অফিস সহকারী থেকে যুক্তরাষ্ট্রে পিএইচডি, এবার সেখানেই ওষুধ তৈরির গবেষণাগারে তিনি

আশুতোষ নাথ শিক্ষাবৃত্তি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে যান ২০২১ সালের আগস্টে
ছবি: আশুতোষ নাথের সৌজন্যে

জীবনে কম সংগ্রাম করেননি আশুতোষ নাথ। খাগড়াছড়ির প্রত্যন্ত এলাকা থেকে উঠে আসা এই মানুষটি পড়াশোনার খরচ চালাতে একসময় দোকানে কাজ করেছেন। চাকরি করেছেন অফিস সহকারী হিসেবে। নানা প্রতিকূলতা পেরিয়ে সেই আশুতোষ পিএইচডি করতে যুক্তরাষ্ট্রে পাড়ি জমিয়েছিলেন। পিএইচডি শেষে এখন সেই দেশে যোগ দিচ্ছেন ওষুধ উদ্ভাবনের গবেষণায়।

সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি ছবি প্রকাশ করেছিলেন আশুতোষ নাথ। ছবিতে মা–বাবাকে সঙ্গে নিয়ে তাঁকে পিএইচডি ডিগ্রি উদযাপন করতে দেখা যায়। ফোনে কথা হলো আশুতোষের সঙ্গে। জানালেন, চলতি মাসেই ইউনিভার্সিটি অব হিউস্টনে কলেজ অব ফার্মেসিতে পিএইচডি–পরবর্তী গবেষক হিসেবে যোগ দিতে যাচ্ছেন। সেখানে তাঁর গবেষণার অন্যতম ক্ষেত্র হবে ওষুধবিষয়ক রসায়ন, যেখানে নতুন ওষুধ উদ্ভাবনে গবেষণাও করতে হবে তাঁকে।

আশুতোষ শতভাগ শিক্ষাবৃত্তি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে যান ২০২১ সালের আগস্টে। সে বছরের জুনে তাঁকে নিয়ে প্রথম আলোয় একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছিল। শিরোনাম ছিল, ‘অফিস সহকারী থেকে যুক্তরাষ্ট্রে পিএইচডির পথে’। ইউনিভার্সিটি অব ম্যাসাচুসেটস বোস্টন (ইউম্যাস বোস্টন) থেকে জৈব রসায়নে পিএইচডি শেষ করে এবার জীবনের নতুন অধ্যায়ের গল্প লিখছেন ৩৪ বছর বয়সী আশুতোষ।

গল্পের শুরুটা ছিল সংগ্রামের

আশুতোষের জন্ম চট্টগ্রামের ফটিকছড়ির এক প্রত্যন্ত গ্রামে; কিন্তু সেখানে জীবনসংগ্রামে টিকতে না পেরে বাবা মিলন নাথ পাড়ি জমান খাগড়াছড়ির মানিকছড়িতে। সেখানেও জীবন সহজ ছিল না। ধান ভাঙার মেশিন নিয়ে এলাকায় ঘুরে ঘুরে যা আয় হতো, তা দিয়েই সংসার চালাতেন মা নিয়তী দেবী। দুই ভাই ও তিন বোনের মধ্যে আশুতোষ সবার ছোট। ভাই–বোনেরা কেউ উচ্চমাধ্যমিকের গণ্ডি পেরোতে পারেননি।

ভবিষ্যতে আরও বড় পরিসরে কাজ করতে চান আশুতোষ। তাঁর লক্ষ্য—মানুষের চিকিৎসায় নতুন ও কার্যকর ওষুধ উদ্ভাবনের গবেষণায় সর্বোচ্চ অবদান রাখা।

সবার ছোট আশুতোষের ওপর বাড়তি ভালোবাসা ছিল বড় ভাই পরিতোষ নাথের। পোশাক সেলাইয়ের কাজ করতেন তিনি। আয়ের বড় একটি অংশই খরচ করতেন আশুতোষের পড়াশোনায়। বড় ভাইয়ের এই ত্যাগ আশুতোষকে সামনে এগিয়ে যেতে সবচেয়ে বড় উৎসাহ দিয়েছিল। আশুতোষের কথায়, ‘ভাইয়ের জন্যই আমার সেরাটা দিয়ে পড়াশোনা করার চেষ্টা করেছি।’

তবে কখনো বাবা, কখনো ভাইকে কাজে সাহায্য করতে গিয়ে পড়াশোনায় সেভাবে মন দিতে পারেননি বলে জানান আশুতোষ। তবু ভালো কিছু করার তাগিদ থেকেই মানিকছড়ির রানী নিহার দেবী সরকারি উচ্চবিদ্যালয় থেকে মাধ্যমিকে জিপিএ ৪.১৯ এবং মানিকছড়ি গিরী মৈত্রী কলেজ থেকে উচ্চমাধ্যমিকে বিজ্ঞান বিভাগ থেকে জিপিএ-৪.৫০ পেয়ে পাস করেন।

