
দেশে প্রথমবারের মতো ‘ইমোশনাল ডোনার’ বা আবেগের জায়গা থেকে স্বেচ্ছায় দানের মাধ্যমে সফলভাবে কিডনি প্রতিস্থাপন সম্পন্ন হয়েছে। গত ৩১ আগস্ট বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে (বিএমইউ) এই কিডনি প্রতিস্থাপন করা হয়। এর মধ্য দিয়ে দেশে কিডনি প্রতিস্থাপনের ক্ষেত্রে নতুন একটি সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচিত হয়েছে।
আজ শনিবার সকালে বিএমইউতে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এ তথ্য জানানো হয় বলে এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়।
বিএমইউর বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, দীর্ঘমেয়াদি কিডনি জটিলতায় আক্রান্ত বাগেরহাটের একজন রোগী গত ১০ আগস্ট বিএমইউতে ভর্তি হন। প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা, যাচাই-বাছাই ও আইনগত প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার পর ৩১ আগস্ট তাঁর কিডনি প্রতিস্থাপন করা হয়। গাইবান্ধা থেকে আসা একজন ‘ইমোশনাল ডোনার’ ওই রোগীকে কিডনি দান করেন। কিডনি প্রতিস্থাপন করা রোগীকে আজ হাসপাতাল থেকে ছাড়পত্র দেওয়া হয়।
এই ছাড়পত্র দেওয়া উপলক্ষে বিশেষ অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। অনুষ্ঠানে রোগী তাঁর অনুভূতি ব্যক্ত করার সময় এক আবেগঘন পরিবেশের সৃষ্টি হয়।
সংবাদ সম্মেলনে বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক এফ এম সিদ্দিকী বলেন, বাংলাদেশে প্রথমবারের মতো ইমোশনাল ডোনারের মাধ্যমে কিডনি প্রতিস্থাপন সফলভাবে সম্পন্ন করেছে বিএমইউ। এর মাধ্যমে কিডনি প্রতিস্থাপনের ক্ষেত্রে নতুন সুযোগ তৈরি হয়েছে। নিকট আত্মীয়ের পাশাপাশি আইনগত প্রক্রিয়া ও নির্ধারিত শর্ত পূরণ সাপেক্ষে আবেগগতভাবে সম্পৃক্ত অন্য কোনো ব্যক্তিও স্বেচ্ছায় কিডনি দান করতে পারবেন।
অধ্যাপক এফ এম সিদ্দিকী বলেন, ইমোশনাল ডোনার যাচাই-বাছাইয়ের জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ ও সংস্থাগুলো কাজ করছে। সম্ভাব্য কিডনিদাতার আইনগত বিষয়গুলো যাচাই করার পরই প্রতিস্থাপনের প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হয়। পাশাপাশি হাসপাতালের একটি বিশেষজ্ঞ টিম দাতার মেডিকেল পরীক্ষা-নিরীক্ষাসহ বিভিন্ন বিষয় মূল্যায়ন করে। রোগীর সঙ্গে দাতার সম্পর্ক, দানের স্বেচ্ছাসম্মতি এবং পুরো প্রক্রিয়াটি যথাযথ কি না, তা–ও যাচাই করা হয়।
কিডনি দানের ক্ষেত্রে কোনো ধরনের অর্থ লেনদেনের সুযোগ নেই বলে কঠোরভাবে সতর্ক করেন করেন উপাচার্য। তিনি বলেন, অর্থের বিনিময়ে কিডনি দান বা গ্রহণের কোনো সুযোগ নেই। কিডনি দান হতে হবে সম্পূর্ণ স্বেচ্ছায় এবং প্রচলিত আইন ও নির্ধারিত শর্ত মেনে।
বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে ইতিমধ্যে লিভার ট্রান্সপ্ল্যান্ট কার্যক্রমও চলমান রয়েছে। ধীরে ধীরে অঙ্গ প্রতিস্থাপনের ক্ষেত্রে বিএমইউ আরও সক্ষমতা অর্জন করছে বলে উল্লেখ করেন উপাচার্য।
রোগীদের দেশের বাইরে যাওয়ার প্রয়োজনীয়তা কমবে
সংবাদ সম্মেলনে এক সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে কিডনি প্রতিস্থাপন দলের সদস্য ও বিএমইউর ইউরোলজি বিভাগের অধ্যাপক মো. রফিকূল ইসলাম বলেন, দেশের প্রথম ইমোশনাল ডোনার কিডনি প্রতিস্থাপন দেশের চিকিৎসাব্যবস্থার জন্য একটি মাইলফলক হয়ে থাকবে। দেশেই এ ধরনের জটিল ও আধুনিক চিকিৎসা সম্ভব হওয়ায় ভবিষ্যতে রোগীদের চিকিৎসার জন্য দেশের বাইরে যাওয়ার প্রয়োজনীয়তা কমবে। এতে রোগীদের ভোগান্তির পাশাপাশি চিকিৎসার পেছনে বিপুল অর্থ ব্যয়ের চাপও কমানো সম্ভব হবে।
এই সফলতা শুধু একটি রোগীর চিকিৎসায় সাফল্য নয়; বরং বাংলাদেশের অঙ্গ প্রতিস্থাপন চিকিৎসার সক্ষমতা ও ভবিষ্যৎ সম্ভাবনারও একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ বলেও উল্লেখ করেন অধ্যাপক রফিকূল ইসলাম।
অনুষ্ঠানে আরও উপস্থিত ছিলেন বিএমইউর সহ–উপাচার্য (শিক্ষা) অধ্যাপক মো. নজরুল ইসলাম, সহ–উপাচার্য (গবেষণা) অধ্যাপক মুজিবুর রহমান হাওলাদার, ইউরোলজি বিভাগের প্রধান অধ্যাপক সাইফুল ইসলাম, নেফ্রোলজি বিভাগের প্রধান অধ্যাপক এ এইচ হামিদ আহমেদ, গ্রহীতা টিমের সার্জন অধ্যাপক এ কে এম খুরশিদুল আলম, ডোনার টিমের সার্জন অধ্যাপক শফিকুর রহমানসহ ট্রান্সপ্ল্যান্ট টিমের সদস্যরা ও বিভিন্ন পর্যায়ের চিকিৎসক এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।