যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়াবিষয়ক বিশেষ দূত সার্জিও গর
যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়াবিষয়ক বিশেষ দূত সার্জিও গর

বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির গতিপথ বুঝতে আসছেন ট্রাম্পের বিশেষ দূত, সফরে কী করবেন

বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির অগ্রাধিকার ও গতিপথ সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা নিতে যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়াবিষয়ক বিশেষ দূত সার্জিও গর ৩০ জুলাই ঢাকায় আসছেন। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের বেইজিং সফর, বিভিন্ন দেশের সঙ্গে বাংলাদেশের সাম্প্রতিক যুক্ততা এবং সাম্প্রতিক আঞ্চলিক কূটনৈতিক তৎপরতার প্রেক্ষাপটে এ সফরকে তাৎপর্যপূর্ণ মনে করছেন কূটনৈতিক বিশ্লেষকেরা।

তিন দিনের সফরের প্রথম দিনে সার্জিও গর প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমানের সঙ্গে বৈঠক করবেন। সফরকালে তিনি রাজনৈতিক দলের নেতা, পেশাজীবী ও নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিদের সঙ্গেও মতবিনিময় করতে পারেন। শেষ দিনে কক্সবাজারে রোহিঙ্গা শরণার্থীদের পরিস্থিতি সরেজমিনে দেখার কথা রয়েছে তাঁর। সরকারের উচ্চপর্যায়ের একজন কর্মকর্তা এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন।

এই জানা–বোঝার ভিত্তিতে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের মেয়াদকালে আগামী দুই বছরে বাংলাদেশ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতির দিকনির্দেশনা পুনর্নির্ধারণ হতে পারে। এমন প্রেক্ষাপটে সার্জিও গরের ঢাকা সফরের বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে।

কূটনৈতিক সূত্রগুলোর মতে, সার্জিও গরের সফরে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির বর্তমান অগ্রাধিকার, আঞ্চলিক কৌশলগত অবস্থান এবং ঢাকা–ওয়াশিংটন সম্পর্কের ভবিষ্যৎ নিয়ে আলোচনা গুরুত্ব পাবে। বিশেষ করে জুনে অনুষ্ঠিত প্রধানমন্ত্রীর চীন সফর, একই মাসে পররাষ্ট্রমন্ত্রীর মস্কো সফর এবং তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর ঢাকা সফরের পর বাংলাদেশের কৌশলগত অবস্থান নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে যে আগ্রহ তৈরি হয়েছে, সেই প্রেক্ষাপটে ওয়াশিংটনের মূল্যায়নও এ সফরে প্রতিফলিত হতে পারে।

গত ফেব্রুয়ারিতে বিএনপি সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর মার্চে যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়াবিষয়ক সহকারী পররাষ্ট্রমন্ত্রী পল কাপুর এবং মে মাসে দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়াবিষয়ক সহকারী বাণিজ্য প্রতিনিধি ব্রেন্ডান লিঞ্চ বাংলাদেশ সফর করেন।

জানতে চাইলে জেনেভায় জাতিসংঘ মিশনে বাংলাদেশের সাবেক স্থায়ী প্রতিনিধি এবং নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটির সাউথ এশিয়া ইনস্টিটিউট অব পলিসি অ্যান্ড গভর্ন্যান্সের (এসআইপিজি) জ্যেষ্ঠ গবেষণা ফেলো মুহাম্মদ সুফিউর রহমান প্রথম আলোকে বলেন, নতুন সরকার আসার পর থেকে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সঙ্গে বাংলাদেশের যুক্ততা এবং পররাষ্ট্রনীতির ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার বিষয়ে সার্জিও গর ঢাকায় স্পষ্ট ধারণা নেওয়ার চেষ্টা করবেন। এই জানা–বোঝার ভিত্তিতে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের মেয়াদকালে আগামী দুই বছরে বাংলাদেশ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতির দিকনির্দেশনা পুনর্নির্ধারণ হতে পারে। এমন প্রেক্ষাপটে সার্জিও গরের ঢাকা সফরের বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে।

