গানের সুর আর বৃষ্টির সুরছন্দ মিলে গিয়েছিল মঙ্গলবার বর্ষার বিকেলে। রাজধানীর ধানমন্ডির বেঙ্গল শিল্পালয়ে বাংলা গানের কিংবদন্তি শিল্পী ফেরদৌসী রহমান এলেন তাঁর আত্মজীবনী গ্রন্থের প্রকাশনা অনুষ্ঠানে। তাঁকে অভিনন্দন জানাতে এলেন সংগীত, সাহিত্য, সংস্কৃতিজগতের গুণীজনেরা। কথা হলো। স্মৃতির পাতা উল্টে গেলেন তাঁর সহশিল্পী আরেক কিংবদন্তি শিল্পী সৈয়দ আব্দুল হাদী। আর গান তো হলোই এই মনোরম আয়োজনে।
প্রথমা প্রকাশন প্রকাশ করেছে শিল্পী ফেরদৌসী রহমানের আত্মজীবনী লোকে বলে প্রেম, আমি বলি জ্বালা। তাঁর গাওয়া বিখ্যাত গানের চরণ থেকেই বইটির নামকরণ। শিল্পী বলেছেন গান তাঁর কাছে জীবনের মতোই। এই ‘প্রেম’ সেই গানের প্রতি। আর গানকে ভালোবাসার জন্য যে কঠিন শ্রম-সাধনা করতে হয়েছে, সেটাই ‘জ্বালা’।
লেখক হিসেবে ফেরদৌসী রহমান যে ব্যাখ্যাই দেন না কেন, আড়ালে অন্য কিছু আছে কি না বলে রসিকতা করলেন সৈয়দ আব্দুল হাদী। বললেন, তাঁদের ভাই-বোনের মতো সম্পর্ক। দুজনেই একই বছর ১৯৫৮ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়েছিলেন। আবার ১৯৬৫ সালে ডাকবাবু নামের বাংলা সিনেমায় তাঁরা দুজন প্রথম দ্বৈত সংগীত গেয়েছিলেন। অনেক দিনের অনেক কথা নতুন করে স্মরণ করে তিনি বললেন, ছাত্রজীবনেই শিল্পী ফেরদৌসী রহমান অনেক জনপ্রিয় ছিলেন। তবে তাঁর সৌন্দর্যেরও অনুরাগী ছিলেন অনেকে। তাঁরা তাঁর পানিপ্রার্থীও ছিলেন। কিন্তু তাঁর অত্যন্ত সংযত ও ব্যক্তিত্বপূর্ণ জীবনযাপনের কারণে সবাইকে দূরে সরিয়ে রাখতে পেরেছিলেন।
আব্দুল হাদী আরও বলেন, ফেরদৌসী রহমান তাঁর বাবা বিখ্যাত শিল্পী আব্বাসউদ্দীন আহমদের কারণে উপমহাদেশের অনেক গুণী সংগীতজ্ঞের সান্নিধ্যে এসেছিলেন। তাঁদের কাছে অনেক শিখতে পেরেছেন এবং সেই শিক্ষার পরিচয় তাঁর গানে রয়েছে। সব ধরনের গান তাঁর কণ্ঠে প্রাণ পেয়েছে। তিনি সংগীত ও পারিবারিক জীবনে সব ক্ষেত্রেই সফল হয়েছেন। সংগীতজীবনে তিনি যেমন সফল, তেমনি সমাজজীবনেও তিনি বাঙালি নারীর আদর্শ প্রতিচ্ছবি।
শিল্পী ফেরদৌসী রহমান মিলনায়তনে প্রবেশ করলে দর্শকেরা উঠে দাঁড়িয়ে উষ্ণ অভিনন্দন জানান। বেঙ্গল গ্রুপ লিমিটেডের চেয়ারম্যান আবুল খায়ের ও বেঙ্গল ফাউন্ডেশনের মহাপরিচালক লুভা নাহিদ চৌধুরী তাঁকে ফুল দিয়ে শুভেচ্ছা জানান।
আনুষ্ঠানিকতা শুরু হয়েছিল ফেরদৌসী রহমানের দুটি গান ‘লোকে বলে প্রেম’ ও ‘আমি সাগরের নীল’ পরিবেশনা দিয়ে। গান দুটি গেয়ে শোনান শিল্পী অনুপমা মুক্তি। গিটারে ছিলেন শাকিল মোহাম্মদ দীপন। সঞ্চালক মেরিনা ইয়াসমিন শিল্পী ফেরদৌসী রহমানের সংক্ষিপ্ত জীবনী তুলে ধরেন। বইটি প্রকাশনার প্রেক্ষাপট সম্পর্কে বলেন গীতিকবি কবির বকুল।
