
আহমদ রফিক সব সময় নিজেকে নিজেই অতিক্রম করে গেছেন। বামপন্থী আন্দোলনের সঙ্গে তাঁর গভীর যুক্ততা ও কমিউনিস্ট পার্টির সঙ্গে সংযোগ থাকলেও পার্টির সংকীর্ণ আনুষ্ঠানিকতা তাঁকে পীড়িত করেছিল। তিনি কোনো নির্দিষ্ট দলের হয়ে ওঠেননি। জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত নিজের আদর্শ থেকে কখনো বিচ্যুত হননি।
ভাষাসংগ্রামী ও রবীন্দ্র-গবেষক আহমদ রফিকের প্রথম প্রয়াণবার্ষিকী উপলক্ষে আয়োজিত স্মরণসভায় এ কথাগুলো উঠে আসে।
আজ শনিবার সন্ধ্যায় বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রে ‘মহিমা তব উদ্ভাসিত’ শিরোনামে এ স্মরণসভার আয়োজন করে ‘খামখেয়ালী সভা’। অনুষ্ঠানে আহমদ রফিকের স্মৃতিচারণা করেন বক্তারা।
অনুষ্ঠানে গবেষক ও মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের ট্রাস্টি মফিদুল হক বলেন, ‘আহমদ রফিক সব সময় নিজেকে নিজেই অতিক্রম করে গেছেন। পেশায় ডাক্তার হলেও রাজনৈতিক সম্পৃক্ততার কারণে তাঁকে বছরের পর বছর হুলিয়া মাথায় নিয়ে ফেরারি জীবন কাটাতে হয়েছে এবং তিনি ঠিকমতো পরীক্ষাতেও অংশ নিতে পারেননি।’
স্বাধীনতার পর বড় ব্যবসায়ী হওয়ার সুযোগ থাকা সত্ত্বেও আহমদ রফিক সেদিকে পা বাড়াননি, বরং লেখালেখি ও সাহিত্যচর্চাকেই আঁকড়ে ধরেছেন।মফিদুল হক, ট্রাস্টি, মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর
স্বাধীনতার আগে ও পরে সাহিত্য ও সংস্কৃতির সমকালে আহমদ রফিক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন উল্লেখ করে মফিদুল হক বলেন, স্বাধীনতার পর বড় ব্যবসায়ী হওয়ার সুযোগ থাকা সত্ত্বেও আহমদ রফিক সেদিকে পা বাড়াননি; বরং লেখালেখি ও সাহিত্যচর্চাকেই আঁকড়ে ধরেছেন।
অধ্যাপক ভীষ্মদেব চৌধুরী বলেন, তরুণদের আহমদ রফিক অনেক বেশি ভালোবাসতেন। সব সময় তরুণদের নিয়ে চলতে পছন্দ করতেন। সম্ভাবনাময় অনেক তরুণকে বই উৎসর্গ করে গেছেন তিনি।
১৯৪৭ সালে হরগঙ্গা কলেজে অধ্যয়নকাল থেকেই আহমদ রফিক ভাষা আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত হন বলে জানান আহমদ রফিক ফাউন্ডেশনের সাধারণ সম্পাদক ইসমাইল সাদী। তিনি বলেন, ‘পরে ঢাকা মেডিকেল কলেজে ভর্তি হয়ে ১৯৫২ সালের মহান ভাষা আন্দোলনে সরাসরি ভূমিকা রাখেন এবং ২৩ ফেব্রুয়ারি রাতে শহীদ মিনারের প্রথম নকশা ও নির্মাণ পরিকল্পনায় সক্রিয় অবদান রাখেন। বাংলাদেশে ইতিহাস সৃষ্টিকারী বহু ঘটনার প্রথম দিকের সঙ্গে তিনি সম্পৃক্ত ছিলেন। তবে এত অবদান থাকা সত্ত্বেও আহমেদ রফিক কখনো নিজের ঢোল নিজে পেটাননি কিংবা আত্মপ্রচারে লিপ্ত হননি। ৫০-এর দশকে সমসাময়িকেরা যখন কবিতা লিখছিলেন, তিনি ৫৮ সালেই অনন্য প্রবন্ধগ্রন্থ শিল্প সংস্কৃতি জীবন প্রকাশ করে চিন্তাশীলতার পরিচয় দেন।’
আহমদ রফিকের লেখা কবিতা এবং রবীন্দ্রনাথের লেখা কবিতা আবৃত্তি করেন আবৃত্তিশিল্পী ভাস্বর বন্দ্যোপাধ্যায়। অনুষ্ঠানে সংগীত পরিবেশন করেন রবীন্দ্রসংগীতশিল্পী মঞ্জুয়ারা রশিদ।
খামখেয়ালী সভা ট্রাস্টের সভাপতি মাহমুদ হাশিম বলেন, হাতিরপুলে খামখেয়ালী সভার রবীন্দ্র সংগ্রহশালায় আহমদ রফিক কর্নার করেছি। এ ছাড়া আহমদ রফিক অধ্যয়নসভা নামের একটি কোর্স পরিকল্পনা করেছি। সেখানে গুণীজনেরা ক্লাস নেবেন।
প্রথম প্রয়াণবার্ষিকীর স্মরণাঞ্জলিতে খামখেয়ালী সভা চারটি কর্মসূচির ঘোষণা দিয়েছে। আহমদ রফিক সংগ্রহ-খামখেয়ালী সভার রবীন্দ্র গ্রন্থাগারে তাঁর রচনা সংগ্রহ ও স্মৃতিচিহ্ন সংরক্ষণ; আহমদ রফিক স্মারক বক্তৃতা; ভাষাসংগ্রামী আহমদ রফিক অধ্যয়নসভা এবং রবীন্দ্র–গবেষকদের জন্য আহমদ রফিক গবেষণা বৃত্তি চালু।
সভাপতির বক্তব্যে চিত্রশিল্পী আবদুল মান্নান বলেন, ‘আহমদ রফিকের স্মৃতি রক্ষা ও চর্চায় যে পরামর্শগুলো এসেছে, সেগুলো নিয়ে কাজ করবে খামখেয়ালী সভা। আর যে কর্মসূচিগুলো ঘোষণা করা হয়েছে, সেগুলো বাস্তবায়নে আমরা বদ্ধপরিকর। সবার সহযোগিতায় আমরা সেগুলো পূরণ করব।’