নিজের আর অন্যের চোখে দেখা

বর্তমান সরকারের আমলে চীন, রাশিয়া, তুরস্ক, ইউরোপীয় ইউনিয়নসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশ ও জোটের সঙ্গে বাংলাদেশের যুক্ততার বিষয়গুলো দৃশ্যমান। বাংলাদেশে নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর শুরুতে ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের ইতিবাচক পথে এগোনোর আভাস ছিল, কিন্তু দুই দেশের সম্পর্কে এখনো অস্বস্তি রয়ে গেছে।

আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকদের মতে, সার্জিও গর এ সফরের মধ্য দিয়ে দ্বিপক্ষীয় ও আন্তর্জাতিক সম্পর্কের পরিসরে সামগ্রিকভাবে বাংলাদেশের কূটনীতি ভবিষ্যতে কোন নির্দেশনায় চলবে, সে বিষয়ে স্পষ্ট ধারণা পেত চাইবেন। এ ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের দিক থেকে তিনটি বিষয়ে বিশেষ গুরুত্ব থাকতে পারে। প্রথমত, চীন নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের অস্বস্তি কারও অজানা নয়। ফলে স্বল্প ও দীর্ঘ মেয়াদে চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্কের সমীকরণ কেমন হবে, তা তিনি বোঝার চেষ্টা করবেন।

দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের দিকটি বিবেচনায় নিলে সার্জিও গরের এ সফরের অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও কৌশলগত তাৎপর্য রয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে সার্জিও গর

দ্বিতীয় বিষয়টি হচ্ছে বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পাদিত সম্পূরক বাণিজ্যচুক্তি বা এআরটির কার্যকারিতা। এ চুক্তিতে আছে পুরোপুরি বাজারভিত্তিক নয়, এমন কোনো দেশের সঙ্গে বাংলাদেশ মুক্ত বাণিজ্য বা অগ্রাধিকারমূলক অর্থনৈতিক চুক্তি করতে পারবে না। এমনটা ঘটার পর আলোচনার মাধ্যমে কোনো সুরাহা না হলে যুক্তরাষ্ট্র চুক্তি বাতিল করে আগের পারস্পরিক শুল্কহার পুনর্বহাল করতে পারবে।

ফলে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের দিকটি বিবেচনায় নিলে সার্জিও গরের এ সফরের অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও কৌশলগত তাৎপর্য রয়েছে।

তৃতীয়ত, স্বল্প ও দীর্ঘ মেয়াদে ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক নিয়ে বাংলাদেশের পরিকল্পনা জানতে চাওয়া। কারণ, সরকারি স্তরে ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের যোগাযোগ কমে যাওয়ায় যুক্তরাষ্ট্র এ সফরের মাধ্যমে দুই প্রতিবেশীর সম্পর্কের ভবিষ্যৎ কোন পথে যাবে, সেটাও বুঝতে চাইতে পারে।

নয়াদিল্লিকে কার্যক্রমের কেন্দ্র হিসেবে রেখে তিনি ভারতের পাশাপাশি বাংলাদেশ, নেপাল, শ্রীলঙ্কা, ভুটানসহ দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত সম্পর্ক এগিয়ে নেওয়ার দায়িত্ব পালন করছেন। দক্ষিণ এশিয়ায় চীনের ক্রমবর্ধমান প্রভাবের প্রেক্ষাপটে বিশেষ দূত হিসেবে তাঁর নিয়োগকে অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব, আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা এবং ভারত-প্রশান্ত মহাসাগরীয় কৌশলকে আরও সমন্বিতভাবে এগিয়ে নেওয়ার ট্রাম্প প্রশাসনের প্রচেষ্টার অংশ হিসেবে দেখা হচ্ছে।

