‘বিশ্বাসের পুনর্নির্মাণ আঞ্চলিক একত্রীকরণের নবায়ন: সার্ককে পুনরুজ্জীবিত করার পথ’ শীর্ষক সেমিনারে বক্তব্য দেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম। সোমবার রাজধানীর বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ইন্টারন্যাশনাল অ্যান্ড স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজের মিলনায়তনে
‘বিশ্বাসের পুনর্নির্মাণ আঞ্চলিক একত্রীকরণের নবায়ন: সার্ককে পুনরুজ্জীবিত করার পথ’ শীর্ষক সেমিনারে বক্তব্য দেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম। সোমবার রাজধানীর বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ইন্টারন্যাশনাল অ্যান্ড স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজের মিলনায়তনে

সার্কের পুনরুজ্জীবন

রাজনৈতিক বিরোধ নিষ্পত্তি না হলেও অভিন্ন নানা সমস্যা সমাধানে কাজ করা সম্ভব: শামা ওবায়েদ

সার্ক এমন একটি ফোরাম, যেখানে ছোট দেশগুলো সম্মিলিতভাবে নিজেদের বক্তব্য তুলে ধরতে পারে; ভারত গঠনমূলক আঞ্চলিক নেতৃত্ব প্রদর্শন করতে পারে; পাকিস্তান বৃহত্তর দক্ষিণ এশীয় কাঠামোর সঙ্গে সংযুক্ত থাকতে পারে এবং রাজনৈতিক বিরোধ নিষ্পত্তি না হলেও অভিন্ন নানা সমস্যা সমাধানে কাজ করা সম্ভব। সোমবার রাজধানীতে সার্কের পুনরুজ্জীবন নিয়ে আয়োজিত এক সেমিনারে প্রধান অতিথির বক্তৃতায় সরকারের পরিকল্পনার কথা জানাতে গিয়ে এই অভিমত দেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম।

দক্ষিণ এশিয়া আঞ্চলিক সহযোগিতা সংস্থার (সার্ক) পুনরুজ্জীবন নিয়ে বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ইন্টারন্যাশনাল অ্যান্ড স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজ (বিআইআইএসএস) ‘বিশ্বাসের পুনর্নির্মাণ আঞ্চলিক একত্রীকরণের নবায়ন: সার্ককে পুনরুজ্জীবিত করার পথ’ শীর্ষক ওই সেমিনারের আয়োজন করে।

সেমিনারে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন ইনডিপেনডেন্ট ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশের সেন্টার ফর বে অব বেঙ্গল স্টাডিজের উপদেষ্টা এবং ভারতে বাংলাদেশের সাবেক হাইকমিশনার তারিক এ করিম। প্যানেল আলোচক ছিলেন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সাবেক অতিরিক্ত পররাষ্ট্রসচিব (সার্ক ও বিমসটেক) এবং কোডারসট্রাস্ট বাংলাদেশের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মো. শামসুল হক এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক নিলয় রঞ্জন বিশ্বাস। বিআইআইএসএসের মহাপরিচালক মেজর জেনারেল এ এস এম রিদওয়ানুর রহমান অনুষ্ঠানে স্বাগত ও সমাপনী বক্তব্য দেন।

আলোচনায় পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী বলেন, রাজনৈতিক অবিশ্বাস, অমীমাংসিত দ্বিপক্ষীয় বিরোধ, আন্তসীমান্ত উত্তেজনা, ক্ষমতার ভারসাম্যহীনতা এবং প্রতিযোগিতাপূর্ণ নিরাপত্তা ধারণার কারণে সার্ক আক্রান্ত হয়েছে। তিনি বলেন, সার্কের উদ্দেশ্য কোনো দুই দেশকে রাজনৈতিক সংলাপে বাধ্য করা নয়; বরং দ্বিপক্ষীয় উত্তেজনা যাতে পুরো আঞ্চলিক সহযোগিতা ব্যবস্থাকে অচল না করে, তা নিশ্চিত করা।

