অ্যালুমিনিয়ামের হাঁড়িপাতিল
অ্যালুমিনিয়ামের হাঁড়িপাতিল

অ্যালুমিনিয়ামের রান্নার পাত্র থেকে বিষাক্ত সিসা ঢুকছে ভাত–খিচুড়িতে, মান দেখবে কে

ভাত রান্নার হাঁড়ি কিংবা খিচুড়ির পাতিলটি হয়তো নতুন কেনা। প্রতিদিনের মতো সেই পাত্রেই রান্না হচ্ছে পরিবারের খাবার। কিন্তু অজান্তেই সেই খাবারের সঙ্গে শরীরে সিসার মতো বিষাক্ত ধাতু ঢুকে পড়ছে, তা নিয়ে সচরাচর কেউ ভাবেন না। অথচ বাংলাদেশে তৈরি অ্যালুমিনিয়ামের রান্নার পাত্র নিয়ে নতুন এক গবেষণায় দেখা গেছে, এসব পাত্র থেকে সিসা খাবারে মিশতে পারে। নতুন পাত্রে এই ঝুঁকি বেশি, তবে পুরোনো পাত্রও ঝুঁকিমুক্ত নয়।

গবেষণায় নতুন অ্যালুমিনিয়ামের পাত্রে রান্না করা ভাতের প্রতি কেজিতে সর্বোচ্চ গড়ে ৩০৫ মাইক্রোগ্রাম এবং খিচুড়িতে ৪২০ মাইক্রোগ্রাম সিসা পাওয়া গেছে। কয়েকবার ব্যবহারের পর খাবারে সিসার পরিমাণ কমলেও তা উদ্বেগজনক মাত্রায় থেকে গেছে। শুধু তা-ই নয়, পাত্র পরিষ্কারের সময় শক্ত তারের জালি দিয়ে ঘষলে সিসা নির্গমনের পরিমাণ আরও বেড়েছে।

রান্না করা খাবারে এত পরিমাণে সিসা পাওয়া গেলেও খাদ্যে এর সামান্যতম উপস্থিতিও গ্রহণযোগ্য মনে করে না বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও)। সংস্থাটির তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালে বিশ্বজুড়ে ৩৫ লাখের বেশি মৃত্যুর জন্য সিসার সংস্পর্শ দায়ী। এসব মৃত্যুর প্রধান কারণ ছিল হৃদ্‌যন্ত্রের রক্তনালির ওপর সিসার ক্ষতিকর প্রভাব।

বাংলাদেশে তৈরি অ্যালুমিনিয়ামের রান্নার পাত্র নিয়ে নতুন এক গবেষণায় দেখা গেছে, এসব পাত্র থেকে সিসা খাবারে মিশতে পারে। নতুন পাত্রে এই ঝুঁকি বেশি, তবে পুরোনো পাত্রও ঝুঁকিমুক্ত নয়।
ডা. মাহবুবুর রহমান

ডব্লিউএইচওর দৃষ্টিতে খাবারে সিসার কোনো গ্রহণযোগ্য মাত্রা না থাকলেও যুক্তরাষ্ট্রের খাদ্য ও ওষুধ প্রশাসন (এফডিএ) শিশুদের জন্য নির্দিষ্ট কিছু প্রক্রিয়াজাত খাদ্যে প্রতি কেজিতে সিসার সর্বোচ্চ মাত্রা ১০ মাইক্রোগ্রাম নির্ধারণ করেছে।

দেশের অ্যালুমিনিয়ামের পাত্রে সিসার এই ব্যাপক উপস্থিতি থাকার পরও এগুলোর মান দেখার কেউ নেই। সরকারি স্তরে কোনো তৎপরতাও নেই। এর আগে গত বছর আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা কেন্দ্র, বাংলাদেশের (আইসিডিডিআরবি) পরিচালিত এক গবেষণায় দেখা গেছে, ঢাকা শহরের প্রায় শতভাগ শিশুর শরীরে উদ্বেগজনক মাত্রায় সিসার উপস্থিতি আছে।

সম্প্রতি প্রকাশিত গবেষণাটির শিরোনাম ‘টক্সিক কুকওয়্যার: লিড এক্সপোজার ফ্রম অ্যালুমিনিয়াম পটস ইন বাংলাদেশ’। ২৫ অক্টোবর আন্তর্জাতিক বিজ্ঞান সাময়িকী জার্নাল অব এক্সপোজার সায়েন্স অ্যান্ড এনভায়রনমেন্টাল এপিডেমিওলজিতে গবেষণাটি প্রকাশিত হয়েছে। গবেষকেরা যুক্তরাষ্ট্রের স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় এবং আইসিডিডিআরবির সঙ্গে যুক্ত।

