
১৩ বছর আগে নারায়ণগঞ্জের মেধাবী কিশোর তানভীর মুহাম্মদ ত্বকী হত্যা, ২০২১ সালে রাজধানীর গুলশানের ফ্ল্যাট থেকে কলেজছাত্রী মোসারাত জাহান মুনিয়ার ঝুলন্ত মরদেহ উদ্ধার এবং সর্বশেষ পল্লবীতে শিশুকে নৃশংসভাবে হত্যা। বছরের পর বছর দেশে ধর্ষণ ও হত্যার বিচারহীনতার এই সংস্কৃতি যেন মানুষের সহ্যশক্তির সীমা পরীক্ষা করছে।
আজ শুক্রবার রাজধানীর মানিক মিয়া অ্যাভিনিউয়ে জাতীয় সংসদ ভবনের সামনে এক প্রতিবাদ সমাবেশে এসব কথা বলেন অর্থনীতিবিদ আনু মুহাম্মদ।
মেধাবী কিশোর তানভীর মুহাম্মদ ত্বকী হত্যার ১৩ বছর পরও বিচার না হওয়ার প্রতিবাদে এই সমাবেশ আয়োজন করে সন্ত্রাস নির্মূল ত্বকী মঞ্চ। সমাবেশে কবি, সাহিত্যিক, শিল্পী ও বিশিষ্ট নাগরিকেরা অংশ নেন।
২০১৩ সালের ৬ মার্চ নারায়ণগঞ্জের শহরের শায়েস্তা খাঁ রোডের বাসা থেকে বের হওয়ার পর নিখোঁজ হয় ত্বকী। দুই দিন পর ৮ মার্চ শীতলক্ষ্যা নদীর কুমুদিনী খাল থেকে ত্বকীর লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। ওই বছরের ১২ নভেম্বর আজমেরী ওসমানের সহযোগী সুলতান শওকত (ভ্রমর) এবং ২৪ নভেম্বর ২০২৪ কাজল হাওলাদার আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে জানান, আজমেরী ওসমানের নেতৃত্বে ত্বকীকে অপহরণের পর হত্যা করা হয়।
২০১৪ সালের ৫ মার্চ তদন্তকারী সংস্থা র্যাব সংবাদ সম্মেলন করে জানায়, নারায়ণগঞ্জের ওসমান পরিবারের নির্দেশে তাঁদেরই টর্চারসেলে ১১ জন মিলে ত্বকীকে হত্যা করেছেন। অচিরেই তারা অভিযোগপত্র আদালতে পেশ করবে। কিন্তু সে অভিযোগপত্র আজও পেশ করা হয়নি।
সমাবেশে আনু মুহাম্মদ বলেন, ‘আমরা কোথায় এসে ঠেকেছি? নির্মমতা ও নৃশংসতার কত দূর পর্যন্ত যেতে পারে? আমাদের হজমশক্তি কতটা হতে পারে? আমাদের সহ্যশক্তি কতটা হতে পারে, তারই যেন পরীক্ষা হচ্ছে।’ ত্বকী হত্যার বিচারের পাশাপাশি সাম্প্রতিক সময়ে ঘটা বিভিন্ন ধর্ষণ ও হত্যার বিচার দাবি করেন তিনি।
সাবেক প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপে ত্বকী হত্যার বিচার বন্ধ হয় এবং অন্তর্বর্তী সরকারের উদাসীনতায় তা এখনো ঝুলে আছে বলে অভিযোগ করেন আনু মুহাম্মদ। তিনি বলেন, ‘আদালত ঠিক কার্বন কপির মতো হাসিনা আমলে যেভাবে পিছিয়ে এসেছে, অন্তর্বর্তী ও বর্তমান সরকারের আমলেও একইভাবে পিছিয়ে এসেছে।’
মুনিয়ার ঘটনায় বসুন্ধরা গ্রুপের এমডির (সায়েম সোবহান আনভীর) বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নিয়ে পার পাইয়ে দেওয়া এবং পল্লবীর শিশুটির প্রতি নির্মমতা সমাজের চরম নিষ্ঠুরতাকে নির্দেশ করে বলেও উল্লেখ করেন আনু মুহাম্মদ।
