‘ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ধর্মীয় সংখ্যালঘুসহ সব প্রান্তিক জাতিগোষ্ঠীর নিরাপত্তা ও ভোটাধিকার প্রয়োগে সম-নির্বাচনী পরিবেশ নিশ্চিত করার দাবিতে’ সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করে সিটিজেন ফর হিউম্যান রাইটস
‘ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ধর্মীয় সংখ্যালঘুসহ সব প্রান্তিক জাতিগোষ্ঠীর নিরাপত্তা ও ভোটাধিকার প্রয়োগে সম-নির্বাচনী পরিবেশ নিশ্চিত করার দাবিতে’ সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করে সিটিজেন ফর হিউম্যান রাইটস

সংবাদ সম্মেলন: সংখ্যালঘু ভোটারদের নিরাপত্তা নিশ্চিতে বিশেষ উদ্যোগ ও পদক্ষেপ দাবি

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সংখ্যালঘু ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর মানুষের নির্বিঘ্ন ভোটাধিকার নিশ্চিত করতে সরকারের কাছে পাঁচ দফা দাবি করেছে সিটিজেন ফর হিউম্যান রাইটস নামের একটি সংগঠন। দাবিগুলো করা হয়েছে অন্তর্বর্তী সরকার, নির্বাচন কমিশন (ইসি), আইন প্রয়োগকারী সংস্থাসহ সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর কাছে। এসব দাবির মধ্যে প্রথমটি হলো—ধর্মীয় সংখ্যালঘু–অধ্যুষিত নির্বাচনী এলাকায় ভোটারদের নিরাপত্তা নিশ্চিতে আইন প্রয়োগকারী সংস্থাকে বিশেষ কার্যকরী উদ্যোগ ও পদক্ষেপ নিতে সুনির্দিষ্ট নির্দেশনা দেওয়া এবং এ বিষয়টি নিয়মিত তদারকের জন্য উচ্চপর্যায়ের বিশেষ কেন্দ্রীয় প্রশাসনিক সেল গঠন।

অন্য দাবিগুলোর মধ্যে আছে—রাউজান ও মিরসরাইসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে সংখ্যালঘুদের ওপর সংঘটিত সব ধরনের সহিংসতার তদন্ত, দোষীদের দ্রুত গ্রেপ্তার করে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া, যথাযথ প্রক্রিয়া অনুসরণ করে প্রকৃত ক্ষতি নিরূপণ করে ভুক্তভোগীদের পর্যাপ্ত ক্ষতিপূরণ ও পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করা এবং ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের সদস্যদের মানসিক আঘাত দূর করতে ব্যবস্থা নেওয়া। এ ছাড়া নবগঠিত মানবাধিকার কমিশন যাতে সংখ্যালঘুদের বিষয়টি অগ্রাধিকার ভিত্তিতে নজরদারিতে রাখে এবং প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেয়, সেই আহ্বানও জানিয়েছে সিটিজেন ফর হিউম্যান রাইটস।

আজ রোববার সকালে ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির সাগর–রুনি মিলনায়তনে এক সংবাদ সম্মেলনে এসব দাবি তুলে ধরা হয়। ‘সরেজমিন পর্যবেক্ষণের অভিজ্ঞতা এবং ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ধর্মীয় সংখ্যালঘুসহ সব প্রান্তিক জাতিগোষ্ঠীর নিরাপত্তা ও ভোটাধিকার প্রয়োগে সম-নির্বাচনী পরিবেশ নিশ্চিত করার দাবিতে’ এই সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করে সিটিজেন ফর হিউম্যান রাইটস। সংবাদ সম্মেলন থেকে নির্বাচনমুখী সব রাজনৈতিক দলের প্রতি ধর্মীয় ও জাতিগত সংখ্যালঘুদের ভোটাধিকার নিশ্চিত করা এবং নির্বাচন–পরবর্তী নিরাপত্তা দেওয়ার ক্ষেত্রে সক্রিয় ভূমিকা রাখার আহ্বান জানানো হয়।