ইউনিভার্সিটি অব ম্যাসাচুসেটস বোস্টন ক্যাম্পাসে বাবা–মায়ের সঙ্গে আশুতোষ নাথ

স্কুল-কলেজের গণ্ডি পেরোনোর পর আশুতোষের জীবনে আরেক সংগ্রাম শুরু হয়। আশুতোষ বলেন, ‘বড় ভাই পড়াশোনার খরচ দিতেন। তবে কাজের সন্ধানে তিনি দুবাই চলে যান; কিন্তু সেখানে খুব একটা সুবিধা করতে না পেরে আবার দেশে ফিরে আসেন। এরপর খরচের ভয়ে আমি আর ভালো কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ভর্তি হওয়ার সাহস করিনি।’

এরপর চট্টগ্রামের সরকারি হাজী মুহাম্মদ মহসিন কলেজে রসায়ন বিভাগে স্নাতকে ভর্তি হন আশুতোষ। তখন পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়ার জন্য বইয়ের খরচ জোগানো কঠিন ছিল তাঁর জন্য। চট্টগ্রাম শহরের চকবাজারে কম্পিউটারের দোকানে কাজ নেন তিনি। সেখান থেকে যা আয় হতো, তা দিয়ে নিজে চলতেন, বাড়িতে কিছু পাঠাতেন। এমন করেই চলছিল দিন।

চট্টগ্রাম থেকে ঢাকায়

তখন ২০১৪ সাল। স্নাতক তৃতীয় বর্ষে পড়ছিলেন আশুতোষ। ঢাকায় অ্যাটর্নি জেনারেলের কার্যালয়ে অফিস সহকারী কাম কম্পিউটার অপারেটর পদে চাকরির জন্য আবেদন করেন। ২০১৬ সালে সেই চাকরি পেয়ে চলে আসেন ঢাকায়। তবে যে বেতন পেতেন, তা দিয়ে সংসার চলত না। তাই রাত জেগে ফ্রিল্যান্সিং শুরু করেন তিনি। কেননা, তাঁর কম্পিউটারে প্রয়োজনীয় দক্ষতা ছিল। আশুতোষ বলেন, ‘ছাত্র অবস্থায় এসব কাজ শিখেছিলাম। ২০১৮ সালে আমি এ কাজ করে দুই লাখ টাকার বেশি আয় করি।’

২০২১ সালের আগস্টে প্রথম আলোতে প্রকাশিত এই প্রতিবেদন সযত্নে রেখেছেন আশুতোষ নাথ

স্নাতকে ৩.১৬ সিজিপিএ নিয়ে পাস করেন আশুতোষ। এরপর ঠিক করলেন, ঢাকা কলেজ থেকে রসায়নে স্নাতকোত্তর করবেন। ভর্তি হয়ে তিন দিন ক্লাসও করেছিলেন। এ সময় বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ে (বুয়েট) রসায়নে স্নাতকোত্তর শ্রেণিতে ভর্তির বিজ্ঞপ্তি প্রকাশিত হয়। ভাবলেন, একবার চেষ্টা করে দেখি। চেষ্টা সফল হলো। ভাইভা দিয়ে বুয়েটে সুযোগ পেয়ে গেলেন আশুতোষ। বিশ্ববিদ্যালয়টি অফিসের পাশে হওয়ায় পড়ালেখাতেও সুবিধা হয়েছিল। ২০১৯ সালে ৩.০৮ সিজিপিএ নিয়ে স্নাতকোত্তর শেষ করেন তিনি।

স্বপ্নের শুরু

বুয়েটে পড়ার সময়ই মূলত গবেষণায় আশুতোষের ঝোঁক তৈরি হয়েছিল আশুতোষের। সে সময় আন্তর্জাতিক বিভিন্ন জার্নালে তাঁর গবেষণাপত্র প্রকাশ পায়। আশপাশের অনেককে বিশ্বের নানা বিশ্ববিদ্যালয়ে আবেদন করতেও দেখেছিলেন তিনি। আশুতোষ তখন নিজেকে আরও উচ্চতায় নিয়ে যাওয়ার স্বপ্ন দেখেন। প্রয়োজনীয় কাগজপত্র ঠিক করে বিশ্বের নানা প্রতিষ্ঠিত বিশ্ববিদ্যালয়ে আবেদন পাঠাতে শুরু করেন। ২০২১ সালের মার্চের শেষ দিকে ইউনিভার্সিটি অব ম্যাসাচুসেটস বোস্টন তাঁর কাগজপত্র যাচাই-বাছাই করে। তারপর কয়েক দফা ভার্চ্যুয়াল ভাইভা নিয়ে পিএইচডি ডিগ্রির জন্য তাঁর আবেদন গ্রহণ করে।

অধ্যাপক ওয়েই ঝাংয়ের তত্ত্বাবধানে পিএইচডি করেছেন আশুতোষ। তাঁর গবেষণার মূল বিষয় ছিল জটিল পলিহেটেরোসাইক্লিক অণু তৈরির আরও কার্যকর পদ্ধতি উদ্ভাবন।

