার তরঙ্গের মাধ্যমে। একে অনেকটা টর্চলাইটের আলোর সঙ্গে তুলনা করা যায়। কিছু টর্চের আলো যেমন দূরে যায়, কিছু টর্চের আলো আবার কাছেই ছড়িয়ে পড়ে। মোবাইল নেটওয়ার্কের ক্ষেত্রেও একই বিষয় প্রযোজ্য।

বর্তমানে অপারেটররা যেসব তরঙ্গ ব্যবহার করে, তা দ্রুতগতির ইন্টারনেট দিতে সক্ষম হলেও দেয়াল, ছাদ বা অন্যান্য বাধা সহজে ভেদ করতে পারে না। ফলে টাওয়ার কাছাকাছি থাকলেও ঘরের ভেতরে সিগন্যাল দুর্বল হয়ে যায়।

টেলিযোগাযোগ বিশেষজ্ঞদের মতে, ‘লোয়ার-ব্যান্ড’ তরঙ্গের সুবিধা হলো এটি তুলনামূলক বেশি দূর পর্যন্ত যেতে পারে এবং ভবনের ভেতরেও ভালোভাবে প্রবেশ করতে পারে। এ কারণেই বিশ্বের অনেক দেশে গ্রামীণ কভারেজ উন্নত করতে এই ধরনের তরঙ্গকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়।

মুঠোফোনের সংকেত বা সিগন্যাল চলাচল করে বেতার তরঙ্গের মাধ্যমে। একে অনেকটা টর্চলাইটের আলোর সঙ্গে তুলনা করা যায়। কিছু টর্চের আলো যেমন দূরে যায়, কিছু টর্চের আলো আবার কাছেই ছড়িয়ে পড়ে। মোবাইল নেটওয়ার্কের ক্ষেত্রেও একই বিষয় প্রযোজ্য।

রবি ও বাংলালিংকের আবেদনে বিটিআরসির একটি কারগরি কমিটি ইজিএসএম ব্যান্ডের সুপারিশ করে। গত জুন মাসে মোবাইল অপারেটরদের অতিরিক্ত লোয়ার-ব্যান্ড তরঙ্গ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয় কমিশন। এ ক্ষেত্রে ৮৮০ থেকে ৮৮৮ দশমিক ৪ মেগাহার্টজ এবং ৯২৫ থেকে ৯৩৩ দশমিক ৪ মেগাহার্টজ রেঞ্জের ‘এক্সটেন্ডেড জিএসএম’ বা ইজিএসএম ব্যান্ডকে বেছে নেওয়া হয়েছে।

সে সময় বিটিআরসি চেয়ারম্যান মেজর জেনারেল (অব.) মো. এমদাদ উল বারী প্রথম আলোকে বলেছিলেন, তরঙ্গের দাম নিয়ে সরকারের সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় আছে কমিশন। সিদ্ধান্ত পেলেই এক থেকে দেড় মাসের মধ্যে নিলাম হতে পারে।

তবে নতুন করে নিলাম পেছানোর অনুরোধ করেছে বাংলালিংক। গত ২১ সেপ্টেম্বর বিটিআরসিতে পাঠানো এক চিঠিতে বাংলালিংক বলেছে। সরকার বর্তমানে টেলিযোগাযোগ নীতিমালা চূড়ান্ত করার কাজ করছে। নতুন নীতিতে সংযোগ, ডিজিটাল অন্তর্ভুক্তি, স্পেকট্রাম ব্যবস্থাপনা, বিনিয়োগ ও টেলিযোগাযোগ খাতের দীর্ঘমেয়াদি দিকনির্দেশনা নির্ধারিত হবে। তাই নীতি চূড়ান্ত হওয়ার আগে স্পেকট্রাম বরাদ্দ, নবায়ন, মূল্য ও মেয়াদসংক্রান্ত বড় সিদ্ধান্ত নেওয়া হলে ভবিষ্যৎ নীতির সঙ্গে অসামঞ্জস্য তৈরি হতে পারে।

টেলিযোগাযোগ নীতিমালার সঙ্গে তরঙ্গ নিলামের কোনো সম্পর্ক নেই। বিটিআরসি মন্ত্রণালয়ের কাছে তরঙ্গের ভিত্তিমূল্যের অনুমোদন চেয়েছে। অনুমোদন পেলে তরঙ্গ নিলামের আয়োজন করা হবে।
মেজর জেনারেল (অব) এমদাদ উল বারী, বিটিআরসি চেয়ারম্যান

জানতে চাইলে বাংলালিংকের চিফ করপোরেট অ্যান্ড রেগুলেটরি অ্যাফেয়ার্স অফিসার তাইমুর রহমান প্রথম আলোকে বলেন, বাংলালিংক কভারেজ ও গ্রাহক অভিজ্ঞতা উন্নত করতে ইজিএসএম স্পেকট্রামের কার্যকর ব্যবহারের পক্ষে। তবে আগামী নভেম্বরে তরঙ্গ নবায়ন এবং টেলিযোগাযোগ নীতিমালা চূড়ান্ত হওয়ার প্রক্রিয়ায় রয়েছে। যেখানে তরঙ্গ ভাগাভাগি, এমভিএনওসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বিষয় অন্তর্ভুক্ত হতে পারে। তিনি বলেন, এ প্রেক্ষাপটে নতুন কোনো তরঙ্গ বরাদ্দের সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত নীতিমালার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে নেওয়াই অধিক যুক্তিসংগত হবে।