শামা ওবায়েদ বলেন, একই সঙ্গে সার্ককে অবশ্যই দক্ষিণ এশিয়ার একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক প্ল্যাটফর্ম হিসেবে থাকতে হবে। তাই সব সদস্যদেশের জন্য দরজা খোলা রাখতে হবে এবং একই সঙ্গে সম্মত কারিগরি ও উন্নয়নমূলক সহযোগিতা অব্যাহত রাখতে হবে।

সার্ক নিয়ে বাংলাদেশের দৃষ্টিভঙ্গি বাস্তবসম্মত উল্লেখ করে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী বলেন, ‘আমরা আশাবাদী, একই সঙ্গে বাস্তববাদীও। আমরা মনে করি না যে সার্ক রাতারাতি পূর্ণ রাজনৈতিক স্বাভাবিকতায় ফিরে যাবে। আবার এটাও মানি না যে কিছুই করা সম্ভব নয়। বাস্তবসম্মত, কারিগরি এবং জনকল্যাণমূলক কর্মসূচি গ্রহণ করলে অনেক কিছুই করা সম্ভব।’

শামা ওবায়েদ আরও বলেন, সামনে এগিয়ে যাওয়ার পথ হলো প্রতিষ্ঠানটিকে সংরক্ষণ করা, যা এখনো কার্যকর রয়েছে, তা আরও শক্তিশালী করা, দুর্বল দিকগুলো সংস্কার এবং যেখানে ঐকমত্য সম্ভব, সেখানে সহযোগিতা গড়ে তোলা। এভাবেই পারস্পরিক আস্থা ফিরে আসতে পারে বলে মনে করেন তিনি।

পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী বলেন, সার্ক এখন বিচক্ষণ নেতৃত্ব, বাস্তবভিত্তিক সহযোগিতা এবং নতুন আস্থার অপেক্ষায় রয়েছে। বাংলাদেশ সেই আস্থা তৈরিতে অবদান রাখতে প্রস্তুত।

দুটির একটিকে বেছে নেওয়া নয়

বাংলাদেশের সার্ক ও বিমসটেকের (বহুখাতভিত্তিক কারিগরি ও অর্থনৈতিক সহযোগিতার জন্য বঙ্গোপসাগরীয় উদ্যোগ) মধ্যে যেকোনো একটিকে বেছে নেওয়ার প্রয়োজন নেই বলে মনে করেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী। তিনি বলেন, এ দুটি প্ল্যাটফর্মের মধ্যে প্রতিযোগিতা নয়, বরং পরিপূরক সম্পর্ক থাকা উচিত।

শামা ওবায়েদ বলেন, বিমসটেক দক্ষিণ এশিয়াকে বঙ্গোপসাগর ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সঙ্গে যুক্ত করে। অন্যদিকে সার্ক দক্ষিণ এশিয়ার সবচেয়ে বিস্তৃত আঞ্চলিক পরিচয়ের প্রতিনিধিত্ব করে, যেখানে বিমসটেকের বাইরে থাকা দেশগুলোও অন্তর্ভুক্ত। তিনি বলেন, উপ-আঞ্চলিক উদ্যোগগুলো যেন সার্কের গতি কমিয়ে না দেয়; বরং এগুলোকে বৃহত্তর আঞ্চলিক সহযোগিতার ভিত্তি হিসেবে গড়ে তুলতে হবে।

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে আত্মবিশ্বাসী বাংলাদেশ একই সঙ্গে সার্ক এবং বিমসটেককে সমর্থন করতে পারে বলে মন্তব্য করেন শামা ওবায়েদ। তিনি বলেন, কারণ, যোগাযোগ, স্থিতিশীলতা, সমৃদ্ধি ও উন্নয়নের ক্ষেত্রে উভয় প্ল্যাটফর্মই বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থ রক্ষা করে।

