মা গেল বাসায়, মেয়ে এল হাসপাতালে

হাসপাতালে মুনতাহার দেখাশোনা করছেন মামি তানজিনা আক্তার। চট্টগ্রাম, ১৫ আগস্ট
ছবি: প্রথম আলো

এক সপ্তাহ আগে জ্বর আসে সালেহা বেগমের। এতে দুর্বল হয়ে পড়ে শরীর। জ্বরের সঙ্গে শুরু হয় মাথার ব্যথা। রক্ত পরীক্ষায় তাঁর ডেঙ্গু ধরা পড়ে। একই দিন জ্বরের কবলে পড়ে তাঁর মেয়ে মুনতাহা ইসলাম। সে-ও ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়। দুজনের চিকিৎসা চলছিল বাসাতেই। অবস্থার অবনতি হলে হাসপাতালে ভর্তি হন সালেহা। সুস্থ হয়ে গতকাল সোমবার বাসায় ফিরে যান। তিনি বাসায় ফিরলেও গতকালই মেয়েকে হাসপাতালে ভর্তি করানো হয়। এখন মা থাকছেন বাসায়, আর মেয়ে হাসপাতালে।

হাসপাতালে পাঁচ বছর বয়সী মুনতাহার দেখাশোনা করছেন মামি তানজিনা আক্তার ও মামা শফিকুল আলম। আজ মঙ্গলবার দুপুরে চট্টগ্রামের আগ্রাবাদে মা ও শিশু জেনারেল হাসপাতালে তাঁদের সঙ্গে কথা হয়। হাসপাতালের শিশু বিভাগে রাখা হয়েছে মুনতাহাকে। তার হাতে ক্যানুলা লাগানো। বারবার ক্যানুলা খুলে ফেলতে চাচ্ছিল। আর যেতে চাইছিল মায়ের কাছে। মুনতাহা বারবার বলছিল, ‘আমি মায়ের কাছে যাব, মায়ের কাছে যাব।’

মুনতাহার মামি তানজিনা আক্তার প্রথম আলোকে বলেন, ডেঙ্গু মা আর মেয়েকে আলাদা করে দিল। রক্তের অণুচক্রিকা কমে যাওয়া আর জ্বর না কমার কারণে তাকে গতকাল হাসপাতালে ভর্তি করাতে হয়। আর গতকালই মাকে বাসায় পাঠান চিকিৎসকেরা। এখন মেয়েটা সারা দিন মায়ের কাছে যেতে কান্নাকাটি করছে।

মামা শফিকুল আলম বলেন, হাসপাতালে থাকতে চাইছে না মুনতাহা। কিন্তু চিকিৎসকেরা তাকে পর্যবেক্ষণে রেখেছেন। রক্ত পরীক্ষা করানো হয়েছে। প্লাটিলেট (অণুচক্রিকা) ৩৫ হাজারে নেমেছে। তাই মুনতাহাকে বাসায় নিয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই আপাতত।

তিন ছেলে নিয়ে বিপদে মা

হাসপাতালে শুধু মুনতাহা নয়, তার মতো আরও ৯ শিশু ডেঙ্গুর চিকিৎসা নিচ্ছে। এর মধ্যে এমদাদুল ইসলাম (১০) ও ইমতিয়াজ ইসলাম (১৩) দুই ভাই। তারা দুজনই ছয় দিন আগে ডেঙ্গু নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে। তাদের সঙ্গে আছে ছোট ভাই নিহান ইসলাম। নিহানের বয়স মাত্র এক বছর। সে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়নি। কিন্তু মা-ভাইদের সঙ্গে তারও হাসপাতালে দিন কাটাতে হচ্ছে।

ডেঙ্গু নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে এমদাদুল ইসলাম ও তার ভাই ইমতিয়াজ ইসলাম। চট্টগ্রাম, ১৫ আগস্ট

হাসপাতালে তিন ভাইয়ের সঙ্গে আরও আছেন নানি রেজিয়া বেগম। আজ দুপুরে যখন কথা হচ্ছিল রেজিয়া বেগমের সঙ্গে, তখন তাঁর কোলে কান্না করছিল নিহান। মা ওষুধ আনতে হাসপাতালের বাইরে গিয়েছিলেন। কিছুক্ষণ পর তিনি ফিরে আসেন। প্রথম আলোকে বলেন, ‘ডেঙ্গু আক্রান্ত দুই ছেলেকে নিয়ে বিপদে আছি। তাদের বাবা মো. ইলিয়াস সৌদি আরব থাকেন। ছেলেদের দেখাশোনা করার জন্য মা (রেজিয়া বেগম) আর আমিই আছি। অনেক দুশ্চিন্তার মধ্যে দিয়ে যাচ্ছি।’

এমদাদুল পড়ে চতুর্থ শ্রেণিতে, ইমতিয়াজ সপ্তম শ্রেণিতে। তারা থাকে নগরের আগ্রাবাদ হাজিপাড়া এলাকায়। ইমতিয়াজ প্রথম আলোকে বলে, সে হাসপাতালে থাকতে চায় না। এখানে তার ভালো লাগে না।

হাসপাতাল ঘুরে কথা হয় সুমি আক্তারের সঙ্গে। তাঁর একমাত্র ছেলে জুনায়েদ ইসলামের বয়স মাত্র ১৩ মাস। গত শনিবার খিঁচুনি দিয়ে জ্বর আসে তার। জ্বরে মাথা তুলতে পারছিল না। এরপর দ্রুত তাকে হাসপাতালে নিয়ে আসেন মা সুমি ও বাবা সুমন হাওলাদার। তাঁরা বলেন, ‘আমাদের একমাত্র ছেলে সে। জন্মের পর কয়েকবার হাসপাতালে আসতে হলো।

এখন ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়েছে। অনেক ভয় লাগছে। চারদিকে ডেঙ্গুতে মৃত্যুর খবর শুনছি।’
সিভিল সার্জন মোহাম্মদ ইলিয়াছ চৌধুরী প্রথম আলোকে বলেন, ডেঙ্গুতে শিশুরা বেশি আক্রান্ত হচ্ছে। এ কারণে অভিভাবকদের সতর্ক থাকতে হবে। বাড়িঘরের আশপাশ পরিষ্কার রাখতে হবে। এডিস মশার বংশবিস্তার ধ্বংস করে দিতে হবে।