হামে আক্রান্ত লিপি আক্তারকে (৩৬) খাইয়ে দিচ্ছেন বড় বোন শিল্পী আক্তার। আজ সোমবার দুপুরে মহাখালীর ডিএনসিসি হাসপাতালে
হামে আক্রান্ত লিপি আক্তারকে (৩৬) খাইয়ে দিচ্ছেন বড় বোন শিল্পী আক্তার। আজ সোমবার দুপুরে মহাখালীর ডিএনসিসি হাসপাতালে

‘হামে যে এত কষ্ট, আল্লাহ ছাড়া কেউ জানে না’

‘হামে যে এত কষ্ট, আল্লাহ ছাড়া কেউ জানে না। আমি যে কষ্ট করেছি, এই কষ্ট আল্লাহ কাউরে না করাক। কী যে ভোগাটা ভুগতেছি, আল্লাহ তুমি আমারে রহমত করো।’ কথাগুলো বলেই হু হু করে কাঁদছিলেন লিপি আক্তার (৩৬)। তাঁকে সান্ত্বনা দিচ্ছিলেন বড় বোন শিল্পী আক্তার।

আজ সোমবার বেলা দেড়টার দিকে রাজধানীর মহাখালীর ডিএনসিসি কোভিড-১৯ ডেডিকেটেড হাসপাতালে এই চিত্র দেখা যায়। হামে আক্রান্ত হয়ে এই হাসপাতালে চিকিৎসাধীন আরও অনেক রোগীর অবস্থা লিপি আক্তারের মতো।

বেলা দেড়টার দিকে হাসপাতালটির চতুর্থ তলায় গিয়ে দেখা যায়, লিপি আক্তারকে দুপুরের খাবার খাইয়ে দিচ্ছেন বড় বোন শিল্পী আক্তার।

শিল্পী আক্তারের সঙ্গে কথা বলে জনা যায়, কুমিল্লার ক্যান্টনমেন্ট এলাকা থেকে গত ২৭ মে এই হাসপাতালে এসেছেন তাঁরা। এর আগে ২২ মে অসুস্থ হন লিপি আক্তার। প্রথমে হামের বিষয়টি তাঁরা বুঝতে পারেননি। জ্বর ও অন্যান্য রোগ ভেবে তিন দিন কুমিল্লা ময়নামতি জেনারেল হাসপাতালে তাঁরা চিকিৎসা নিয়েছিলেন। কোনো পরিবর্তন না দেখে পরে সেখান থেকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে আসেন। ঢাকা মেডিকেল থেকে মহাখালীর সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালে পাঠানো হয়। সেখান থেকে ২৯ মে ডিএনসিসি কোভিড-১৯ ডেডিকেটেড হাসপাতালে আনা হয়।

এখানে আনার পর লিপি আক্তারকে চার দিন নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) রাখা হয়। শারীরিক অবস্থার কিছুটা উন্নতি হওয়ার পর গতকাল রোববার বিকেলে তাঁকে চতুর্থ তলার এই ওয়ার্ডে দেওয়া হয়। আইসিইউতে থাকার সময়টা অনেক দুশ্চিন্তায় গেছে জানিয়ে লিপি আক্তার প্রথম আলোকে বলেন, ‘কখনো এ রকম হাম হবে ভাবি নাই। করোনার মতো ভয়াবহ, আত্মীয়স্বজন কেউ আসে না। সবাইকে দূরত্বে থাকতে হয়।’

হামে আক্রান্ত প্রাপ্তবয়স্ক অনেকে চিকিৎসার জন্য আসছেন হাসপাতালে। আজ সোমবার দুপুরে মহাখালীর ডিএনসিসি হাসপাতালে

লিপি আক্তারের পাশাপাশি হামে আক্রান্ত হয়ে বর্তমানে এই হাসপাতালে চিকিৎসা নিচ্ছেন গাজীপুরের রহিমা আক্তার (৪০), নরসিংদীর মাহমুদুল হাসানসহ (৩২) প্রাপ্তবয়স্ক অন্তত ৪৪ জন মানুষ।