এর আগে গত বছর আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা কেন্দ্র, বাংলাদেশের (আইসিডিডিআরবি) পরিচালিত এক গবেষণায় দেখা গেছে, ঢাকা শহরের প্রায় শতভাগ শিশুর শরীরে উদ্বেগজনক মাত্রায় সিসার উপস্থিতি আছে।

নতুন পাত্রেও সিসা, পুরোনোতেও

অ্যালুমিনিয়ামের পাত্রে রান্না হয় খিচুড়ি

এ গবেষণার সঙ্গে যুক্ত আইসিডিডিআরবির গবেষক ডা. মাহবুবুর রহমান প্রথম আলোকে বলেন, দেশে পাওয়া যায়, এমন প্রায় সব ধরনের অ্যালুমিনিয়ামের রান্নার পাত্রের ধরন বিবেচনায় নিয়ে পরীক্ষা করা হয়েছে। নতুন পাত্রে যেমন সিসা পাওয়া গেছে, তেমনি ক্ষয়ে যাওয়া পুরোনো পাত্রেও এর উপস্থিতি মিলেছে। তাঁর মতে, গবেষণাটির সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ দিক হলো, সিসাযুক্ত পাত্র থেকে রান্না করা খাবারে সিসা চলে যাওয়ার প্রমাণ পাওয়া গেছে।

গবেষকেরা মোট ২৭টি পাত্র নিয়ে পরীক্ষা করেছেন। এর মধ্যে বাংলাদেশের বিভিন্ন পরিবারের ব্যবহৃত সাতটি পুরোনো পাত্র এবং স্থানীয় একজন বিক্রেতার কাছ থেকে কেনা ২০টি নতুন পাত্র ছিল। পাত্রগুলোতে সিসার পরিমাণ নির্ণয়ে এক্স-রে ফ্লুরোসেন্স (এক্সআরএফ) যন্ত্র ব্যবহার করা হয়। এরপর পাত্র থেকে সিসা বেরিয়ে আসার প্রবণতা বুঝতে অ্যাসিটিক অ্যাসিড দিয়ে পরীক্ষা করা হয়। পাশাপাশি ভাত ও খিচুড়ি রান্না করে খাবারে সিসা মিশছে কি না, তা পরীক্ষা করা হয়।

গবেষণায় যেসব পুরোনো পাত্র ছিল সেগুলোতে প্রতি কেজিতে ২২৬ থেকে ৩৮০ মাইক্রোগ্রাম সিসা পাওয়া যায়। আর নতুন পাত্রগুলোতে ছিল ১২৬০ থেকে ১৮২০ মাইক্রোগ্রাম।

নতুন পাত্রে পরপর তিনবার রান্নার ফল তুলনা করে গবেষকেরা দেখেছেন, প্রথমবারের তুলনায় তৃতীয়বার রান্নায় ভাতে সিসার পরিমাণ প্রায় তিন থেকে পাঁচ গুণ কমেছে। খিচুড়ির ক্ষেত্রে প্রথমবারের তুলনায় তৃতীয়বারে পরিমাণ কমেছে প্রায় ২ দশমিক ৮ থেকে ৫ দশমিক ৫ গুণ।

ভাত ও খিচুড়িতে কতটা সিসা

অ্যালুমিনিয়ামের পাত্রে রান্না হয় বেশি

গবেষণায় দেখা যায়, নতুন পাত্রে প্রথমবার ভাত রান্নার পরীক্ষায় প্রতি কেজি শুকনা ভাতে গড়ে সর্বোচ্চ ৩০৫ মাইক্রোগ্রাম সিসা পাওয়া গেছে। খিচুড়ির ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ গড় ছিল প্রতি কেজিতে ৪২০ মাইক্রোগ্রাম। ব্যবহৃত পাত্রে রান্না করা ভাতেও সিসা পাওয়া গেছে। দুটি পুরোনো পাত্রে ভাতে সিসার ঘনত্ব ছিল যথাক্রমে ১০৫ ও ১৫০ মাইক্রোগ্রাম প্রতি কেজি।

