
গণমাধ্যম সংস্কারে সরকার সব পক্ষকে সঙ্গে নিয়ে এগোতে চায় বলে জানিয়েছেন তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন। তিনি বলেছেন, এ পর্যন্ত গণমাধ্যম সংস্কার নিয়ে যেসব আলোচনা, সুপারিশ ও নীতিগত প্রস্তাব এসেছে, সেগুলোই ভবিষ্যৎ কাজের ভিত্তি হিসেবে বিবেচনা করা হবে। এ লক্ষ্যে একটি পরামর্শ কমিটি গঠন করা হবে এবং সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের মতামতের ভিত্তিতে চূড়ান্ত প্রস্তাব তৈরি করা হবে।
‘পাবলিক ইন্টারেস্ট মিডিয়া অ্যান্ড হেলদি ইনফরমেশন এনভায়রনমেন্ট (পিআইএমএইচআইই)’ প্রকল্পের অভিজ্ঞতা বিনিময় সভায় প্রধান অতিথি ছিলেন তথ্যমন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন। আজ বুধবার বিকেলে রাজধানীর গুলশানের একটি হোটেলে যুক্তরাজ্যের ফরেন, কমনওয়েলথ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট অফিসের অর্থায়নে পরিচালিত ‘পিআইএমএইচআইই’ প্রকল্পের আওতায় এ সভার আয়োজন করে বিবিসি মিডিয়া অ্যাকশন।
জহির উদ্দিন স্বপন বলেন, গণমাধ্যম খাত নিয়ে ইতিমধ্যে সম্পাদক, গণমাধ্যমমালিক ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে আলোচনা হয়েছে। পরামর্শ কমিটি গঠনের পর আবারও সব অংশীজনের সঙ্গে আলোচনা করা হবে। তিনি বলেন, ‘এ পর্যন্ত যেসব আলোচনা ও নথিপত্র তৈরি হয়েছে—সবই আমাদের ভবিষ্যৎ কাজের গুরুত্বপূর্ণ উপাদান।’ গণমাধ্যম সংস্কার শুধু সরকারের একক দায়িত্ব নয়, এটি সরকার, গণমাধ্যম, উন্নয়ন সহযোগী ও নাগরিক সমাজ—সব পক্ষের যৌথ দায়িত্ব বলেও তিনি মন্তব্য করেন।
সরকার একদিকে যেমন এ খাতের অংশীদার হিসেবে কাজ করবে, অন্যদিকে রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে একটি সমন্বয়কারীর ভূমিকাও পালন করবে বলে উল্লেখ করেন তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী। তিনি বলেন, লক্ষ্য থাকবে জনগণের জন্য সুস্থ ও দায়িত্বশীল তথ্যপ্রবাহ নিশ্চিত করা।
জহির উদ্দিন স্বপন বলেন, উন্নয়ন সহযোগী, সাংবাদিক সংগঠন এবং গণমাধ্যম–সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সহযোগিতাকে সরকার ইতিবাচকভাবে দেখছে। সবাইকে সঙ্গে নিয়েই একটি জবাবদিহিমূলক ও পেশাদার গণমাধ্যমব্যবস্থা গড়ে তোলা সম্ভব।
গণমাধ্যমের সঙ্গে সংঘাত নয়
প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা জাহেদ উর রহমান বলেন, সরকার গণমাধ্যমের সঙ্গে সংঘাত নয়, বরং অংশীদারত্বের ভিত্তিতে কাজ করতে চায়। তিনি বলেন, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ক্ষুণ্ন করে এমন আইন ও নীতিমালা থেকে সরকার সরে আসতে চায় এবং এ বিষয়ে সাংবাদিক ও সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের মতামত গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হবে।
বিভ্রান্তিকর তথ্য ও অপতথ্যের বিস্তার ঠেকাতে কার্যকর পদক্ষেপ প্রয়োজন হলেও তা কোনোভাবেই যেন মতপ্রকাশের স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপে পরিণত না হয়, সে বিষয়ে সরকার সতর্ক থাকবে বলে উল্লেখ করেন জাহেদ উর রহমান। গণতান্ত্রিক সরকার গণমাধ্যমকে প্রতিপক্ষ হিসেবে দেখে না উল্লেখ করে তিনি বলেন, ভবিষ্যতে যেকোনো নীতিগত সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে সংশ্লিষ্ট সবার সঙ্গে আলোচনা করে স্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় এগোনো হবে।
গণমাধ্যম গণতন্ত্রের অন্যতম ভিত্তি
