বায়ান্নর চেতনাকে ধারণ করে শব্দহীন পৃথিবীর মানুষের যোগাযোগ সহজ করতে কাজ করছে গ্রামীণফোনের বিশেষ সেবা ‘সাইন-লাইন’
বায়ান্নর চেতনাকে ধারণ করে শব্দহীন পৃথিবীর মানুষের যোগাযোগ সহজ করতে কাজ করছে গ্রামীণফোনের বিশেষ সেবা ‘সাইন-লাইন’

মাতৃভাষার পাশাপাশি ইশারা ভাষা কেন জরুরি

একুশে ফেব্রুয়ারি এখন আর কেবল শুধু আমাদের ইতিহাসের পাতায় সীমাবদ্ধ নেই, এটি বিশ্বজুড়ে নিজের পরিচয় রক্ষার এক আন্তর্জাতিক প্রতীক। তবে এই দিনটি নিয়ে লিখতে গেলেই আমরা প্রায়শই সেই চেনা তথ্যের আবর্তে আটকে যাই—কবে ইউনেসকো স্বীকৃতি দিল কিংবা কয়টি দেশ এটি পালন করে। অথচ একুশের মূল তেজটা লুকিয়ে ছিল নিজের ভাষায় কথা বলার স্বাধীনতায়। আমরা প্রায়ই ভুলে যাই, ‘কথা বলা’ মানেই শুধু মুখ দিয়ে শব্দ করা নয়। বিশ্বের প্রায় ১৯০টি দেশে যখন দিনটি পালিত হয়, তখন একেক জন একেক ভাবে নিজের সত্তাকে প্রকাশ করে। কেউ গানে, কেউ কবিতায়, আর কেউ হয়তো একদম নিঃশব্দে, আঙুলের ইশারায়।

অস্তিত্ব রক্ষার এক অসম লড়াই

আজও পৃথিবীর যেখানেই কোনো ভাষা বিলুপ্তির হুমকিতে পড়ে, সেখানেই অনুপ্রেরণা হয়ে ফিরে আসে বায়ান্নর সেই উত্তাল ঢাকা। নিজের মায়ের ভাষাকে রক্ষা করতে ছাত্র–জনতা তৎকালীন সরকারের উর্দুকে একমাত্র রাষ্ট্রভাষা হিসেবে চাপিয়ে দেওয়ার নীতির বিরুদ্ধে রাজপথের লড়াইয়ে নেমেছিল। উর্দুকে একমাত্র রাষ্ট্রভাষা করার ঘোষণা আসার পর ছাত্র থেকে বুদ্ধিজীবী— সবাই বুঝেছিলেন, এটা স্রেফ ভাষার ওপর আঘাত নয়, পুরো বাঙালি জাতির জন্য এটা চরম বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে।

শুরু হয় আন্দোলন। রাজপথে ঝরে তাজা রক্ত। সেই রক্ত বৃথা যায়নি। দীর্ঘ আন্দোলনের মুখে অবশেষে ১৯৫৬ সালে পাকিস্তান সরকার রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবি মেনে নিতে বাধ্য হয়। দীর্ঘ সংগ্রামের পরে বাংলা পায় রাষ্ট্রভাষার মর্যাদা।

শব্দহীন পৃথিবীর ভাষা: একুশের চেতনার নতুন দিগন্ত

ফেব্রুয়ারি মাস আমাদের শিখিয়েছে নিজের ভাষায় কথা বলার অধিকার কতটা মৌলিক। ‘একুশ’ আজ বিশ্বজুড়ে সব মাতৃভাষার রক্ষাকবচ এবং ভাষার অধিকারের সংজ্ঞাটিও এখন কেবল প্রচলিত বর্ণমালার গণ্ডিতেই সীমাবদ্ধ নেই। বায়ান্নর সেই লড়াই মূলত ছিল নিজের সত্তাকে প্রকাশের স্বাধীনতা। কিন্তু এই স্বাধীনতার সমীকরণে আজও নিভৃতে রয়ে গেছে একটি বিশাল জনগোষ্ঠী, যাঁরা শব্দহীন পৃথিবীতে বাস করেন। যাঁদের ভাব বিনিময়ের একমাত্র ব্যাকরণ হলো হাতের আঙুল আর চোখের ইশারা।

শব্দ আর নিস্তব্ধতার দেয়াল ভেঙে ভাষার অধিকার পৌঁছে যাক সবার কাছে

পরিসংখ্যান বলছে, বাংলাদেশে বর্তমানে প্রায় ৩০ লাখের বেশি মানুষ শ্রবণ ও বাক্‌প্রতিবন্ধী হিসেবে জীবন যাপন করছে। ফেব্রুয়ারি মাস যখন আমাদের মৌলিক অধিকারের কথা মনে করিয়ে দেয়, তখন এই বিশাল জনগোষ্ঠীর একমাত্র যোগাযোগের মাধ্যম অর্থাৎ ‘ইশারা ভাষা’র গুরুত্বও সামনে চলে আসে।

