মোটরসাইকেল
মোটরসাইকেল

বিশ্লেষণ

মোটরসাইকেলের সামনে নম্বরপ্লেট, খরচের বোঝা কার, আরএফআইডি কাজ করল না কেন

প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে ১৮ জুলাইয়ের বৈঠকে সিদ্ধান্ত হয়। এরপর বিআরটিএর একটি কমিটি নম্বরপ্লেট স্থাপনের পদ্ধতিসহ যাবতীয় বিষয়ে প্রতিবেদন দেয়। দেশে প্রায় ৫১ লাখ মোটরসাইকেল রয়েছে। এখন পেছনের নম্বরপ্লেটের জন্য গ্রাহকের কাছ থেকে বিআরটিএ ২ হাজার ২৬০ টাকা নিচ্ছে।

মোটরসাইকেল চলাচলে অনিয়ম শনাক্ত করতে এবার সামনে নম্বরপ্লেট বসানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। গত ১৮ জুলাই প্রধানমন্ত্রীর সভাপতিত্বে পরিবেশদূষণ নিয়ন্ত্রণবিষয়ক এক ফলোআপ সভায় এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত হয়। ঢাকার সড়কে থাকা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) প্রযুক্তির ক্যামেরায় মোটরসাইকেলের নম্বর সহজে শনাক্ত করে আইনভঙ্গকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার লক্ষ্যেই সামনে নম্বরপ্লেট বসানোর সিদ্ধান্ত হয়। বাস্তবায়নের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি) ও বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষকে (বিআরটিএ)।

মোটরসাইকেলের সামনের অংশে নম্বর প্লেট লাগানো বাধ্যতামূলক করে বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করেছে বিআরটিএ। এ নির্দেশনা বাস্তবায়নে আগামী ১৫ নভেম্বর পর্যন্ত সময় বেঁধে দেওয়া হয়েছে।

বিআরটিএর বিজ্ঞপ্তিতে স্কুটার ও অন্যান্য মোটরসাইকেলের সামনের নম্বর প্লেটের জন্য আলাদা মাপ ঠিক করা হয়েছে। স্কুটারের ক্ষেত্রে প্লেটের দৈর্ঘ্য হবে ২০০ মিলিমিটার এবং প্রস্থ ১০০ মিলিমিটার। অন্য মোটরসাইকেলের ক্ষেত্রে দৈর্ঘ্য ২৮৫ মিলিমিটার ও প্রস্থ ৫০ মিলিমিটার।

আরএফআইডি ট্যাগ কেন কার্যকর হলো না—এই প্রশ্নের জবাব আগে সরকারকে খুঁজতে হবে। পুরো পৃথিবীতে আরএফআইডি ট্যাগে সব কিছু শনাক্ত করা হয়। এআই ক্যামেরার বিষয়টি কেনাকাটার প্রকল্পে পরিণত হতে যাচ্ছে। একদিকে সরকারের কেনাকাটা বাড়বে। অন্যদিকে গ্রাহকের ওপর খরচের বোঝা পড়বে।
অধ্যাপক সামছুল হক, পুরকৌশল বিভাগ, বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট)।

বিআরটিএর নির্দেশনা অনুযায়ী, উভয় ধরনের নম্বর প্লেট স্টেইনলেস স্টিল অথবা অ্যালুমিনিয়ামের তৈরি হতে হবে। প্লেটের পটভূমি সাদা এবং অক্ষর ও সংখ্যা কালো রঙের বাংলা হরফে লিখতে হবে। অক্ষর ও সংখ্যার উচ্চতা কমপক্ষে ২০ মিলিমিটার রাখতে হবে। প্লেটে কোনো নকশা বা অতিরিক্ত সাজসজ্জা রাখা যাবে না।

মোটরসাইকেল মালিক ও বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এআই ক্যামেরা দিয়ে অপরাধ শনাক্তের লক্ষ্যের কথা বলা হলেও রাজধানী ঢাকারও বেশির জায়গায় এ ধরনের ক্যামেরা নেই। ঢাকার বাইরে এবং মফস্‌সলে বিপুল সংখ্যায় মোটরসাইকেল চলাচল করে। এসব মোটরসাইকেলে সামনে নম্বরপ্লেট লাগিয়ে কী লাভ হবে?