এ সময় ধর্মীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিশু ও নারী নির্যাতনের ঘটনায়ও উদ্বেগ প্রকাশ করেন এই শিক্ষাবিদ। ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে চলা নির্মমতা প্রতিরোধ ও নির্যাতিতদের পাশে দাঁড়ানোর আহ্বান জানান তিনি।
দীর্ঘ ১৩ বছরেও ত্বকী হত্যার বিচার না হওয়াকে একটি ‘ভয়াবহ বাস্তবতা’ বলে উল্লেখ করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক সামিনা লুৎফা। তিনি বলেন, দেশে আইনের শাসন ও নিরাপদ পরিবেশ না থাকায় একের পর এক শিশু-কিশোর হত্যাকাণ্ডের শিকার হচ্ছে।
বিচারহীনতার সংস্কৃতির বিরুদ্ধে ক্ষোভ প্রকাশ করে ত্বকী হত্যার বিচারের দাবি জানান মানবাধিকারকর্মী ও লেখক ইলিরা দেওয়ান। পাহাড় ও সমতলে দীর্ঘদিনের বিচারহীনতার উদাহরণ টেনে তিনি বলেন, বিচার প্রাপ্তি অনিশ্চিত হলেও পরবর্তী প্রজন্মের স্বার্থে আন্দোলন চালিয়ে যেতে হবে। অন্যায়ের বিরুদ্ধে সোচ্চার না হলে প্রশাসনের ঘুম ভাঙবে না।
দীর্ঘ ১৩ বছরেও ত্বকী হত্যার বিচার না হওয়াকে দেশের ভঙ্গুর বিচারব্যবস্থার প্রতীক হিসেবে উল্লেখ করেন তাঁর বাবা ও সন্ত্রাস নির্মূল ত্বকী মঞ্চের আহ্বায়ক রফিউর রাব্বি। তিনি বলেন, র্যাব তদন্ত শেষ করে ওসমান পরিবারকে খুনি হিসেবে চিহ্নিত করলেও বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের শীর্ষ পর্যায়ের রাজনৈতিক সদিচ্ছার অভাবে ত্বকী হত্যার বিচারপ্রক্রিয়া বন্ধ হয়ে যায়।
সারা দেশে শিশু-কিশোর ও নারীদের ওপর নির্যাতন এবং ধর্ষণের ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করেন রফিউর রাব্বি। মুক্তিযুদ্ধ ও চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থানের স্বপ্ন অনুযায়ী একটি অসাম্প্রদায়িক, মানবিক ও নিরাপদ রাষ্ট্র গঠনের আহ্বান জানান তিনি।
প্রতিবাদ সমাবেশে আরও বক্তব্য দেন শিল্পী অরূপ রাহী, গণতান্ত্রিক সাংস্কৃতিক ঐক্যের আহ্বায়ক জামসেদ আনোয়ার প্রমুখ।
ত্বকী হত্যার বিচার চেয়ে গান পরিবেশন করেন শিল্পী ওয়ারদা আশরাফ, বীথি ঘোষ, বাংলাদেশ উদীচী শিল্পীগোষ্ঠীর শিল্পীরাসহ অনেকে। আবৃত্তি করেন জিয়াউল ইসলাম, আরিফ আনোয়ার প্রমুখ।
ত্বকী হত্যার বিচারহীনতার ১৩ বছরের প্রতিবাদে চিত্রাঙ্কন করেন তাঁর বাবা রফিউর রাব্বি, ফিরোজ আহমেদ, কামরুজ্জামান রোমান, জাহিদ মোস্তফা, মাসুদুল হক, অশোক কর্মকার প্রমুখ।
‘রক্তজবা’ নামের একটি পথনাটক পরিবেশন করে বটতলা। এ ছাড়া ত্বকী হত্যার বিচারের দাবিতে পরিবেশনা করেন প্রাচ্যনাট নাট্যদল ও শিল্পী অমল আকাশ।
এ আয়োজনে অংশ নেওয়ায় ধন্যবাদ জানান সন্ত্রাস নির্মূল ত্বকী মঞ্চের সদস্যসচিব কবি হালিম আজাদ। সঞ্চালনায় ছিলেন সমগীত সংস্কৃতি প্রাঙ্গণের সভাপ্রধান রেবেকা নীলা। অন্যদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন ত্বকীর ছোট ভাই রাকিব মুহাম্মদ সাকি।