কোলাজ: প্রথম আলো গ্রাফিকস
কোলাজ: প্রথম আলো গ্রাফিকস

প্রথম আলো ফ্যাক্ট চেক

জগদল উচ্চবিদ্যালয়ে মারামারির দাবিতে ছড়ানো ভিডিওটি পশ্চিমবঙ্গের মালদহের

‘শিক্ষিকা ও ছাত্রছাত্রীদের মধ্যে তুমুল মারামারি ও চুল টানাটানি!’—এমন দাবি করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি ভিডিও ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। ভিডিওটি শেয়ার করে কোথাও দাবি করা হচ্ছে, ঘটনাটি দিনাজপুরের বীরগঞ্জ উপজেলার জগদ্দলা উচ্চবিদ্যালয়ের; আবার কোথাও বলা হচ্ছে, এটি কিশোরগঞ্জের নান্দাইলের ঘটনা।

একটি পোস্টে ভিডিওটির ক্যাপশনে লেখা হয়েছে, ‘বীরগঞ্জ উপজেলা জগদ্দলা উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষিকা ও ছাত্রছাত্রীদের সঙ্গে হাতাহাতি ঘিরে চাঞ্চল্য হয়েছে দেশজুড়ে।’ অন্য একটি পোস্টে দাবি করা হয়েছে, ‘জগদ্দলা উচ্চবিদ্যালয়ের মহিলা শিক্ষিকা ও পুরুষ শিক্ষকের সঙ্গে ছাত্রছাত্রীদের হাতাহাতি।’

প্রথম লিংক, দ্বিতীয় লিংক, তৃতীয় লিংক, চতুর্থ লিংক, পঞ্চম লিংক

এ ছাড়া কোনো কোনো পোস্টে ‘জুলাই-এর হাত ধরে নতুন বাংলাদেশ!!! জগদ্দল উচ্চবিদ্যালয়ের শিক্ষিকা ও ছাত্রছাত্রীদের মারামারি!’—এমন ক্যাপশনও দেওয়া হয়েছে।

২ মিনিট ২১ সেকেন্ডের ভিডিওটিতে দেখা যায়, বিদ্যালয়ের ইউনিফর্ম পরা কয়েকজন শিক্ষার্থী ও এক নারী মারামারিতে জড়িয়ে পড়েছেন। একপর্যায়ে এক ব্যক্তি এসে তাঁদের থামানোর চেষ্টা করেন। আশপাশে আরও শিক্ষার্থীকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যায়। ভিডিওর শেষ দিকে ঘটনাস্থলে থাকা শিক্ষার্থীদের সরে যেতে দেখা যায়।

প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত ভিডিওটি বাংলাদেশের বিভিন্ন জেলার ঘটনা হিসেবে এবং সামগ্রিকভাবে বাংলাদেশের ঘটনা দাবি করে ৫০টির বেশি ফেসবুক পেজ ও প্রোফাইল থেকে প্রচার করা হয়েছে। কেউ কেউ ভিডিওটি ব্যবহার করে নতুন কনটেন্টও তৈরি করেছেন। মন্তব্যগুলো পর্যালোচনা করে দেখা যায়, অনেক ব্যবহারকারী ঘটনাটিকে বাংলাদেশের কোনো বিদ্যালয়ের ঘটনা মনে করে প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন।

প্রথম লিংক, দ্বিতীয় লিংক, তৃতীয় লিংক, চতুর্থ লিংক, পঞ্চম লিংক

ভিডিওটি আসলে পশ্চিমবঙ্গের

উৎস যাচাই করে দেখা যায়, ভিডিওটি বাংলাদেশের কোনো বিদ্যালয়ের ঘটনা নয়। ঘটনাটি ভারতের পশ্চিমবঙ্গের মালদহ জেলার বামনগোলা থানার অন্তর্গত ‘জগদলা উচ্চবিদ্যালয়ের’।

পশ্চিমবঙ্গের ‘জগদলা উচ্চবিদ্যালয়’ এবং বাংলাদেশের বিভিন্ন জেলার ‘জগদল উচ্চবিদ্যালয়’ নামের মধ্যে মিল রয়েছে। এই নামের মিলের কারণেই ভারতের ঘটনাটি বাংলাদেশের বিদ্যালয়ের ঘটনা হিসেবে ছড়িয়ে পড়েছে বলে প্রতীয়মান হয়।