কতটা কাজে দেবে, সেই প্রশ্ন

মোটরসাইকেলের সামনের অংশেও নম্বর প্লেট বসানোর উদ্যোগ নিয়েছে সরকার

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সামনে-পেছনে নম্বরপ্লেট থাকলেই সব সময় ক্যামেরায় ধরা পড়বে—এমন নিশ্চয়তা নেই। যেমন ঘন কুয়াশায় ক্যামেরা নম্বরপ্লেট রিড না–ও করতে পারে। হঠাৎ বিদ্যুৎ চলে গেলে অন্ধকারে নম্বরপ্লেট পড়া যাবে না। কোনো কারণে বৃষ্টি বা কাদায় নম্বরপ্লেট দৃশ্যমান না–ও থাকতে পারে। ফলে বাড়তি একটি নম্বরপ্লেট যুক্ত করা একদিকে গ্রাহকের ওপর খরচ বাড়ানো হচ্ছে। অন্যদিকে এআই ক্যামেরা–সংক্রান্ত পর্যবেক্ষণ ও অন্যান্য কাজে সরকারি কেনাকাটা বাড়বে।

বর্তমানে প্রতিটি যানবাহনে ডিজিটাল নম্বরপ্লেটের সঙ্গে গ্রাহক আরএফআইডি ট্যাগ কিনে নিচ্ছেন। আরএফআইডি হচ্ছে বেতারতরঙ্গের মাধ্যমে যানবাহন শনাক্ত করার ইলেকট্রনিক ট্যাগ। বিআরটিএ এই ব্যবস্থা চালুর সময় বলেছিল, এর মাধ্যমে যেকোনো পরিস্থিতিতে যানবাহন শনাক্ত করা যাবে। জাল নম্বরপ্লেট ব্যবহার এবং একাধিক গাড়িতে একই নম্বর ব্যবহারের প্রবণতা বন্ধ হবে। চুরি হওয়া গাড়ি উদ্ধার: চুরি বা ছিনতাই হওয়া গাড়ির অবস্থান শনাক্ত করতে সহায়তা করবে। অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে ব্যবহৃত যানবাহন শনাক্ত করা এবং আইন প্রয়োগকারী সংস্থার নজরদারি সহজ করা। সড়কে গাড়ির চলাচল শনাক্ত ও নজরদারি করা।

আরএফআইডি থাকলে গাড়ির নিবন্ধন ও সংশ্লিষ্ট তথ্য যাচাইয়ের মাধ্যমে রাজস্ব ফাঁকি কমানো যাবে। যানবাহন নিয়ন্ত্রণ ও আইন প্রয়োগের কার্যক্রমকে ডিজিটাল ব্যবস্থার আওতায় আনা। ভবিষ্যতে স্বয়ংক্রিয়ভাবে টোল আদায়েও এই প্রযুক্তি ব্যবহারের পরিকল্পনার কথা বলা হয়েছিল। তবে এসব সুবিধা পুরোপুরি বাস্তবায়ন করতে পারেনি বিআরটিএ।

মোটরযানে ডিজিটাল নম্বরপ্লেট ও আরএফআইডি ট্যাগ ব্যবহারের ব্যবস্থা চালু হয় ২০১২ সালে। এর আগে যানবাহনের মালিকেরা বাজার থেকে নিজেদের পছন্দমতো নম্বরপ্লেট তৈরি করে লাগাতেন। পরে বিআরটিএ নির্ধারিত নম্বরপ্লেট ও আরএফআইডি ট্যাগ ব্যবস্থা চালু করে। যানবাহনের নিবন্ধনের সময় নম্বরপ্লেট ও আরএফআইডির জন্য টাকা আদায় করে বিআরটিএ। কোনো কারণে নম্বরপ্লেট বা আরএফআইডি ভেঙে গেলে বা ধ্বংস হলে বিআরটিএতে আবেদন করে পূর্ণ দাম দিয়ে নতুন আরেকটি সংযোজন করতে হয়।

বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক ও পরিবহন বিশেষজ্ঞ সামছুল হক প্রথম আলোকে বলেন, আরএফআইডি ট্যাগ কেন কার্যকর হলো না—এই প্রশ্নের জবাব আগে সরকারকে খুঁজতে হবে। পুরো পৃথিবীতে আরএফআইডি ট্যাগে সব কিছু শনাক্ত করা হয়। এআই ক্যামেরার বিষয়টি কেনাকাটার প্রকল্পে পরিণত হতে যাচ্ছে। একদিকে সরকারের কেনাকাটা বাড়বে। অন্যদিকে গ্রাহকের ওপর খরচের বোঝা পড়বে।

খরচের বোঝা বাড়তে পারে

বিআরটিএর তথ্য অনুযায়ী, গত আগস্ট পর্যন্ত দেশে নিবন্ধিত মোট যানবাহনের সংখ্যা সাড়ে ৬৮ লাখের মতো। এর মধ্যে মোটরসাইকেল প্রায় ৫১ লাখ। রাজধানী ঢাকায় নিবন্ধিত যানবাহন ২৪ লাখের বেশি। এর মধ্যে মোটরসাইকেল সাড়ে ১৩ লাখের মতো।

বর্তমানে মোটরসাইকেলের পেছনে একটি নম্বরপ্লেট রয়েছে। নিবন্ধনের সময় মালিককে সেটির জন্য নির্ধারিত টাকা দিতে হয়। গাড়িসহ অন্যান্য অনেক ধরনের যানবাহনে সামনে ও পেছনে দুটি নম্বরপ্লেট থাকে।

বিআরটিএর তথ্য অনুযায়ী, মোটরসাইকেলের একটি নম্বরপ্লেটের জন্য মালিকের কাছ থেকে ২ হাজার ২৬০ টাকা নেওয়া হয়। নিবন্ধনের সময় এই টাকা দেওয়া বাধ্যতামূলক। নম্বরপ্লেট ভেঙে গেলে বা নষ্ট হলে একই পরিমাণ টাকা দিয়ে আবার নিতে হয়।

বিআরটির নির্দেশনা হচ্ছে—মোটরসাইকেলের সামনে নম্বরপ্লেট মালিক নিজেই মাপমতো লাগাবেন। বিআরটিএ থেকে নিতে হবে না। তবে বিআরটিএ সূত্র বলছে, ভবিষ্যতে এভাবে গ্রাহকের ওপর ছেড়ে দেওয়া যাবে না। বিআরটিএ থেকেই লাগিয়ে নিতে হবে। নতুবা একই ধরনের নম্বরপ্লেট নিশ্চিত করা কঠিন হবে। এখন যে দরে পেছনের নম্বরপ্লেট লাগিয়ে দিচ্ছে বিআরটিএ, একই দরে সামনে নম্বরপ্লেট লাগালে প্রায় ৫১ লাখ মোটরসাইকেলের মালিকদের বাড়তি খরচ হবে ১ হাজার ১৫২ কোটি টাকার বেশি। এর সঙ্গে প্লেট বসানোর জন্য মোটরসাইকেলে মাউন্টিং ব্যবস্থা তৈরি বা পরিবর্তনের খরচ যুক্ত হলে ব্যয় আরও বাড়তে পারে।

সামনের নম্বরপ্লেট নিয়ে কিছু জটিলতা হতে পারে বলে মনে করছেন বিআরটিএ কর্মকর্তারা। তাঁদের মতে, পুরোনো মোটরসাইকেলের মালিকেরা হয়তো সামনে নম্বরপ্লেট লাগিয়ে নেবেন। কিন্তু সারা দেশে প্রতিদিন গড়ে ৮০০ নতুন মোটরসাইকেল নিবন্ধন নেয়। আইন অনুসারে, পেছনের নম্বরপ্লেট এবং আরএফআইডি ট্যাগ বিআরটিএ থেকে লাগাতে হবে। আবার সামনের নম্বরপ্লেট কী মালিক নিজে লাগাবেন? এসব প্রশ্নের স্পষ্ট উত্তর নেই।