সিটিজেন ফর হিউম্যান রাইটসের একটি প্রতিনিধিদল ১ ফেব্রুয়ারি চট্টগ্রামের রাউজান ও মিরসরাইয়ের আক্রান্ত এলাকায় গিয়েছিল। সরেজমিন পরিদর্শনের সেই অভিজ্ঞতা সংবাদ সম্মেলনে তুলে ধরেন নাগরিক উদ্যোগের প্রধান নির্বাহী জাকির হোসেন। এতে বলা হয়, প্রতিটি জাতীয় নির্বাচনের আগে বা পরে সংখ্যালঘু জনপদের নাগরিকদের আতঙ্ক, ভয় যেন আজ চরম সত্যে পরিণত হচ্ছে। আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগেও দেশের বিভিন্ন স্থানে ধর্মীয় ও জাতিগত সংখ্যালঘু, বিশেষ করে সনাতন ধর্মের অনুসারীদের ওপর বিভিন্ন সহিংসতার ঘটনা ঘটছে। ইতিমধ্যেই চট্টগ্রামের রাউজানে গত ১ নভেম্বর ২০২৫ থেকে কমপক্ষে ১২টি সনাতন ধর্মাবলম্বীর বাড়িতে অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটেছে। এসব ঘটনায় রাতে ঘুমন্ত অবস্থায় বাইরে থেকে তালা লাগিয়ে অগ্নিসংযোগের মতো ন্যক্কারজনক ঘটনা ঘটেছে। এ ছাড়া মিরসরাইয়ে সাতটি বাড়িতে অগ্নিসংযোগ করা হয়েছে।

জাকির হোসেন বলেন, সংখ্যালঘুদের ওপর সহিংসতার উদ্দেশ্য হলো, বিভিন্ন স্থানে আতঙ্ক ছড়িয়ে সংখ্যালঘুদের ভোটাধিকার প্রয়োগ থেকে বঞ্চিত রাখা। রাউজান ও মিরসরাইয়ে সংঘটিত সহিংসতাগুলো ঠেকানোর ক্ষেত্রে স্থানীয় প্রশাসন কার্যকর ভূমিকা রাখতে ব্যর্থ হয়েছে। এ ছাড়া কার্যকরী কোনো আইনি ও প্রশাসনিক পদক্ষেপ না নিয়ে সংখ্যালঘু নাগরিকদের সুরক্ষা এবং নিরাপত্তা প্রদানের বিষয়টি বিঘ্নিত হচ্ছে।

পর্যবেক্ষক দলে ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক রোবায়েত ফেরদৌস। সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেন, অন্তর্বর্তী সরকারের সময় সবচেয়ে নির্যাতনের শিকার হয়েছেন জাতিগত ও ধর্মীয় সংখ্যালঘুরা। বাংলাদেশের সংবিধানে রাষ্ট্রীয় ধর্ম ইসলাম থাকলেও পাশাপাশি অন্য সব ধর্মের নিরাপত্তার বিধান করা রাষ্ট্রের কর্তব্য। আজকে তারা সেই নিরাপত্তা পাচ্ছেন না। মুসলিম ছাড়া বাকি জনগোষ্ঠীদের এ দেশে দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিকে পরিণত করা হয়েছে। আসন্ন নির্বাচনে এ দেশে ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের ভোট দেওয়া থেকে বিরত রাখার জন্য তাদের ওপর সাম্প্রদায়িক সহিংসতা ঘটিয়ে আতঙ্ক সৃষ্টি করা হচ্ছে।

আদিবাসী যুব ফোরামের আন্তর্জাতিক–বিষয়ক সম্পাদক সতেজ চাকমাও ওই পর্যবেক্ষক দলে ছিলেন। তিনি বলেন, সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের লোকজন সুযোগ পেলেই অন্য দেশে পাড়ি জমাচ্ছেন। দেশান্তরি হয়ে তাঁরা অন্য কোথাও আশ্রয় নিচ্ছেন। এটা একধরনের সংখ্যাশূন্যকরণ প্রক্রিয়া। দেশের সংখ্যালঘু ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর ভোটাধিকার প্রতিষ্ঠা করা না গেলে বাংলাদেশে এই নাগরিকেরা আরও প্রান্তিকতার দিকে ধাবিত হবেন এবং তাঁদের ওপর চলা নিপীড়ন ও বৈষম্য আরও বাড়বে।

সতেজ চাকমার সঞ্চালনায় সংবাদ সম্মেলনে অন্যদের মধ্যে এএলআরডির নির্বাহী পরিচালক শামসুল হুদা, মানবাধিকারকর্মী দীপায়ন খীসা প্রমুখ বক্তব্য দেন।