সার্ককে সর্বোচ্চ কার্যকর চায় বাংলাদেশ

সার্ক নিয়ে প্রত্যাশা জানিয়ে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী বলেন, সার্ককে পুনরুজ্জীবিত করার প্রাথমিক ধাপে বাংলাদেশ চায়, পূর্ণাঙ্গ রাজনৈতিক পরিবেশ সৃষ্টি না হওয়া পর্যন্ত সংস্থাটি ‘সর্বোচ্চ কার্যকর অবস্থায়’ পরিচালিত হোক। তিনি বলেন, ‘সর্বোচ্চ কার্যকর অবস্থায়’ কথাটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এর অর্থ শুধু প্রতীকীভাবে সার্ককে টিকিয়ে রাখা নয়। বর্তমান পরিস্থিতিতে বাস্তবসম্মতভাবে যতটুকু সম্ভব, তার সর্বোচ্চটা করা। অর্থাৎ লক্ষ্য হবে উচ্চাভিলাষী, কিন্তু পদ্ধতি হবে বাস্তবভিত্তিক।

শামা ওবায়েদ বলেন, নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর তিনি সার্কভুক্ত সব দেশের প্রতিনিধিদের সঙ্গে পৃথকভাবে কথা বলেছেন এবং সার্কের পুনরুজ্জীবন নিয়ে তাঁদের ইতিবাচক মনোভাব লক্ষ করেছেন।

মানচিত্রে কাশ্মীর নিয়ে ভারত ও পাকিস্তানের আপত্তি

সেমিনারে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপনের সময় প্রদর্শিত একটি মানচিত্র নিয়ে আপত্তি জানান ঢাকায় ভারতীয় হাইকমিশনের দ্বিতীয় সচিব (রাজনৈতিক ও তথ্য) পূজা কুমারী ঝা। তিনি বলেন, এখানে (পাওয়ার পয়েন্টে উপস্থাপিত প্রবন্ধের স্লাইডে) ভারতের যে মানচিত্র দেখানো হয়েছে, তা সঠিক নয়। জম্মু ও কাশ্মীর ভারতের অবিচ্ছেদ্য অংশ। তাই উপস্থাপিত মানচিত্রটি সঠিক নয় বলে তিনি মনে করেন।

তখন আলোচনায় মূল প্রবন্ধ উপস্থাপনকারী ও ভারতে বাংলাদেশের সাবেক হাইকমিশনার তারিক এ করিম বলেন, উপস্থাপনার জন্য মানচিত্রটি ব্যবহার করা হয়েছে এবং এটি প্রকৃত সীমারেখা নির্দেশ করে না।

পরে পূজা কুমারী ঝা বলেন, ‘আমি বুঝতে পারছি, স্যার। কিন্তু জম্মু ও কাশ্মীরকে আমরা ভারতের অংশ হিসেবে দেখি এবং এখানে সেটি ভুলভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে। তাই বিষয়টি শুধু উল্লেখ করতে চেয়েছি।’ তারিক করিম তখন বলেন, বিষয়টি বিবেচনায় নেওয়া হলো।

এরপর বাংলাদেশের সাবেক কূটনীতিক ও ইনডিপেনডেন্ট ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশের (আইইউবি) সেন্টার ফর বে অব বেঙ্গলের উপদেষ্টা তারিক এ করিম প্রবন্ধ উপস্থাপন অব্যাহত রাখা শুরু করলে বক্তব্য দিতে চান ঢাকায় পাকিস্তানের উপহাইকমিশনার মোহাম্মদ ওয়াসিফ। পাকিস্তানের ওই কূটনীতিক বলেন, ‘আমিও একটি বিষয়ে আপনার দৃষ্টি আকর্ষণ করছি।’ তিনি জম্মু ও কাশ্মীর নিয়ে পাকিস্তানের অবস্থান তুলে ধরতে চাইলে তারিক করিম তাঁকে থামিয়ে দিয়ে বলেন, ‘আমাকে আলোচনা শেষ করতে দিন। আমি পরে এ নিয়ে কথা বলছি।’