বিআরটিএর এই সিদ্ধান্তের পর অনেক মোটরসাইকেলের মালিক ক্ষোভপ্রকাশ করেছেন। অনেকে এই সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে ফেসবুকে ট্রল ও মিম করেছেন। কয়েকজন মোটরসাইকেলচালক এমন ভিডিও দেন যে তাঁদের মোটরসাইকেলের সামনে নম্বরপ্লেট লাগানোর জায়গা নেই। দড়ি দিয়ে নম্বরপ্লেট বেঁধে গলায় ঝুলিয়ে মোটরসাইকেল চালিয়ে তাঁরা প্রতিবাদ জানান।

ঢাকায় রয়েল এনফিল্ডের একটি মোটরসাইকেল চালান শাহদাব আহমেদ। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ঢাকায় অনেকেই আধুনিক এবং দৃষ্টিনন্দন মোটরসাইকেল চালান। ডিজিটাল নম্বরপ্লেটটি মোটামুটি ভালোই দেখায়। কিন্তু সামনে একেকজন একেক মানের নম্বরপ্লেট লাগালে সৌন্দর্য নষ্ট হতে পারে। এ ছাড়া গ্রামগঞ্জে যেখানে এইআই ক্যামেরা নেই, সেখানে সামনে নম্বরপ্লেট লাগিয়ে লাভ কী হবে? কেউ না লাগালে পুলিশ হয়রানি করার সুযোগ পাবে।

সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন যেভাবে

সড়ক পরিবহন মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরে বৈঠকের পর গত ১৩ আগস্ট সাত সদস্যের একটি কমিটি গঠন করে বিআরটিএ। কমিটিকে মোটরসাইকেলের সামনে নম্বরপ্লেটের আকার, কোথায় বসানো হবে এবং এআই ক্যামেরায় সেটি ঠিকমতো শনাক্ত করা যাবে কি না—তা পরীক্ষা করে সুপারিশ দিতে বলা হয়।

কমিটি আটটি আমদানিকারক, বিক্রেতা ও সংগঠনের মতামত নেয়। এরপর গত ১৯ আগস্ট জাতীয় সংসদ ভবনসংলগ্ন লেক রোডে নমুনা প্লেট লাগিয়ে এআই ক্যামেরায় পরীক্ষা করা হয়। পরে ৫ সেপ্টেম্বর লেক রোডে ১০টি মডেলের মোটরসাইকেলে দ্বিতীয় দফা ট্রায়াল করা হয়।

দ্বিতীয় ট্রায়ালে শুধু ক্যামেরায় নম্বর শনাক্ত হচ্ছে কি না, তা নয়; প্লেটের কারণে মোটরসাইকেলের নিরাপত্তা, স্টিয়ারিংয়ের স্বাধীনতা, হেডলাইট ও ইন্ডিকেটরের দৃশ্যমানতা, যান নিয়ন্ত্রণ এবং দুর্ঘটনায় আঘাতের ঝুঁকিও বিবেচনা করা হয়। পাশাপাশি এআই ক্যামেরার অবস্থান, উচ্চতা, রেজোল্যুশন, ভবিষ্যতে ইলেকট্রনিক টোল, ড্রোন ও জিপিএস প্রযুক্তির সঙ্গে সামঞ্জস্যের বিষয়টিও পর্যালোচনা করা হয়।

মোটরসাইকেলের সামনে নম্বরপ্লেট না থাকার বিষয়টি এত দিন আইনের সঙ্গেই সামঞ্জস্যপূর্ণ ছিল। সড়ক পরিবহন বিধিমালা, ২০২২-এর বিধি ৩৬ (১০)-এ মোটরসাইকেল ও প্রতিবন্ধীবান্ধব মোটরযানকে সামনে নিবন্ধন নম্বর প্রদর্শন থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে। কমিটির প্রতিবেদনের পর বিধিমালায় পরিবর্তন আনে সড়ক পরিবহন মন্ত্রণালয়।