হাইকোর্ট ভবন
হাইকোর্ট ভবন

সাইবার সুরক্ষা আইন

খুলনার এক মামলায় সাতজনকে খালাসের আদেশ কেন অসাংবিধানিক নয়: হাইকোর্ট

রহিত হওয়া ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের একটি মামলা প্রত্যাহারের আবেদন মঞ্জুর করে সাতজনকে খালাস দেওয়া সংক্রান্ত খুলনার সাইবার ট্রাইব্যুনালের আদেশ কেন অসাংবিধানিক ও আইনগত কর্তৃত্ববহির্ভূত ঘোষণা করা হবে না, সে বিষয়ে রুল দিয়েছেন হাইকোর্ট।

এক রিট আবেদনের প্রাথমিক শুনানি নিয়ে বিচারপতি রাজিক–আল–জলিল ও বিচারপতি দেবাশীষ রায় চৌধুরীর সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ গতকাল মঙ্গলবার এ রুল দেন।

সাইবার সুরক্ষা অধ্যাদেশ তথা সাইবার সুরক্ষা আইনের একাধিক ধারা [৫০(৪), ৫০(৫) এবং ৫১ (২) ধারা] এবং ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের একটি মামলায় সাতজনকে খালাস দিয়ে খুলনার সাইবার ট্রাইব্যুনালের দেওয়া আদেশের বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে রিটটি করা হয়। রিটটি করেন মোহা. মাহাবুবুর রহমান ওরফে মাহাবুব চান্দু, যিনি বাদী হয়ে ২০১৮ সালের ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে সাতজনের বিরুদ্ধে মামলা করেছিলেন। রিট আবেদনকারী মেহেরপুর জেলা প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদক এবং ‘মেহেরপুর প্রতিদিন’ পত্রিকার ব্যবস্থাপনা সম্পাদক বলে রিটে উল্লেখ করা হয়েছে।

যে প্রেক্ষাপটে রিট ও ট্রাইব্যুনালের আদেশ

রিট থেকে জানা যায়, ২০১৮ সালের ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের কয়েকটি ধারায় [২৩/২৫(১)(ক)/২৫(১)(গ)/২৫(২)/২৯/৩১/৩৫] সাতজনের বিরুদ্ধে খুলনার সাইবার ট্রাইব্যুনালে ২০২৩ সালের ২৯ আগস্ট মামলা করেন মাহাবুবুর রহমান। ওই আইনের ২৫(২)/২৯(১) ধারার অধীনে আসামিদের বিরুদ্ধে ২০২৪ সালের ১৪ জানুয়ারি তদন্ত প্রতিবেদন দেন তদন্ত কর্মকর্তা।

ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন রহিত করে ২০২৩ সালের ১৮ সেপ্টেম্বর সাইবার নিরাপত্তা আইন প্রণয়ন করা হয় উল্লেখ করে রিটে বলা হয়, সাইবার নিরাপত্তা আইনের ৫৯(২) ধারা অনুযায়ী, ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের অধীনে অনিষ্পন্ন মামলাগুলো এমনভাবে পরিচালিত হবে, যেন ওই আইনটি (ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন) রহিত করা হয়নি। ২০২৪ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারি খুলনার সাইবার ট্রাইব্যুনাল সাতজনের বিরুদ্ধে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে অভিযোগ আমলে নেন।

রিট আবেদনকারীপক্ষ জানায়, বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে সাইবার নিরাপত্তা আইন রহিত করে ২০২৫ সালের ২১ মে সাইবার সুরক্ষা অধ্যাদেশ প্রণয়ন করা হয়। সাইবার সুরক্ষা অধ্যাদেশের ৫০(৪) ধারার ভাষ্য, রহিতকরণের আগে ওই আইনের কয়েকটি ধারা [২১, ২৪, ২৫, ২৬, ২৭, ২৮, ২৯, ৩১, ৩৪] এবং ওই ধারাগুলোতে বর্ণিত অপরাধ সংঘটনে সহায়তার অপরাধে কোনো আদালত বা ট্রাইব্যুনালে নিষ্পন্নাধীন কোনো মামলা বা অন্যান্য কার্যধারা অথবা কোনো পুলিশ কর্মকর্তা বা অন্য কোনো কর্তৃপক্ষের কাছে তদন্তাধীন মামলা বা কার্যক্রম বাতিল হবে। এসব বিষয়ে আর কোনো কার্যক্রম গ্রহণ করা যাবে না। ওই ধারাগুলোর অধীন কোনো আদালত বা ট্রাইব্যুনালের দেওয়া দণ্ড ও জরিমানা বাতিল বলে গণ্য হবে।

২০২৫ সালের ২২ অক্টোবর অধ্যাদেশে সংশোধনী আনা হয়। তাতে ৫০(৪) উপধারার পর সন্নিবেশিত হয় উপধারা (৪ক)। এই উপধারার ভাষ্য, ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের কয়েকটি ধারায় [২১, ২৪, ২৫, ২৬, ২৭, ২৮, ২৯, ৩১] বর্ণিত অপরাধ সংঘটন ও সহায়তার অপরাধে কোনো আদালত বা ট্রাইব্যুনালে নিষ্পন্নাধীন কোনো মামলা বা অন্যান্য কার্যধারা অথবা কোনো পুলিশ কর্মকর্তা বা অন্য কোনো কর্তৃপক্ষের কাছে তদন্তাধীন মামলা বা কার্যক্রম বাতিল হবে। এসব বিষয়ে আর কোনো কার্যক্রম গ্রহণ করা যাবে না। ওই ধারাগুলোর অধীন কোনো আদালত বা ট্রাইব্যুনালের দেওয়া দণ্ড ও জরিমানা বাতিল বলে গণ্য হবে।