সার্জিও গরের সফরের গুরুত্ব

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ২০২৫ সালের আগস্টে ব্যবসায়ী, রাজনীতিবিদ ও হোয়াইট হাউসে প্রেসিডেন্ট দপ্তরের সাবেক কর্মকর্তা সার্জিও গরকে মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়াবিষয়ক বিশেষ দূত হিসেবে নিয়োগ দেন। ওই পদে নিয়োগের পর থেকে তিনি ওয়াশিংটনের আঞ্চলিক কূটনীতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র হিসেবে আবির্ভূত হয়েছেন। এ বছরের জানুয়ারিতে তিনি দিল্লিতে যুক্তরাষ্ট্রের সর্বকনিষ্ঠ রাষ্ট্রদূত হিসেবে কাজ শুরু করেন। নয়াদিল্লিকে কার্যক্রমের কেন্দ্র হিসেবে রেখে তিনি ভারতের পাশাপাশি বাংলাদেশ, নেপাল, শ্রীলঙ্কা, ভুটানসহ দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত সম্পর্ক এগিয়ে নেওয়ার দায়িত্ব পালন করছেন। দক্ষিণ এশিয়ায় চীনের ক্রমবর্ধমান প্রভাবের প্রেক্ষাপটে বিশেষ দূত হিসেবে তাঁর নিয়োগকে অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব, আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা এবং ভারত-প্রশান্ত মহাসাগরীয় কৌশলকে আরও সমন্বিতভাবে এগিয়ে নেওয়ার ট্রাম্প প্রশাসনের প্রচেষ্টার অংশ হিসেবে দেখা হচ্ছে।

সার্জিও গর বিশেষ দূত হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর তাঁর শ্রীলঙ্কা ও নেপাল সফর সেই আঞ্চলিক কৌশলেরই প্রতিফলন। গত মার্চে তিনি শ্রীলঙ্কা সফরে প্রেসিডেন্ট অনূঢ়া কুমারা দিশানায়েকে এবং দেশটির জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করেন। সেখানে আলোচনায় বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সম্প্রসারণ, ভারত মহাসাগরীয় সামুদ্রিক নিরাপত্তা এবং আঞ্চলিক সহযোগিতা গুরুত্ব পায়।

বিশেষ করে প্রধানমন্ত্রীর সদ্য সমাপ্ত চীন সফরসহ বিভিন্ন দেশের সঙ্গে বাংলাদেশের যুক্ততাকে বিবেচনায় নিয়ে তিনি বাংলাদেশের নতুন সরকারের পররাষ্ট্রনীতির অভিমুখ সম্পর্কে বুঝতে চাইবেন।
বিআইপিএসএস-বিপস প্রেসিডেন্ট মেজর জেনারেল (অব.) আ ন ম মুনীরুজ্জামান

এরপর ৩০ এপ্রিল থেকে ২ মে পর্যন্ত নেপাল সফরে প্রধানমন্ত্রী বালেন্দ্র শাহ, পররাষ্ট্রমন্ত্রী শিশির খানাল, অর্থমন্ত্রী স্বর্ণিম ওয়াগলে, ক্ষমতাসীন জোটের জ্যেষ্ঠ নেতা এবং বেসরকারি খাতের প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠক করেন সার্জিও গর। আলোচনায় দ্বিপক্ষীয় সহযোগিতা, গণতান্ত্রিক সুশাসন, বিনিয়োগ, অর্থনৈতিক সংস্কার এবং আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা নিয়ে কথা বলেন। এটি ছিল নেপালে নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর ট্রাম্প প্রশাসনের কোনো জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তার প্রথম কাঠমান্ডু সফর।

সার্জিও গরের বাংলাদেশ সফর নিয়ে জানতে চাইলে নিরাপত্তা বিশ্লেষক ও গবেষণাপ্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব পিস অ্যান্ড সিকিউরিটি স্টাডিজের (বিআইপিএসএস-বিপস) প্রেসিডেন্ট মেজর জেনারেল (অব.) আ ন ম মুনীরুজ্জামান এ বিষয়ে প্রথম আলোকে বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়ার বিশেষ দূত হিসেবে সার্জিও গরের প্রথম বাংলাদেশ সফর বেশ তাৎপর্যপূর্ণ। বিশেষ করে প্রধানমন্ত্রীর সদ্য সমাপ্ত চীন সফরসহ বিভিন্ন দেশের সঙ্গে বাংলাদেশের যুক্ততাকে বিবেচনায় নিয়ে তিনি বাংলাদেশের নতুন সরকারের পররাষ্ট্রনীতির অভিমুখ সম্পর্কে বুঝতে চাইবেন। আন্তর্জাতিক পরিসর নিয়ে বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা জানা-বোঝার ভিত্তিতে দুই দেশের সম্পর্কের পরিসর নিয়ে বিশেষ দূত হিসেবে তাঁর ভূমিকা রাখার সুযোগ আছে।