বাংলালিংকের পর গত ২৪ সেপ্টেম্বর বিটিআরসিতে চিঠি দেয় রবি। চিঠিতে তারা বলেছে, গ্রাহকের ক্রমবর্ধমান চাহিদা পূরণে উচ্চ মানের মুঠোফোন সেবা নিশ্চিত করতে ই-জিএসএম স্পেকট্রাম দ্রুত উন্মুক্ত ও বরাদ্দ করা প্রয়োজন।

রবির ওই চিঠিতে আরও বলা হয়েছে, টেলিযোগাযোগ নীতি চূড়ান্ত হওয়ার সঙ্গে ই-জিএসএম স্পেকট্রাম বরাদ্দের সরাসরি বাধ্যবাধকতা নেই বলেও তারা উল্লেখ করেছে।

তরঙ্গের চাহিদা অপারেটরভেদে ভিন্ন হতে পারে।...রবির গ্রাহকদের জন্য সেবার মান বাড়াতে তরঙ্গের চাহিদা আছে। আমরা সেই কারণেই বিটিআরসিকে অনুরোধ করেছি।
সাহেদ আলম, চিফ করপোরেট অ্যান্ড রেগুলেটরি অফিসার, রবি

রবির চিফ করপোরেট অ্যান্ড রেগুলেটরি অফিসার সাহেদ আলম প্রথম আলোকে বলেন, তরঙ্গের চাহিদা অপারেটরভেদে ভিন্ন হতে পারে। কেউ যদি তরঙ্গ নিতে না চায় সেটা ওই অপারেটরের স্বাধীনতা। তবে রবির গ্রাহকদের জন্য সেবার মান বাড়াতে তরঙ্গের চাহিদা আছে। আমরা সেই কারণেই বিটিআরসিকে অনুরোধ করেছি।

বিটিআরসির হিসাবে দেশে মুঠোফোন গ্রাহকের সংখ্যা ১৯ কোটির বেশি। রাষ্ট্রীয় মোবাইল অপারেটর টেলিটকসহ মোট চারটি অপারেটর মুঠোফোন সেবা দেয়। এদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি গ্রাহক গ্রামীণফোনের। তাদের গ্রাহক ৮ কোটি ৭২ লাখ। দ্বিতীয় অবস্থানে আছে রবি। তাদের গ্রাহক প্রায় ৬ কোটি। আর বাংলালিংকের গ্রাহকসংখ্যা ৩ কোটি ৭৯ লাখের বেশি।

আগামী নভেম্বরে তরঙ্গ নবায়ন এবং টেলিযোগাযোগ নীতিমালা চূড়ান্ত হওয়ার প্রক্রিয়ায় রয়েছে।... নতুন কোনো তরঙ্গ বরাদ্দের সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত নীতিমালার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে নেওয়াই অধিক যুক্তিসংগত হবে।
তাইমুর রহমান, চিফ করপোরেট অ্যান্ড রেগুলেটরি অ্যাফেয়ার্স অফিসার, বাংলালিংক

দুর্গম এলাকায় সেবার মান বাড়াতে গত জুন মাসে ৭০০ মেগাহার্টজ ব্যান্ডের তরঙ্গ চালু করেছে গ্রামীণফোন। রবি ও বাংলালিংক তখন ইজিএসএম ব্যান্ডের তরঙ্গ চেয়েছিল বিটিআরসির কাছে।

গত বৃহস্পতিবার ইজিএসএম ব্যান্ডের তরঙ্গের ভিত্তিমূল্য চূড়ান্ত করতে সরকারের ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগে অনুমোদন চেয়ে চিঠি দিয়েছে বিটিআরসি। চিঠিতে বিটিআরসি জানিয়েছে, কম ‘ইন্টারফেরেন্সযুক্ত ৩ দশমিক ৪ মেগাহার্টজ স্পেকট্রামের ভিত্তিমূল্য প্রতি মেগাহার্টজ ২১৪ কোটি টাকা এবং বেশি ইন্টারফেরেন্সযুক্ত ৫ মেগাহার্টজ স্পেকট্রামের ভিত্তিমূল্য প্রতি মেগাহার্টজ ১৭৮ কোটি টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। এ মূল্য ১৫ বছরের জন্য প্রযোজ্য হবে।

এর আগেও ইজিএসএম ব্যান্ডের তরঙ্গের ভিত্তিমূল্যের চূড়ান্ত অনুমোদনের জন্য টেলিযোগাযোগ বিভাগকে চিঠি দিয়েছিল বিটিআরসি। তবে সে সময় টেলিযোগাযোগ বিভাগ তরঙ্গের দাম নিয়ে স্পষ্ট কোনো মতামত বা সিদ্ধান্ত দেয়নি। ফলে এবার নির্দিষ্ট দাম উল্লেখ করে তা অনুমোদনের জন্য আবার টেলিযোগাযোগ বিভাগের কাছে পাঠিয়েছে নিয়ন্ত্রণ সংস্থা।

জানতে চাইলে বিটিআরসি চেয়ারম্যান মেজর জেনারেল (অব) এমদাদ উল বারী প্রথম আলোকে বলেন, টেলিযোগাযোগ নীতিমালার সঙ্গে তরঙ্গ নিলামের কোনো সম্পর্ক নেই। বিটিআরসি মন্ত্রণালয়ের কাছে তরঙ্গের ভিত্তিমূল্যের অনুমোদন চেয়েছে। অনুমোদন পেলে তরঙ্গ নিলামের আয়োজন করা হবে।