তখন আশুতোষ বলেছিলেন, সবকিছুই তাঁর কাছে স্বপ্নের মতো মনে হচ্ছিল। পিএইচডির জন্য যুক্তরাষ্ট্রে যাওয়ার আগেই ইউনিভার্সিটি অব ম্যাসাচুসেটস বোস্টনে শিক্ষা সহকারী হিসেবে খণ্ডকালীন চাকরিও পেয়েছিলেন। বাংলাদেশে শিক্ষাজীবনে তাঁর ফল হয়তো অতটা ভালো ছিল না। তবে বিভিন্ন জার্নালে প্রকাশিত তাঁর গবেষণাপত্রগুলোই যুক্তরাষ্ট্রে গবেষণার সুযোগ করে দিয়েছিল।

পিএইচডিতে পাঁচ বছরের গবেষণা

অধ্যাপক ওয়েই ঝাংয়ের তত্ত্বাবধানে পিএইচডি করেছেন আশুতোষ। তাঁর গবেষণার মূল বিষয় ছিল জটিল পলিহেটেরোসাইক্লিক অণু তৈরির আরও কার্যকর পদ্ধতি উদ্ভাবন। পিএইচডির সময় অর্গানিক সিনথেসিস, রিঅ্যাকশন অপটিমাইজেশন, পিউরিফিকেশন, এনএমআর, এলসি-এমএস, এইচপিএলসি, ক্রিস্টালোগ্রাফি, ডিএফটি ক্যালকুলেশন, মলিকিউলার ডকিং এবং ড্রাগ ডিজাইনসহ বিভিন্ন কৌশল ও বিশ্লেষণ–পদ্ধতিতে কাজ করেছেন তিনি।

ইউনিভার্সিটি অব ম্যাসাচুসেটস বোস্টন ক্যাম্পাসে শিক্ষকদের সাথে আশুতোষ নাথ

গবেষণার সুযোগ আশুতোষকে নিজের বিশ্ববিদ্যালয়ের বাইরেও নিয়ে গেছে। হার্ভার্ড মেডিকেল স্কুল ও বোস্টন চিলড্রেনস হসপিটালে গবেষকদের সঙ্গে ছোট অণুভিত্তিক ও প্রিসিশন ভ্যাকসিন উদ্ভাবন–সংক্রান্ত গবেষণায় সহযোগিতা করেছেন তিনি। তাঁর পিএইচডি গবেষণা থেকে একাধিক পিয়ার-রিভিউড গবেষণাপত্র প্রকাশিত হয়েছে। এর মধ্যে আন্তর্জাতিক সাময়িকী অর্গানিক লেটারস–ও রয়েছে।

আশুতোষের ভাষ্য, পিএইচডি করার সময় গবেষণাগারের প্রতিটি দিন সাফল্যের ছিল না। একটি বিক্রিয়া নিয়ে দিনের পর দিন কাজ করেও কাঙ্ক্ষিত ফল না পাওয়া কিংবা প্রত্যাশার বিপরীত ফল পাওয়া ছিল গবেষকজীবনের অংশ। এসব অভিজ্ঞতাকেই নিজের জন্য বড় শিক্ষা মনে করেন আশুতোষ। তাঁর ভাষায়, পিএইচডি তাঁকে শুধু রসায়ন শেখায়নি; শিখিয়েছে ধৈর্য, সমস্যা সমাধান করা, স্বাধীনভাবে চিন্তা করা এবং ব্যর্থতার পর আবার নতুন করে শুরু করাটাও।

এবার লক্ষ্য ওষুধ উদ্ভাবন

আশুতোষ চলতি মাসে যোগ দিচ্ছেন ইউনিভার্সিটি অব হিউস্টনের কলেজ অব ফার্মেসিতে অধ্যাপক গ্রেগ কুনির গবেষণাগারে। এখানে তাঁর গবেষণার পরিধিও বদলাবে। এত দিন মূলত সিনথেটিক অর্গানিক কেমিস্ট্রি নিয়ে কাজ করেছেন। এবার সেই অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগাবেন মেডিসিনাল কেমিস্ট্রি ও ওষুধ আবিষ্কারে। জৈবিকভাবে সক্রিয় ক্ষুদ্র অণু ও ফার্মাকোলজিক্যাল প্রোবের নকশা, সংশ্লেষণ, বৈশিষ্ট্য নির্ণয় এবং সেগুলোকে আরও কার্যকর করার গবেষণায় যুক্ত হবেন তিনি।

আশুতোষ জানান, ভবিষ্যতে আরও বড় পরিসরে কাজ করতে চান। সিনথেটিক কেমিস্ট্রি ও মেডিসিনাল কেমিস্ট্রির সঙ্গে কম্পিউটেশনাল মডেলিং ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) যুক্ত করতে চান। তাঁর লক্ষ্য—মানুষের চিকিৎসায় নতুন ও কার্যকর ওষুধ উদ্ভাবনের গবেষণায় সর্বোচ্চ অবদান রাখা।