
সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় (রহিতকরণ) আইন ১০ এপ্রিল প্রণয়ন হয়। এর আগে, অর্থাৎ ৯ এপ্রিল পর্যন্ত সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় যেভাবে চলছিল, সে অবস্থায় রাখতে স্থিতাবস্থা চেয়ে আবেদনসহ আপিল করেছেন সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদার। আর এই আপিলের নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত ওই স্থিতাবস্থা চাওয়া হয়েছে।
সুপ্রিম কোর্টের জন্য স্বাধীন পৃথক সচিবালয় তিন মাসের মধ্যে প্রতিষ্ঠা করতে নির্দেশসংক্রান্ত হাইকোর্টের রায়ের সূত্র ধরে আপিল বিভাগের সংশ্লিষ্ট শাখায় আজ সোমবার আপিলটি করা হয়।
সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় (রহিতকরণ) আইনে সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয়–সংক্রান্ত অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে জারি করা দুটি অধ্যাদেশ রহিত করা হয়। সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় অধ্যাদেশের অধীন প্রতিষ্ঠিত সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় বিলুপ্ত হবে; সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয়ে ন্যস্ত বাজেট, গৃহীত প্রকল্প ও কর্মসূচি সরকারের আইন ও বিচার বিভাগের কাছে হস্তান্তরিত ও ন্যস্ত হবে এবং সচিবালয়ের জন্য সৃজন করা পদগুলো বিলুপ্ত হবে বলে রহিতকরণ আইনে উল্লেখ রয়েছে। আইনের এসব বিধানের কার্যক্রম আপিল নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত স্থগিত চাওয়া হয়েছে বদিউল আলম মজুমদারের করা আবেদনে।
এর আগে সাত আইনজীবীর করা এক রিটের চূড়ান্ত শুনানি শেষে গত বছরের ২ সেপ্টেম্বর হাইকোর্ট রায় দেন। রায়ে বিদ্যমান সংবিধানের ১১৬ অনুচ্ছেদ সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক ও বাতিল ঘোষণা এবং ১৯৭২ সালের মূল সংবিধানের ১১৬ অনুচ্ছেদ পুনর্বহাল করা হয়। সুপ্রিম কোর্টের জন্য স্বাধীন পৃথক সচিবালয় তিন মাসের মধ্যে প্রতিষ্ঠা করতে নির্দেশ দেওয়া হয়। এ ছাড়া সংবিধান ও আইনের গুরুত্বপূর্ণ ব্যাখ্যা জড়িত থাকায় আপিলের জন্য সংবিধানের ১০৩ অনুচ্ছেদ অনুসারে সার্টিফিকেট ইস্যু করা হয়। এর ফলে সরাসরি আপিল করার সুযোগ তৈরি হয়। ৭ এপ্রিল সুপ্রিম কোর্টের ওয়েবসাইটে ১৮৫ পৃষ্ঠার পূর্ণাঙ্গ রায়টি প্রকাশ করা হয়।
হাইকোর্টের রায় ঘোষণার পর ‘সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় অধ্যাদেশ, ২০২৫’ শিরোনামে গত বছরের ৩০ নভেম্বর অধ্যাদেশ জারি করে অন্তর্বর্তী সরকার। একই বছরের ১১ ডিসেম্বর সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় উদ্বোধন করা হয়। সচিবালয়ের যাত্রা শুরু হয়। গত ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়ে সরকার গঠন করে বিএনপি। বিরোধী দলের আপত্তি নাকচ করে ৯ এপ্রিল জাতীয় সংসদে ‘সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় (রহিতকরণ) বিল’ পাস করা হয়। পরদিন সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় (রহিতকরণ) আইন হয়।
সচিবালয় প্রতিষ্ঠাসংক্রান্ত হাইকোর্টের পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশের পর আপিল করতে হলফনামার জন্য অনুমতি চেয়ে আবেদন করেন বদিউল আলম মজুমদার, যা গতকাল রোববার আপিল বিভাগের চেম্বার আদালতে ওঠে। আদালত হলফনামার অনুমতি দেন।
