সেন্টার ফর গভর্ন্যান্স স্টাডিজ (সিজিএস) আয়োজিত ‘জাতীয় নিরাপত্তা এবং আইনশৃঙ্খলা: গণতান্ত্রিক শাসনের চ্যালেঞ্জ’ শীর্ষক নীতি সংলাপে অংশগ্রহণকারীরা। আজ সোমবার সকালে।
সেন্টার ফর গভর্ন্যান্স স্টাডিজ (সিজিএস) আয়োজিত ‘জাতীয় নিরাপত্তা এবং আইনশৃঙ্খলা: গণতান্ত্রিক শাসনের চ্যালেঞ্জ’ শীর্ষক নীতি সংলাপে অংশগ্রহণকারীরা। আজ সোমবার সকালে।

সিজিএসের নীতি সংলাপ

নিরাপত্তার প্রশ্নে মানুষের আস্থা নষ্ট হলে রাষ্ট্র দুর্বল হয়ে পড়ে

গণতন্ত্র ছাড়া জাতীয় নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। নিরাপত্তার প্রশ্নে মানুষের আস্থা নষ্ট হলে রাষ্ট্র শক্তিশালী হয় না, বরং দুর্বল হয়ে পড়ে।

সেন্টার ফর গভর্ন্যান্স স্টাডিজ (সিজিএস) আয়োজিত ‘জাতীয় নিরাপত্তা এবং আইনশৃঙ্খলা: গণতান্ত্রিক শাসনের চ্যালেঞ্জ’ শীর্ষক  নীতি সংলাপে এমন বক্তব্য উঠে এসেছে। আজ সোমবার সিরডাপ মিলনায়তনে এই সংলাপ হয়েছে। এতে রাজনৈতিক নেতা, সুশীল সমাজের প্রতিনিধি, শিক্ষাবিদ, আইনজীবী এবং মানবাধিকারকর্মীরা অংশ নেন।

সিজিএসের সভাপতি জিল্লুর রহমান বলেন, ভারত ও মিয়ানমারের সঙ্গে সীমান্ত পরিস্থিতি, রাজনৈতিক দলগুলোর প্রস্তুতির ঘাটতি এবং নির্বাচন ঘনিয়ে আসায় নিরাপত্তা উদ্বেগ বেড়েছে। ২০২৬ সালের নির্বাচনের প্রেক্ষাপটে রাষ্ট্র, প্রতিষ্ঠান ও জনগণ কতটা প্রস্তুত, তা গভীরভাবে ভাবার সময় এসেছে বলেন তিনি।

সংলাপে জাতীয় নিরাপত্তা ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষার নামে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার প্রয়োগ, গণতান্ত্রিক শাসনের চ্যালেঞ্জ, নাগরিক অধিকার সুরক্ষা এবং জাতীয় নির্বাচনের প্রেক্ষাপটে জাতীয় নিরাপত্তা ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ভূমিকা ও জবাবদিহি নিয়ে আলোচনা করা হয়।

পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক (আইজিপি) এম এনামুল হক বলেন, নতুন নতুন কমিশন গঠনের পরিবর্তে একটি মাত্র কমিশনের মাধ্যমে পূর্ববর্তী কমিশনগুলোর কাজের জবাবদিহি নিশ্চিত করা উচিত।

বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য ও সাবেক সংসদ সদস্য জহির উদ্দিন স্বপন বলেন, বাংলাদেশের মতো দেশে জাতীয় নিরাপত্তা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ; রাষ্ট্র এতে ব্যর্থ হলে গণতন্ত্র গুরুতর চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ে। তিনি বলেন, আসন্ন নির্বাচনের পর বাংলাদেশে নতুন নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জ দেখা দেবে এবং জাতীয় ও আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপটে পুরোনো নিরাপত্তাব্যবস্থার সংস্কার প্রয়োজন হবে। এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় ঐক্য অপরিহার্য বলেন তিনি।