নতুন পাত্রে পরপর তিনবার রান্নার ফল তুলনা করে গবেষকেরা দেখেছেন, প্রথমবারের তুলনায় তৃতীয়বার রান্নায় ভাতে সিসার পরিমাণ প্রায় তিন থেকে পাঁচ গুণ কমেছে। খিচুড়ির ক্ষেত্রে প্রথমবারের তুলনায় তৃতীয়বারে পরিমাণ কমেছে প্রায় ২ দশমিক ৮ থেকে ৫ দশমিক ৫ গুণ। অর্থাৎ বারবার ব্যবহারে সিসা খাবারে মেশার পরিমাণ কমতে পারে, কিন্তু কমে গেলেই ঝুঁকি শেষ হয়ে যায় না।

মুসা বাকের, গবেষক, আইসিডিডিআরবি

নতুন গবেষণায় গবেষকেরা শুধু খাবারে সিসার উপস্থিতি পরিমাপ করেননি; শিশুদের সম্ভাব্য দৈনিক সিসা গ্রহণের পরিমাণও হিসাব করেছেন। বাংলাদেশের গ্রামীণ শিশুদের ভাত খাওয়ার পরিমাণের ওপর ভিত্তি করে তাঁরা একটি মডেল তৈরি করেন। নতুন পাত্রে তৃতীয়বার রান্না করা ভাতে প্রতি কেজি শুকনা ভাতে ৪১ দশমিক ১ থেকে ৬২ দশমিক ১ মাইক্রোগ্রাম সিসার যে মাত্রা পাওয়া গিয়েছিল, তা ব্যবহার করে হিসাব করা হয়—শিশু প্রতিদিন ওই ভাত খেলে শুধু এই উৎস থেকেই তার শরীরে আনুমানিক ১২ দশমিক ৭ থেকে ১৯ দশমিক ৩ মাইক্রোগ্রাম সিসা প্রবেশ করতে পারে।

গবেষণাপত্রে ব্যবহৃত যুক্তরাষ্ট্রের খাদ্য ও ওষুধ প্রশাসনের শিশুদের জন্য নির্ধারিত দৈনিক সিসা গ্রহণের অন্তর্বর্তী নির্দেশক মাত্রা ছিল ২ দশমিক ২ মাইক্রোগ্রাম। ওই হিসাবের ভিত্তিতে পাত্রে রান্না করা ভাত থেকে সম্ভাব্য দৈনিক গ্রহণের পরিমাণ নির্দেশক মাত্রাটির পাঁচ গুণের বেশি হতে পারে। গবেষকেরা আরও একটি মডেল ব্যবহার করে এক থেকে ছয় বছরের কম বয়সী শিশুদের রক্তে সিসার সম্ভাব্য মাত্রা অনুমান করেছেন।

প্রথম ব্যবহারের পরীক্ষায় ঘষে পরিষ্কার করা পাত্র থেকে সিসা বেরোনোর পরিমাণ ঘষে পরিষ্কার না করা পাত্রের তুলনায় প্রায় পাঁচ গুণ বেশি ছিল। দ্বিতীয় পরীক্ষায় তা ছিল প্রায় তিন গুণ। রান্নার সময় ধাতব খুন্তি দিয়ে নাড়াচাড়া করলেও সিসা নির্গমন বাড়তে দেখা গেছে।

ঘষে পরিষ্কার করলে বাড়ে ঝুঁকি

পাত্র থেকে সিসা খাবারে যাওয়ার ক্ষেত্রে শুধু পাত্রের উপাদান নয়, রান্না ও পরিষ্কারের পদ্ধতিও গুরুত্বপূর্ণ। গবেষণায় চার শতাংশ অ্যাসিটিক অ্যাসিড ব্যবহার করে দেখা গেছে, বেশি অম্লীয় পরিবেশে পাত্র থেকে বেশি সিসা বেরিয়ে আসে। অ্যাসিডের অম্লত্ব কমলে সিসা বেরোনোর পরিমাণও কমেছে।

নতুন পাত্র শক্ত স্টিলের তারের জালি দিয়ে ঘষে পরিষ্কার করার পর পরীক্ষা করলে সিসা নির্গমনের পরিমাণ সবচেয়ে বেশি পাওয়া যায়। প্রথম ব্যবহারের পরীক্ষায় ঘষে পরিষ্কার করা পাত্র থেকে সিসা বেরোনোর পরিমাণ ঘষে পরিষ্কার না করা পাত্রের তুলনায় প্রায় পাঁচ গুণ বেশি ছিল। দ্বিতীয় পরীক্ষায় তা ছিল প্রায় তিন গুণ। রান্নার সময় ধাতব খুন্তি দিয়ে নাড়াচাড়া করলেও সিসা নির্গমন বাড়তে দেখা গেছে।