এর ধারাবাহিকতায় আজ আপিলটি করা হয় বলে জানান বদিউল আলম মজুমদারের আইনজীবী কারিশমা জাহান। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, গত ২ সেপ্টেম্বর হাইকোর্টের রায় হওয়ার পর সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। এটি হয়েছে সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় অধ্যাদেশ ২০২৫–এর মাধ্যমে। এ অধ্যাদেশের অধীন প্রশাসনিক অনেক উল্লেখযোগ্য অগ্রগতিও হয়েছে। যখন নতুন সরকার এসেছে, চলতি মাসের ১০ তারিখে সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় রহিতকরণ আইন প্রণয়ন করেছে। হাইকোর্টের রায়ের পরিপ্রেক্ষিতে এবং পরবর্তী সময়ে সরকার যেসব পদক্ষেপ নিয়েছে, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলে আপিল করা হয়েছে। ওই আইনের অধীন সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় বিলুপ্ত; সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয়ের অধীন যেসব কার্যক্রম হয়েছে, সেগুলো আবার আইন ও বিচার বিভাগের কাছে ন্যস্ত করা হয়েছে। আপিলের সঙ্গে অন্তর্বর্তীকালীন আদেশ চেয়ে আবেদন করা হয়েছে। যত শিগগিরই সম্ভব আপিল শুনানির জন্য উদ্যোগ নেওয়া হবে।
রাষ্ট্রপক্ষ আপিল করবে, রিটের শুনানি আপাতত মুলতবি
সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় (রহিতকরণ) আইন চ্যালেঞ্জ করে সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয়ের কার্যক্রম চলমান রাখতে স্থিতাবস্থা বজায় রাখতে নির্দেশনা চেয়ে রিটের শুনানি আপাতত মুলতবি হয়েছে। বিচারপতি আহমেদ সোহেল ও বিচারপতি ফাতেমা আনোয়ারের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চের আজ সোমবারের কার্যতালিকায় ৯৬ নম্বর ক্রমিকে রিটটি ওঠে।
আদালতে রিট আবেদনকারীদের পক্ষে জ্যেষ্ঠ আইনজীবী মোহাম্মদ শিশির মনির এবং রাষ্ট্রপক্ষে অ্যাটর্নি জেনারেল মো. রুহুল কুদ্দুস কাজল শুনানিতে ছিলেন। এর আগে রিটের শুনানি থাকায় মধ্যাহ্নবিরতির পর গণমাধ্যমকর্মীরা আদালতকক্ষে প্রবেশ করেন। আড়াইটার দিকে গণমাধ্যমকর্মীদের কক্ষে না থাকতে বলা হয়। পরে গণমাধ্যমকর্মীরা বেরিয়ে যান।
শুনানির পর নিজ কার্যালয়ে অ্যাটর্নি জেনারেল মো. রুহুল কুদ্দুস কাজল সাংবাদিকদের বলেন, হাইকোর্টের ইতিপূর্বে যে রায়ের পর সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় প্রতিষ্ঠা করা হয়েছিল, সেটি চূড়ান্ত নিষ্পত্তি হওয়া রায় নয়। কারণ, রায়ে সংবিধানের ১০৩ অনুচ্ছেদ অনুসারে সার্টিফিকেট দেওয়া হয়েছে। এর অর্থ সেটি আপিল বিভাগে সরাসরি আপিল হিসেবে চূড়ান্ত নিষ্পত্তি হবে।
মো. রুহুল কুদ্দুস কাজল বলেন, ‘আদালতে বলেছি, যেহেতু বিষয়টি সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে এবং আপিল দায়ের প্রক্রিয়াধীন, সুতরাং ওটা নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত এই রিটের শুনানি করা সমীচীন হবে কি না।…যত দ্রুত সম্ভব পূর্বের রায়টির বিরুদ্ধে আপিল দায়ের করব।’
রিট আবেদনকারীদের আইনজীবী মোহাম্মদ শিশির মনির প্রথম আলোকে বলেন, প্রাথমিক শুনানি হয়েছে। রাষ্ট্রপক্ষ বলেছে, আগামীকালের মধ্যে আপিল করবে। তখন আদালত বলেছেন, ‘রিটটি কার্যতালিকায় থাকবে। ওটার (আপিল) কী হচ্ছে, দেখে আসেন।’
সাত আইনজীবীর করা ওই রিটের প্রার্থনায় দেখা যায়, সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় (রহিতকরণ) আইন, ২০২৬ কেন সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক ঘোষণা করা হবে না, এ বিষয়ে রুল চাওয়া হয়েছে। রুল হলে বিচারাধীন অবস্থায় গত বছরের ১১ ডিসেম্বর হতে শুরু হওয়া সচিবালয়ের কার্যক্রম চলমান রাখতে স্থিতাবস্থা বজায় রাখতে বিবাদীদের প্রতি নির্দেশনা চাওয়া হয়েছে। আইন মন্ত্রণালয়ের দুই সচিবকে রিটে বিবাদী করা হয়েছে।