আলোচিত ভিডিওর কয়েকটি স্থিরচিত্র রিভার্স ইমেজ সার্চ করে পশ্চিমবঙ্গের মালদহের জগদলা হাইস্কুলের ঘটনা নিয়ে প্রকাশিত প্রতিবেদন ও ভিডিও পাওয়া যায়। এসব প্রতিবেদনে থাকা ভিডিওর দৃশ্যের সঙ্গে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়ানো ভিডিওটির হুবহু মিল পাওয়া যায়।

প্রথম লিংক, দ্বিতীয় লিংক, তৃতীয় লিংক

২২ আগস্ট ভারতীয় সংবাদমাধ্যমে ‘স্কুলের ছাত্রের সঙ্গে কর্মীর চুলোচুলি! মালদহের স্কুলের ভিডিয়ো ভাইরাল’ শিরোনামে প্রকাশিত প্রতিবেদনেও একই ঘটনার ভিডিও পাওয়া যায়। প্রকাশিত প্রতিবেদনগুলো থেকে জানা যায়, জগদলা হাইস্কুলের এক সাবেক শিক্ষার্থীর স্কুল সার্টিফিকেট দেওয়া নিয়ে বিরোধের সূত্রপাত হয়। ওই শিক্ষার্থীর বর্তমান সংশোধিত নাম অনুযায়ী সার্টিফিকেট দেওয়ার দাবি করা হয়েছিল। তবে স্কুলের নারী শিক্ষাকর্মী জানান, প্রতিষ্ঠানের নথিতে যে নাম রয়েছে, সেই নাম অনুযায়ীই সার্টিফিকেট দেওয়া হবে।

প্রথম লিংক, দ্বিতীয় লিংক

এরপর ওই সাবেক শিক্ষার্থীর পক্ষ নিয়ে দ্বাদশ শ্রেণির এক শিক্ষার্থীসহ কয়েকজন ছাত্রী ওই নারী শিক্ষাকর্মীর সঙ্গে হাতাহাতি ও মারামারিতে জড়িয়ে পড়েন। স্কুল চলাকালে এ ঘটনা ঘটায় সেখানে উত্তেজনা সৃষ্টি হয়।

প্রতিবেদনগুলোতে আরও বলা হয়েছে, সার্টিফিকেট দেওয়াকে কেন্দ্র করে সংঘর্ষের ঘটনায় নারী শিক্ষাকর্মীকে মারধরের অভিযোগ ওঠে। ঘটনাটি পরে স্থানীয় থানা ও শিক্ষামন্ত্রীর দপ্তর পর্যন্ত গড়ায় এবং বিষয়টি তদন্তের নির্দেশ দেওয়া হয়।

এখানে একটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ—ফেসবুকের পোস্টগুলোতে ওই নারীকে ‘শিক্ষিকা’ বলা হলেও প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী তিনি একজন নারী শিক্ষাকর্মী, শিক্ষক নন।

বাংলাদেশের জগদল উচ্চবিদ্যালয়ে ঘটেনি

বাংলাদেশেও ‘জগদল উচ্চবিদ্যালয়’ নামে একাধিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান রয়েছে। দিনাজপুর, পঞ্চগড় ও ঠাকুরগাঁওয়ে থাকা এসব বিদ্যালয়ের নামের সঙ্গে পশ্চিমবঙ্গের মালদহের ‘জগদলা উচ্চবিদ্যালয়’-এর নামে মিল রয়েছে।

প্রথম লিংক, দ্বিতীয় লিংক, তৃতীয় লিংক ,চতুর্থ লিংক, পঞ্চম লিংক

দিনাজপুরের বীরগঞ্জে অবস্থিত জগদল উচ্চবিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মো. এমদাদুল হকের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি প্রথম আলোকে জানান, তাঁদের প্রতিষ্ঠানে এ ধরনের কোনো ঘটনা ঘটেনি। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাঁদের বিদ্যালয়ের নাম ব্যবহার করে যে দাবি ছড়ানো হচ্ছে, তা সম্পূর্ণ মিথ্যা ও ভিত্তিহীন।

একই বিদ্যালয়ের দুজন সহকারী শিক্ষকও ফেসবুকে প্রকাশিত একটি ভিডিওতে জানান, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়ানো মারামারির ঘটনাটি তাঁদের বিদ্যালয়ের নয়; এটি ভারতের পশ্চিমবঙ্গের মালদহের ঘটনা।

লিংক: এখানে