
কোনো ভারতীয় নাগরিককে ঠেলে বাংলাদেশে পাঠানোর কারণে এই প্রথম ভারতের একটি আদালত সরকারকে ক্ষতিপূরণ দিতে বলেছেন। এ ঘটনা ঘটেছে পূর্ব ভারতের রাজ্য আসামে। রাজ্যের সর্বোচ্চ আদালত গুয়াহাটি হাইকোর্ট আসাম সরকারকে নির্দেশ দিয়েছেন, মমতাজ বেগম নামের এক ভারতীয় নাগরিকের স্বামীকে দুই লাখ রুপি অন্তর্বর্তীকালীন ক্ষতিপূরণ দিতে হবে।
মমতাজ বেগম আসামের একজন বাংলাভাষী মুসলিম, যাঁকে বিদেশি চিহ্নিতকরণের ট্রাইব্যুনাল বিদেশি নাগরিক ঘোষণা করার পরে বাংলাদেশে ঠেলে পাঠানো হয়েছিল। এ কাজ নিয়মমাফিক হয়নি, সে কারণে আদালত বিজেপি নেতৃত্বাধীন আসাম সরকারকে এই ক্ষতিপূরণ দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন। ভারতে এটিই প্রথম এমন ঘটনা, যেখানে কাউকে নিয়ম মেনে বাংলাদেশে ‘ডিপোর্ট’ (ফেরত পাঠানো) না করার কারণে রাজ্য সরকারকে ক্ষতিপূরণ দেওয়ার নির্দেশ দিলেন আদালত। ৩ সেপ্টেম্বর গুয়াহাটি আদালত এ নির্দেশ দিলেও বিষয়টি প্রকাশ্যে এসেছে গতকাল মঙ্গলবার।
গত ৩০ মে আসামের একটি ফরেনার্স ট্রাইব্যুনাল মমতাজ বেগমকে বিদেশি বলে ঘোষণা করেছিলেন। হাইকোর্টের নির্দেশে মামলাটি পুনর্বিবেচনার জন্য ট্রাইব্যুনালের সামনে পেশ করা হয়েছিল। পরে রাজ্যের সর্বোচ্চ আদালত দেখেন, কাগজপত্র খতিয়ে না দেখে ও আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ না দিয়ে মমতাজ বেগমকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। পরে তাঁকে একটি ডিটেনশন সেন্টার বা বন্দিশিবিরে নিয়ে যাওয়া হয়। চলতি বছরে ১৪ জুন তাঁকে ভারতের সীমান্তরক্ষী বাহিনীর (বিএসএফ) হাতে তুলে দেওয়া হয়। এরপর শ্রীভূমি (সাবেক করিমপুর) জেলার একটি আন্তর্জাতিক সীমান্ত অঞ্চল দিয়ে বাংলাদেশে ঠেলে পাঠানো হয়।
এরপর মধ্য আসামের নগাঁও জেলার জুরিয়ার বাসিন্দা মমতাজ বেগমের স্বামী মোজাম্মেল হক স্ত্রীর খোঁজে একটি ‘হেবিয়াস কর্পাস’ দায়ের করেন। সেই আবেদনের শুনানি চলাকালে হাইকোর্টের বিচারপতি কল্যাণ রায় সুরানা ও বিচারপতি সুস্মিতা ফুকন খাউন্দের বেঞ্চ গত সপ্তাহে ক্ষতিপূরণের এ নির্দেশ দেন।
আদালত বলেন, ‘আটক ব্যক্তিকে আবেদনকারী (নারীর স্বামী) বা পরিবারের কোনো প্রাপ্তবয়স্ক সদস্যকে কোনো তথ্য না দিয়ে ভারত থেকে বের করে দেওয়া হয়েছে...তাই একটি অন্তর্বর্তীকালীন উপশমমূলক ব্যবস্থা হিসেবে আদালত আসাম সরকারকে আবেদনকারীকে দুই লাখ টাকার অন্তর্বর্তীকালীন ক্ষতিপূরণ দেওয়ার নির্দেশ দিচ্ছে।’ বেঞ্চ রাজ্য সরকারকে ৬০ দিনের মধ্যে এই অর্থ মেটানোর নির্দেশ দিয়েছেন। বলেছেন, আবেদনকারী চাইলে দেওয়ানি আদালত থেকে আরও আইনি প্রতিকার চাইতে পারেন।