সাবেক রাষ্ট্রদূত মুন্সী ফয়েজ আহমদ অভিযোগ করেন, বর্তমান সরকার মবের কাছে নতজানু অবস্থানে রয়েছে এবং জুলাই বিপ্লবের পর পুলিশ ও আমলাতন্ত্র পুনরুজ্জীবিত করার বদলে তাদের অপরাধী হিসেবে চিহ্নিত করায় রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান দুর্বল হচ্ছে। এসব বাহিনীর মনোবল ফিরিয়ে আনা জরুরি বলে তিনি মন্তব্য করেন।

অধ্যাপক আবু সাঈদ বলেন, নিরাপত্তা, জবাবদিহি ও বিশ্বাসযোগ্য নির্বাচন নিশ্চিত না হলে জন আস্থা আরও দুর্বল হবে এবং গণতান্ত্রিক স্থিতিশীলতা ক্ষতিগ্রস্ত হবে।

গণফোরামের সভাপতি সুব্রত চৌধুরী বলেন, সামরিক শাসন, অন্তর্বর্তী সরকার বা নির্বাচিত সরকার—কোনোটির অধীনেই দেশের চরিত্রগত মৌলিক পরিবর্তন হয়নি।

বাংলাদেশ জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলের (জাসদ) প্রেসিডিয়াম সদস্য মোশতাক হোসেন বলেন, দেশের নিরাপত্তাব্যবস্থা আসলে কাদের জন্য, সাধারণ মানুষের নাকি কেবল উচ্চপর্যায়ের ব্যক্তিদের জন্য—এই মৌলিক প্রশ্নটি উপেক্ষিত থেকে যাচ্ছে। জাতীয় নিরাপত্তা নিয়ে গঠনমূলক আলোচনা বাড়াতে হবে এবং অতিরিক্ত ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণ থেকে সরে আসতে হবে বলেন তিনি।

নৈতিক সমাজ বাংলাদেশ-এর সংগঠক মেজর জেনারেল (অব.) আমসা আমিন বলেন, জাতীয় নিরাপত্তা জোরদার করতে জাতীয় নিরাপত্তা কাউন্সিল এবং একটি পুলিশ কাউন্সিল গঠন করা প্রয়োজন।

বর্তমানে বাংলাদেশ একটি ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতিতে পড়ে গেছে বলে উল্লেখ করেন সিপিবির সভাপতি কাজী সাজ্জাদ জহির চন্দন। তিনি বলেন, জাতীয় নিরাপত্তা ভবিষ্যতে কেমন হবে, সেটা যাঁরা ক্ষমতায় আসবেন, তাঁদের আচরণের ওপরও নির্ভর করছে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষক জাহেদ উর রহমান বলেন, নির্বাচিত সরকারের হাত ধরেই অনেক সময় শাসনব্যবস্থা ফ্যাসিবাদী রূপ নেয়। জুলাই আন্দোলনের পর রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে বিভাজন বেড়েছে উল্লেখ করে তিনি সতর্ক করেন, অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন নিশ্চিত না হলে দেশ গৃহযুদ্ধের ঝুঁকিতে পড়তে পারে।

সংলাপে অংশ নেন সাবেক প্রতিমন্ত্রী গোলাম সারওয়ার মিলন, খেলাফত মজলিসের যুগ্ম মহাসচিব মোস্তাফিজুর রহমান ফয়সাল, অবসরপ্রাপ্ত মেজর জেনারেল মনিরুল ইসলাম আকন্দ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক আলী আকবর, মুক্তিযোদ্ধা, লেখক ও গবেষক মেজর (অব.) এ এস এম শামসুল আরেফিন, অবসরপ্রাপ্ত সেনা কর্মকর্তা লেফটেন্যান্ট কর্নেল উ কান থেইন, আইনজীবী মোহাম্মদ আলী, বাংলাদেশ রাষ্ট্র সংস্কার আন্দোলনের নেতা ইবনুল সায়েদ রানা, আইনজীবী এম সারোয়ার হোসেন, বাংলাদেশ সমাজতান্ত্রিক দলের নেতা নিখিল দাস, শিক্ষক ও রাজনীতিবিদ মোশাররফ আহমেদ ঠাকুর প্রমুখ।