হাম প্রতিরোধযোগ্য একটি রোগ। টিকা দেওয়ার মধ্য দিয়ে এই রোগ নিয়ন্ত্রণে এনেছিল বাংলাদেশ। তবে গত বছর টিকা প্রদানে ঘাটতি হওয়ার পর এবার দেশে ব্যাপকভাবে হামের প্রাদুর্ভাব ঘটেছে। ইতিমধ্যে হাম ও হামের উপসর্গ নিয়ে দেশে ৫৮৮ জনের মৃত্যু হয়েছে। আর হাম ও হামের উপসর্গ দেখা দিয়েছে ৭২ হাজারের বেশি মানুষের। হাম ও হামের উপসর্গ নিয়ে মারা যাওয়া এবং আক্রান্ত রোগীদের অধিকাংশই শিশু। হাম নিয়ন্ত্রণে আনতে দেশব্যাপী জরুরি টিকাদান কর্মসূচি পরিচালনা করা হলেও এখনো রোগটির সংক্রমণ কমেনি। প্রতিদিন হাম ও এর উপসর্গ নিয়ে হাজারের বেশি রোগী হাসপাতালে ভর্তি হচ্ছে।

ভুগছে শিশুরা

হাসপাতালের চতুর্থ তলায় লিপি আক্তারকে যেখানে রাখা হয়েছে, তাঁর পাশের আরেকটি কক্ষে দুটি শয্যায় চিকিৎসা নিচ্ছে হামে আক্রান্ত দুই বোন জাকিয়া (১১) ও সাফিয়া (৬)। যন্ত্রণায় তারা কাতরাচ্ছিল। তাদের শান্ত করার চেষ্টা করছিলেন মা নূরজাহান বেগম। নূরজাহান জানান, তাঁরা নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জ থেকে এসেছেন। দুই মেয়েকে এনে গত শুক্রবার হাসপাতালে ভর্তি করেন।

এর আগে তাঁর বড় মেয়ে হাবিবার (১৩) হাম হয়েছিল জানিয়ে নূরজাহান বেগম বলেন, ‘ওরে নিয়ে এই হাসপাতালে আসছিলাম। সে সুস্থ হলে ঈদের তিন দিন আগে বাড়ি ফিরি। বাড়ি যাওয়ার দুই দিন পর দেখি, এই দুই মেয়েও আক্রান্ত। পরে তাড়াতাড়ি করে তাদের এই হাসপাতালে নিয়ে আসি।’

হামের উপসর্গ দেখা দিলে চিকিৎসার জন্য শিশুদের আনা হচ্ছে হাসপাতালে। আজ সোমবার দুপুরে মহাখালীর ডিএনসিসি হাসপাতালে

পরপর তিন মেয়ে হামে আক্রান্ত হওয়ায় খুব ভোগান্তি হচ্ছে বলে জানান নূরজাহান বেগম। তিনি বলেন, ‘দুইটা বাচ্চারে একসঙ্গে বাসায় রাইখা সেবাযত্ন করা, সংসারের কাজ করা, আবার হাসাপাতালে আনার পর সার্বক্ষণিক দেখাশোনা করতে হয়। সব মিলায়া অনেক কষ্ট হইয়া যাচ্ছে।’

দেশে হামের প্রকোপ শুরু হওয়ার পর থেকে এখন পর্যন্ত ডিএনসিসি কোভিড-১৯ ডেডিকেটেড হাসপাতালে ৬ হাজার ৭৫৫ জন রোগী ভর্তি হয়েছে। তাদের মধ্যে অধিকাংশই শিশু। ভর্তি হওয়া রোগীদের মধ্যে এখন পর্যন্ত মারা গেছে ৪১ জন।

বর্তমানে হাসপাতালটিতে চিকিৎসাধীন চার শতাধিক হামের রোগী। তাদের মধ্যে ৪৮ জন আইসিউতে আছে।