বই নিয়ে আলোচনায় কণ্ঠশিল্পী রুমানা মোর্শেদ কনকচাঁপা বলেন, ফেরদৌসী রহমান আধুনিক, নজরুলসংগীত, ধ্রুপদি সংগীত, পল্লিগীতিসহ সব রকমের গান সমান দক্ষতার সঙ্গে গেয়েছেন। প্রতিটি গানেই সফল হয়েছেন। তাঁর মতো শিল্পী উপমহাদেশে বিরল। একই সঙ্গে ব্যক্তিমানুষ হিসেবেও তিনি অতি বিনয়ী, অমায়িক। কনকচাঁপা বলেন, ‘তাঁকে আমরা আদর্শ হিসেবে, মূল্যায়নের মাপকাঠি হিসেবে মনে করি। তিনি আমাদের গানের যমুনা নদী, আমাদের হিমালয় পর্বত।’
শিল্পী ফেরদৌসী রহমান বক্তব্য দিতে গিয়ে আবারও তাঁর বিনয়ী বৈশিষ্ট্যের পরিচয় দিলেন। বললেন, এই বৃষ্টির দিনে তাঁর জন্য ঘরভরা এত মানুষ অপেক্ষা করছেন, এতে তিনি অভিভূত। বললেন, মানুষ তাঁকে এত ভালোবাসেন, তিনি ভাবতে পারছেন না। কারণ, এটি কোনো গানের অনুষ্ঠান নয়। একটা বই নিয়ে আয়োজন, সেখানে এত মানুষ এসেছেন, শুধু তাঁকে ভালোবাসেন বলেই যে তাঁরা এসেছেন—এ জন্য তিনি সবার প্রতি ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন।
বইটি সম্পর্কে শিল্পী ফেরদৌসী রহমান বলেন, ‘নিজে বিশেষ কোনো কাজ করতে পেরেছি বলে মনে হয় না। তবে বইটিতে অনেক মানুষের কথা আছে। অনেক বিষয় আছে। বিশেষ করে পুরোনো দিনের ঢাকা কেমন ছিল, তখনকার পরিবেশ, অনেক খাদ্য, পুরোনো দিনে ঢাকার কোথায় কী হতো, যা এখন আর হয় না, বিলুপ্ত হয়ে যাওয়া অনেক আচার–অনুষ্ঠান—এসব আছে। বইটি পড়লে সেসব জানা যাবে।’ তিনি নিজের জন্য দোয়া কামনা করে কথা শেষ করেন।
শেষে শ্রোতাদের ধন্যবাদ জানান প্রথম আলো সম্পাদক ও প্রথমার প্রকাশক মতিউর রহমান। তিনি বলেন,ফেরদৌসী রহমান শুধু দেশের একজন শ্রেষ্ঠ শিল্পীই নন, তিনি সেরা ছাত্রীও ছিলেন। প্রবেশিকা পরীক্ষায় মেয়েদের মধ্যে প্রথম হয়েছিলন, দৈনিক আজাদ পত্রিকায় কৃতী ছাত্রী হিসেবে তাঁর ছবি প্রকাশিত হয়েছিল। দুই বছর পরে মাধ্যমিকেও তিনি মেয়েদের মধ্যে প্রথম স্থান ধরে রেখেছিলেন। এই আত্মজীবনীতে তিনি তাঁর পরিবার, উপমহাদেশের গুণী সংগীতজ্ঞ, ঢাকার পরিবেশ, ইতিহাস-ঐতিহ্য, সংস্কৃতিসহ বিভিন্ন বিষয় চমৎকারভাবে তুলে এনেছেন। তিনি নিজে যেমন দেশের সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের প্রতীকে পরিণত হয়েছেন, তেমনি এই বইটিও দেশের ইতিহাস–ঐতিহ্যের গুরুত্বপূর্ণ উপকরণ হয়ে উঠেছে।
অনুষ্ঠানটি শুধু একটি বইয়ের প্রকাশনা ছিল না, হয়ে উঠেছিল বাংলা গানের এক জীবন্ত ইতিহাসের সামনে দাঁড়িয়ে একজন কিংবদন্তি শিল্পীকে ভালোবাসা, শ্রদ্ধা ও কৃতজ্ঞতা জানানোর বিরল এক স্মরণীয় সন্ধ্যা।