আইসিডিডিআরবির গবেষক মো. মুসা বাকের বলেন, ‘আমাদের গবেষণায় শুধু ভাত ও খিচুড়িতে সিসার উপস্থিতি দেখা হয়েছে। তবে অ্যালুমিনিয়ামের পাত্রে টকজাতীয় খাদ্য তৈরি করলে সিসা বেশি নির্গমন হয়। আমাদের দেশে সাধারণত এসব দ্রব্য রান্না করা হয়। তাই সেখানে মারাত্মক মাত্রায় সিসা মিশছে, তা বলা যায়।’

নজরদারি নেই

মানুষের খাবার তৈরি হয় এমন অ্যালুমিনিয়ামের পাত্রের মান দেখার দায়িত্ব দেশের পণ্যের মান নিয়ন্ত্রণকারী প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ডস অ্যান্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউশনের (বিএসটিআই)। কিন্তু প্রতিষ্ঠানটি কেবল অত্যাবশ্যকীয় পণ্যের গুণাগুণ দেখে। এত দিন অ্যালুমিনিয়ামের রান্নার সামগ্রী অত্যাবশ্যকীয় ছিল না, তিন মাস আগে হয়েছে। এরপরই অ্যালুমিনিয়ামের পাত্রের নির্মাতাদের ডেকে পণ্যের উৎপাদনপ্রক্রিয়া, পণ্যের কাঁচামালের তথ্য ইত্যাদি বিষয় জানাতে বলে বিএসটিআই কর্তৃপক্ষ। কিন্তু এরপরও মালিকদের পক্ষ থেকে কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি বলে জানান বিএসটিআইয়ের পরিচালক (সিএম) মো. আলাউদ্দিন হুসাইন। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ‘বৈঠকের পর আমরা অ্যালুমিনিয়াম পণ্যের মান দেখার বিষয়ে সচেষ্ট হয়েছি। এখন আমরা নিয়মিত এটার দেখভাল করব। খুব দ্রুতই বাজারে অভিযান শুরু করতে চাই আমরা।’

আমাদের গবেষণায় শুধু ভাত ও খিচুড়িতে সিসার উপস্থিতি দেখা হয়েছে। তবে অ্যালুমিনিয়ামের পাত্রে টকজাতীয় খাদ্য তৈরি করলে সিসা বেশি নির্গমন হয়। আমাদের দেশে সাধারণত এসব দ্রব্য রান্না করা হয়। তাই সেখানে মারাত্মক মাত্রায় সিসা মিশছে, তা বলা যায়।
গবেষক মো. মুসা বাকের

শরীরে সিসা গেলে কী হয়

ডব্লিউএইচও তথ্য অনুযায়ী, অল্প মাত্রায় দীর্ঘদিন সিসার সংস্পর্শে থাকলেও শিশুর বুদ্ধিবৃত্তিক বিকাশ, মনোযোগ, শেখার ক্ষমতা ও আচরণে বিরূপ প্রভাব পড়তে পারে। এ ছাড়া রক্তস্বল্পতা, কিডনির ক্ষতি এবং উচ্চ রক্তচাপের মতো সমস্যার সঙ্গেও সিসার সম্পর্ক রয়েছে। গর্ভাবস্থায় মায়ের শরীরে থাকা সিসা ভ্রূণের বিকাশেও প্রভাব ফেলতে পারে।

দেশের বিশিষ্ট শিশু রোগবিশেষজ্ঞ আবিদ হোসেন মোল্লা প্রথম আলোকে বলেন, সিসা শরীরে প্রবেশের পর রক্তের মাধ্যমে মস্তিষ্ক, যকৃৎ, কিডনি ও হাড়ে পৌঁছাতে পারে। হাড়ে জমে থাকা সিসা দীর্ঘদিন পরও আবার রক্তে প্রবেশ করতে পারে। ফলে প্রতিদিনের খাবার থেকে অল্প অল্প করে সিসা গ্রহণের বিষয়টিও জনস্বাস্থ্যের জন্য ভয়ানক ক্ষতির বার্তা দেয়।