সংলাপে বাংলাদেশে নিযুক্ত ব্রিটিশ হাইকমিশনার সারাহ কুক বলেন, গণমাধ্যমের স্বাধীনতা শুধু সেন্সরশিপের অনুপস্থিতি নয়, এর সঙ্গে জড়িত শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান, পেশাগত মানদণ্ড ও জবাবদিহির সংস্কৃতি। তিনি বলেন, স্বাধীন ও বহুমাত্রিক গণমাধ্যম গণতন্ত্রের অন্যতম ভিত্তি, যা ক্ষমতাসীনদের জবাবদিহির মধ্যে রাখে এবং জনগণের আস্থা গড়ে তোলে। তবে বাংলাদেশের গণমাধ্যম খাত এখনো সীমাবদ্ধ আইনি কাঠামো, রাজনৈতিক ও বাণিজ্যিক চাপ, অপতথ্যের বিস্তার এবং সাংবাদিকদের নিরাপত্তাহীনতার মতো নানা চ্যালেঞ্জের মুখে রয়েছে বলে উল্লেখ করেন তিনি।
সারাহ কুক বলেন, গণমাধ্যম সংস্কার কমিশনের সুপারিশ এবং সরকারের সংস্কার উদ্যোগ বাংলাদেশে একটি কার্যকর ও স্বাধীন গণমাধ্যমব্যবস্থা গড়ে তোলার সুযোগ তৈরি করেছে।
গণমাধ্যমের সুস্থ বিকাশে কার্যকর গণতন্ত্র, আইনের শাসন ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্বারোপ করেন সাবেক গণমাধ্যম সংস্কার কমিশনের প্রধান কামাল আহমেদ। তিনি বলেন, দেশে এখনো একটি পূর্ণাঙ্গ কার্যকর গণতান্ত্রিক পরিবেশ গড়ে ওঠেনি। ফলে গণমাধ্যমসহ কোনো ক্ষেত্রেই পুরোপুরি সুস্থ পরিস্থিতি প্রত্যাশা করা কঠিন। গণতন্ত্র মানে শুধু নির্বাচন নয়; বরং আইনের শাসন, জবাবদিহি ও ভিন্নমতের প্রতি পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ নিশ্চিত হওয়া জরুরি উল্লেখ করে তিনি বলেন, অন্তর্বর্তী সরকার গণমাধ্যম সংস্কারের বিষয়ে ইতিবাচক বার্তা দিলেও এখন প্রয়োজন সুস্পষ্ট রূপরেখা—কোন সংস্কার কীভাবে, কত দিনের মধ্যে এবং কাদের অংশগ্রহণে বাস্তবায়ন করা হবে, তা স্পষ্ট করা দরকার।
কামাল আহমেদ বলেন, বাংলাদেশের গণমাধ্যম খাত বর্তমানে কালোটাকার প্রভাব, মালিকানার কেন্দ্রীভবন ও করপোরেট স্বার্থের চাপে সংকটের মুখে রয়েছে। একের পর এক গণমাধ্যম কিছু ‘অলিগার্কের’ নিয়ন্ত্রণে চলে যাওয়ায় জনস্বার্থভিত্তিক সাংবাদিকতার জায়গা সংকুচিত হচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে মালিকপক্ষের স্বার্থ রক্ষার জন্য গণমাধ্যমে তথ্য বিকৃতি পর্যন্ত ঘটছে বলে অভিযোগ করেন তিনি। এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় স্থায়ী গণমাধ্যম কমিশন গঠন, লাইসেন্সিং নীতিমালার সংস্কার এবং গণমাধ্যমে বিনিয়োগের উৎস প্রকাশ বাধ্যতামূলক করার প্রস্তাব দেন কামাল আহমেদ।
অনুষ্ঠানে গত ১৫ মাসে প্রকল্পটির অভিজ্ঞতা, অর্জন ও ভবিষ্যৎ করণীয় তুলে ধরা হয়। প্রকল্পের অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন বিবিসির সিনিয়র মিডিয়া ডেভেলপমেন্ট অফিসার আরাফাত আলী সিদ্দিক। বিবিসি মিডিয়া অ্যাকশনের সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, প্রকল্পের আওতায় সম্প্রচার সাংবাদিকদের জন্য দেশের প্রথম নীতিমালা প্রণয়ন ও প্রকাশ, সংবাদকক্ষের জন্য যৌন হয়রানি প্রতিরোধ ও প্রতিক্রিয়া নির্দেশনা তৈরি, নির্বাচনকালীন সংবাদ পরিবেশন নির্দেশিকা ও ই-পুস্তিকা উন্নয়ন এবং গণমাধ্যম সংস্কার নিয়ে রাজনৈতিক দল ও বিভিন্ন অংশীজনের সঙ্গে সংলাপ আয়োজন করা হয়।
বিবিসি মিডিয়া অ্যাকশনের মিডিয়া ডেভেলপমেন্ট ম্যানেজার রাশেদুল হাসানের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানের প্রথম পর্বে স্বাগত বক্তব্য দেন বিবিসি মিডিয়া অ্যাকশনের ডিরেক্টর অব প্রোগ্রাম রিচার্ড লেইস। এরপর বিবিসি মিডিয়া অ্যাকশনের কান্ট্রি ডিরেক্টর মো. আল মামুনের সঞ্চালনায় সংলাপে আরও বক্তব্য দেন ব্রডকাস্ট জার্নালিস্ট সেন্টারের চেয়ারম্যান ও যমুনা টেলিভিশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ফাহিম আহমেদ।