একই সঙ্গে আদালত জানিয়েছে, মমতাজ বেগম বাংলাদেশে কোথায় রয়েছেন, তা চিহ্নিত করতে হবে এবং তারপর তাঁকে দ্রুত ভারতে ফিরিয়ে আনতে হবে। বিচারপতিরা ট্রাইব্যুনালের সমালোচনা করে বলেন, ওই নারীকে আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ দেওয়া হয়নি। ট্রাইব্যুনাল চত্বর থেকেই তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়, এ সম্পর্কে পরিবারের কাউকে কিছু জানানোর আগেই তাঁকে ঠেলে দেওয়া হয় বাংলাদেশে। এ কাজ বিদেশি চিহ্নিতকরণের জন্য গঠিত ট্রাইব্যুনাল করতে পারেন না। কারণ, তাঁরা একটি পূর্ণাঙ্গ বিচারব্যবস্থার অংশ, হাইকোর্টের মতো।
আসামের প্রচারমাধ্যম জানাচ্ছে, ফরেনার্স ট্রাইব্যুনাল জানিয়েছিলেন, মমতাজ নিজের নাগরিকত্ব প্রমাণ করতে পারেননি। পরে হাইকোর্ট ট্রাইব্যুনালকে এ তথ্য যাচাই করতে বলেন। হাইকোর্টের সেই আদেশ নিয়ে মমতাজ ট্রাইব্যুনালে পৌঁছালে শুনানির ব্যবস্থা না করে উল্টো গ্রেপ্তারের নির্দেশ দেন। মমতাজের আইনজীবী স্থানীয় প্রচারমাধ্যমকে জানিয়েছিলেন, ট্রাইব্যুনালের নির্দেশের কপিও তাদের দেওয়া হয়নি।
উল্লেখ্য, গত চার বছরে আসাম সরকার প্রায় ১ লাখ ৩০ হাজার মানুষকে সন্দেহজনক ভোটার আখ্যা দিয়েছে। এর জন্য বেশ কয়েকবার উচ্চ আদালতের তোপের মুখে পড়তে হয়েছে সরকারকে। মমতাজকে ১৯৯৭ সালে সন্দেহভাজন ভোটার হিসেবে প্রথম আখ্যা দেওয়া হয়েছিল। ২০১৭ সালে মমতাজকে বলা হয়, তিনি ভারতের নাগরিক নন। ট্রাইব্যুনালের রায়ের বিরুদ্ধে হাইকোর্টে যান মমতাজ। হাইকোর্ট পুনর্বিবেচনার রায় দিলে পুনরায় সেটি ট্রাইব্যুনালে যায়, আর এরপরই বিষয়টি বিবেচনা না করে ট্রাইব্যুনাল তাঁকে বিদেশি হিসেবে দাগিয়ে দেন।
গুয়াহাটি হাইকোর্ট ফরেনার্স ট্রাইব্যুনালের বিচারক বিপুলকুমার নাথের সমালোচনা করে বলেন, মনে হয় কোনো ব্যক্তিগত বিদ্বেষের কারণে এ ধরনের রায় দেওয়া হয়েছে। আইনে বলা আছে, কোনো ব্যক্তিকে তখনই বহিষ্কার করা যায়, যখন তিনি আইনগত পদ্ধতিতে সব রকমভাবে নাগরিকত্বের প্রমাণ দিতে ব্যর্থ হয়েছেন। কিন্তু মমতাজ বেগমকে নাগরিকত্ব প্রমাণ করার কোনো সুযোগই দেওয়া হয়নি। অসন্তুষ্ট হাইকোর্ট আসামের স্বরাষ্ট্র বিভাগকে নির্দেশ দিয়েছেন, মমতাজের মামলায় ট্রাইব্যুনাল যে রায় দিয়েছিলেন, সেই রায়ের তারিখ ও সময়ের বিষয়টি তদন্ত করে দেখতে হবে। খোঁজ নিতে হবে ট্রাইব্যুনালের কোন কম্পিউটারে তাদের নির্দেশ টাইপ করা হয়েছে এবং বিচারক কখন সেই রায় লিখেছেন। ট্রাইব্যুনাল সদস্যের সেই কম্পিউটার বাজেয়াপ্ত করারও কথা বলা হয়েছে।
প্রচারমাধ্যম সূত্রে জানা যাচ্ছে, মমতাজের পরিবার জানিয়েছে যে গ্রেপ্তারের দিন দুপুর সাড়ে ১২টা নাগাদ তিনি আদালতে আসেন আর এর আধা ঘণ্টার মধ্যেই তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়। মনে করা হচ্ছে, ট্রাইব্যুনাল রায় লিখতে ইচ্ছা করে দেরি করছেন। সেই সুযোগে মমতাজকে গ্রেপ্তার করে মাটিয়া ডিটেনশন সেন্টারে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। পরে তাঁকে দেশের বাইরে ঠেলে দেওয়া হয়। এ জন্যই আসাম সরকারকেই অন্তর্বর্তী ক্ষতিপূরণ বাবদ এখনই দুই লাখ টাকা দিতে হবে।