সিসার অন্য উৎসও রয়েছে

বাংলাদেশে সিসার ঝুঁকি নিয়ে এর আগেও গবেষণা হয়েছে। ২০১৯ সালে এনভায়রনমেন্টাল রিসার্চ সাময়িকীতে প্রকাশিত এক গবেষণায় দেখা যায়, হলুদে সিসাযুক্ত ক্রোমেট রঞ্জক মেশানো দেশের মানুষের সিসার সংস্পর্শে আসার একটি গুরুত্বপূর্ণ উৎস। গ্রামীণ বাংলাদেশের গর্ভবতী নারীদের নিয়ে করা ওই গবেষণায় রক্তে সিসার উৎস শনাক্ত করতে সম্ভাব্য উৎসের নমুনা ও সিসার আইসোটোপ বিশ্লেষণ করা হয়েছিল। ফলাফলে হলুদকে একটি প্রধান উৎস হিসেবে চিহ্নিত করা হয়।

২০২৩ সালে প্রকাশিত আরেক গবেষণায় দেখা যায়, নীতিগত উদ্যোগ ও আইন প্রয়োগের পর বাজারের হলুদের নমুনায় সিসার উপস্থিতি ৪৭ শতাংশ থেকে শূন্যে নেমে আসে। হলুদের গুঁড়া তৈরির কারখানায় সিসাযুক্ত রঞ্জক ব্যবহারের হারও ৩০ শতাংশ থেকে শূন্যে নেমেছিল। এর মানে হলো, দূষণের উৎস চিহ্নিত করে কার্যকর ব্যবস্থা নিলে ঝুঁকি কমানো সম্ভব।

এ ছাড়া বিভিন্ন দেশে স্ক্র্যাপ ধাতু গলিয়ে তৈরি রান্নার পাত্র নিয়ে গবেষণায় সিসাসহ অন্যান্য ভারী ধাতু খাবারে মিশে যাওয়ার আশঙ্কা উঠে এসেছে। ২০২৫ সালে জার্নাল অব হ্যাজার্ডাস ম্যাটেরিয়ালসে প্রকাশিত একটি গবেষণায় নিম্ন ও মধ্যম আয়ের ২৫টি দেশের অ্যালুমিনিয়ামের রান্নার পাত্রে সিসার সম্ভাব্য ঝুঁকি বিশ্লেষণ করা হয়। বাংলাদেশের নতুন গবেষণাটি সেই উদ্বেগকে আরও এক ধাপ এগিয়ে নিয়ে গেছে। কারণ, এখানে শুধু পাত্রে সিসা থাকার বিষয়টি নয়, ভাত ও খিচুড়ির মতো পরিচিত খাবারে সিসা চলে যাওয়ার বিষয়টিও পরীক্ষা করা হয়েছে।

সিসা শরীরে প্রবেশের পর রক্তের মাধ্যমে মস্তিষ্ক, যকৃৎ, কিডনি ও হাড়ে পৌঁছাতে পারে। হাড়ে জমে থাকা সিসা দীর্ঘদিন পরও আবার রক্তে প্রবেশ করতে পারে। ফলে প্রতিদিনের খাবার থেকে অল্প অল্প করে সিসা গ্রহণের বিষয়টিও জনস্বাস্থ্যের জন্য ভয়ানক ক্ষতির বার্তা দেয়।
শিশু রোগবিশেষজ্ঞ আবিদ হোসেন মোল্লা

করণীয় কী

গবেষকেরা বলছেন, নতুন পাত্র কেনার পর কয়েকবার রান্না করে নেওয়া এবং শক্ত তারের জালি দিয়ে অতিরিক্ত ঘষাঘষি এড়িয়ে চলা সিসা নির্গমন কমাতে সহায়ক হতে পারে। কাঠের খুন্তির মতো তুলনামূলক নরম উপকরণ ব্যবহারও বিবেচনা করা যেতে পারে। তবে এগুলো ঝুঁকি কমানোর সম্ভাব্য উপায়, সিসাযুক্ত পাত্রকে নিরাপদ প্রমাণ করার নিশ্চয়তা নয়।

আইসিডিডিআরবির গবেষক মো. মুসা বাকের বলেন, সমস্যাটির স্থায়ী সমাধানে রান্নার পাত্র তৈরিতে ব্যবহৃত স্ক্র্যাপ ধাতুর উৎস ও মান নিয়ন্ত্রণ, বাজারে বিক্রি হওয়া পাত্রে সিসার পরীক্ষা এবং খাদ্য-সংস্পর্শে আসা সামগ্রীর জন্য কার্যকর মানদণ্ড প্রয়োজন।