বাংলা ইশারা ভাষা: আমাদের নিজস্ব পরিচয়

একটি প্রচলিত ভুল ধারণা হলো, ইশারা ভাষা বোধহয় সারা বিশ্বে একই–বা সর্বজনীন। আসলে বিষয়টি তা নয়। ইংরেজি, হিন্দি বা উর্দু ভাষার যেমন নিজস্ব ব্যাকরণ ও প্রকাশভঙ্গি আছে, ঠিক তেমনি প্রতিটি দেশের ইশারা ভাষাও আলাদা। ‘বাংলা ইশারা ভাষা’ আমাদের নিজস্ব সম্পদ। একজন বাঙালি যেভাবে ইশারায় মনের ভাব প্রকাশ করেন, একজন জাপানি বা আমেরিকান ব্যক্তির প্রকাশভঙ্গি তার চেয়ে ভিন্ন। তাই বায়ান্নর ফেব্রুয়ারি যেভাবে আমাদের মুখের ভাষাকে রক্ষা করেছিল, ঠিক তেমনি বর্তমান সময়ে ‘বাংলা ইশারা ভাষা’কে গুরুত্ব দেওয়াই হবে আমাদের ভাষাগত স্বাতন্ত্র্যকে সমুন্নত রাখার অন্যতম উপায়—এমনটাই মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

গ্রামীণফোনের ‘সাইন-লাইন’

এই প্রেক্ষাপটে দেশের শীর্ষস্থানীয় টেলিযোগাযোগ প্রতিষ্ঠান গ্রামীণফোনের ‘সাইন-লাইন’ উদ্যোগটি অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত হয়ে দাঁড়িয়েছে। ২০২০ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি গ্রামীণফোন আনুষ্ঠানিকভাবে যাত্রা শুরু করে তাদের ডিজিটাল উদ্ভাবনের। এটি মূলত বাক্‌ ও শ্রবণপ্রতিবন্ধী গ্রাহকদের জন্য ডিজাইন করা একটি বিশেষ ‘কাস্টমার সার্ভিস সলিউশন’। অন্তর্ভুক্তিমূলক যোগাযোগব্যবস্থায় এই অনন্য অবদানের জন্য ২০২৫ সালে প্রতিষ্ঠানটি ‘রিকগনিশন ফর অ্যাকসেসিবল সার্ভিস’ ক্যাটাগরিতে স্বীকৃতিও লাভ করেছে।

প্রযুক্তির ছোঁয়ায় ঘুচছে ভাষার দেয়াল

বর্তমানে গ্রামীণফোনের গ্রাহকসেবার সঙ্গে ইশারা ভাষাকে অত্যন্ত সুচারুভাবে সমন্বয় করা হয়েছে। একজন বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন গ্রাহক ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমেই প্রয়োজনীয় সমাধান পেয়ে যাচ্ছেন। সেবাটি গ্রহণের প্রক্রিয়াটি বেশ সহজ এবং গ্রাহকবান্ধব। ব্যবহারকারী তাঁর স্মার্টফোন থেকে ‘মাইজিপি অ্যাপ’–এ প্রবেশ করে সরাসরি এই সুবিধা নিতে পারেন। অ্যাপের ভেতর ‘সার্ভিসেস’ অপশনে গিয়ে ‘হেল্প অ্যান্ড সাপোর্ট’ সেকশনে যেতে হবে। সেখানে ‘সাইন লাইন’ অপশনটি নির্বাচন করার পর ‘এজেন্ট’ বাটনে ক্লিক করলেই ভিডিও কলের মাধ্যমে কন্টাক্ট সেন্টারের একজন এজেন্টের সঙ্গে গ্রাহক সরাসরি যুক্ত হতে পারবেন। এই ভিডিও কলে এজেন্ট একজন দক্ষ দোভাষীর ভূমিকা পালন করেন, যা শ্রবণ ও বাক্‌প্রতিবন্ধী গ্রাহকের সমস্যা বুঝতে এবং দ্রুত সমাধান দিতে সাহায্য করে।

গত এক বছরে প্রায় ৮ হাজার গ্রাহক গ্রামীণফোনের এই সেবাটি গ্রহণ করেছেন এবং ব্যবহারকারীদের কাছ থেকে অত্যন্ত উৎসাহব্যঞ্জক প্রতিক্রিয়া পাওয়া গেছে। গ্রাহকদের এই অভাবনীয় সাড়াকে গুরুত্ব দিয়ে গ্রামীণফোন তাদের সেবার মান আরও বাড়ানোর পরিকল্পনা করছে।

যে কারণে ‘ইশারা ভাষা’ জরুরি

ভাষার অধিকার রক্ষায় বায়ান্নর রক্তক্ষয়ী লড়াই ছিল বৈষম্যের দেয়াল ভেঙে প্রতিটি মানুষের আত্মপ্রকাশের জয়গান। বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রায় ৩০ লাখ মানুষের এই ‘ইশারা ভাষা’কে পেছনে ফেলে দেশের অগ্রযাত্রা কখনোই পূর্ণতা পাবে না। প্রযুক্তির সঠিক ব্যবহারে গ্রামীণফোনের মতো প্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি সরকারের উদ্যোগগুলোও যখন সাধারণের দোরগোড়ায় পৌঁছবে, তখনই একুশের চেতনা সার্থকতা পাবে। আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের মর্যাদা তখনই পূর্ণ হবে, যখন শব্দ কিংবা নিস্তব্ধতা—কোনো কিছুই মানুষের যোগাযোগের পথে বাধা হয়ে দাঁড়াবে না। ভাষার অধিকার হোক সবার জন্য সমান, প্রতিটি আঙুলের ইশারায় ফুটে উঠুক আগামীর বাংলাদেশ—এটাই সবার চাওয়া।