রিট আবেদন থেকে জানা যায়, সাইবার সুরক্ষা অধ্যাদেশ প্রণয়নের পর রাষ্ট্রপক্ষ ফৌজদারি কার্যবিধির ৪৯৪ক ধারায় ওই মামলাটি (ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে মাহাবুবুর রহমানের দায়ের করা) প্রত্যাহারের আবেদন করে। এই আবেদন মঞ্জুর করে ২০২৫ সালের ১৯ জুন আদেশ দেন খুলনার সাইবার ট্রাইব্যুনালের বিচারক।

আদেশের ভাষ্য, অধ্যাদেশের ৫০(৪) ধারা অনুযায়ী সাইবার নিরাপত্তা আইনের ২৫ ধারায় নিষ্পন্ন–অনিষ্পন্ন সব মামলার কার্যক্রম বাতিল করা হয়। এ অবস্থায় আসামিদের বিরুদ্ধে ২০১৮ সালের ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের ২৫ ধারা, যা পরবর্তী সময়ে সাইবার নিরাপত্তা আইনের ২৫ ধারায়ও উল্লেখ করা হয়। ওই অপরাধে গৃহীত কার্যক্রম ২০২৫ সালের আদেশ অনুযায়ী বাতিলযোগ্য। আসামিদের খালাস দেওয়া হলো।

সাইবার সুরক্ষা আইনের সংশ্লিষ্ট ধারা

২০২৫ সালের সাইবার সুরক্ষা অধ্যাদেশের ৫০(৪) ধারা এবং খুলনার সাইবার ট্রাইব্যুনালের ২০২৫ সালের ১৯ জুন দেওয়া আদেশের বৈধতা নিয়ে গত মার্চে রিটটি করেন মাহাবুবুর রহমান। এদিকে সাইবার সুরক্ষা অধ্যাদেশ রহিত করে বর্তমান সরকারের আমলে গত ১০ এপ্রিল সাইবার সুরক্ষা আইনের গেজেট প্রকাশিত হয়। সাইবার সুরক্ষা অধ্যাদেশ রহিত হওয়ায় সাইবার সুরক্ষা আইনের ৫০(৪), ৫০(৫) এবং ৫১ (২) ধারার বৈধতা নিয়ে সম্পূরক আবেদন দাখিল করেন রিট আবেদনকারী। রিট আবেদনটি নিয়ে গতকাল আদালতে শুনানি হয়।

আদালতে রিট আবেদনকারীর পক্ষে শুনানি করেন আইনজীবী মো. নাজমুল হুদা। রাষ্ট্রপক্ষে ছিলেন ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল জামিলা মমতাজ ও শিহাব উদ্দিন খান।

সাইবার সুরক্ষা অধ্যাদেশ ও সাইবার সুরক্ষা আইনে উল্লেখিত চলমান মামলার কার্যক্রম বাতিল করা সম্পর্কিত বিধানগুলো একই ধরনের বলে জানান আইনজীবী মো. নাজমুল হুদা। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ‘রহিত হওয়া ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন–২০১৮ অধীন সাতজনের বিরুদ্ধে মামলা করেন রিট আবেদনকারী। ২০১৮ সালের ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন রহিত করে সাইবার নিরাপত্তা আইন করা হয়। ২০২৩ সালের সাইবার নিরাপত্তা আইনটি রহিত করে ২০২৫ সালের ২১ মে সাইবার সুরক্ষা অধ্যাদেশ প্রণয়ন করা হয়। এই অধ্যাদেশে সাইবার নিরাপত্তা আইন–২০২৩–এর কিছু কিছু ধারা বাতিল ও কিছু কিছু ধারার মামলা চলমান থাকবে বলা হয়। সাইবার সুরক্ষা অধ্যাদেশে ২০১৮ সালের ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের মামলাগুলোর বিষয়ে বলা হয়নি।’

২০২৫ সালের ২২ অক্টোবর সাইবার সুরক্ষা অধ্যাদেশে সংশোধনী এনে ২০১৮ সালের ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের চলমান মামলা বাতিলের বিধান যুক্ত করা হয় উল্লেখ করে আইনজীবী নাজমুল হুদা বলেন, অথচ এর আগেই রিট আবেদনকারীর দায়ের করা ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের মামলা প্রত্যাহারের আবেদন ২০২৫ সালের ১৯ জুন মঞ্জুর করে সাতজনকে খালাস দেওয়া হয়। অধ্যাদেশে উল্লেখ নেই, অথচ এর বরাতে চলমান মামলাটি প্রত্যাহারের আদেশ আইনসম্মত নয়। যে কারণে অধ্যাদেশ ও আইনের সংশ্লিষ্ট ধারা এবং মামলা প্রত্যাহার—সাতজনকে খালাসসংক্রান্ত খুলনার সাইবার ট্রাইব্যুনালের ২০২৫ সালের ১৯ জুন দেওয়া আদেশের বৈধতা নিয়ে রিটটি করা হলে আদালত ওই রুল দেন। একই সঙ্গে সাইবার সুরক্ষা অধ্যাদেশ তথা সাইবার সুরক্ষা আইনের ৫০(৪), ৫০(৫) এবং ৫১ (২) ধারা প্রশ্নেও রুল দেওয়া হয়েছে।