উগ্রবাদীদের হামলার শিকার প্রথম আলো ভবনে আয়োজিত শিল্প প্রদর্শনী দর্শকদের মধ্যে সাড়া জাগিয়েছে। গতকাল শুক্রবার ছুটির দিনে আগের দিনের চেয়ে অনেক বেশি দর্শক এসেছিলেন প্রদর্শনীতে। তাঁরা গণমাধ্যমে হামলা ও অগ্নিসংযোগের নিন্দায় সরব হয়েছেন। হামলাকারীদের বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়ারও আহ্বান জানিয়েছেন তাঁরা।
শিল্পী মাহ্বুবুর রহমান ‘আলো’ নামের এই শিল্প প্রদর্শনী করেছেন। এটি শুরু হয়েছে ১৮ ফেব্রুয়ারি। প্রতিদিন বেলা ১১টা থেকে ১টা ও বেলা ৩টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত সবার জন্য খোলা থাকবে এ প্রদর্শনী। চলবে ২৮ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত।
সকালে প্রদর্শনী দেখতে এসেছিলেন বিশিষ্ট সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব রামেন্দু মজুমদার। প্রদর্শনী ঘুরে দেখে তিনি বলেন, ‘আমাদের বাইরে থেকে ধারণা ছিল না যে ভেতরে ধ্বংস এত ভয়াবহ। এটা দেখে একদিকে যেমন বিস্মিত হয়েছি, আবার অন্যদিকে অনুপ্রাণিত হয়েছি যে এই ধ্বংস থেকে আবার যে জেগে ওঠা, ধ্বংস থেকে সৃষ্টি—এই প্রদর্শনী এই পথ দেখাচ্ছে।’
গতকাল শুক্রবার ছুটির দিনে আগের দিনের চেয়ে অনেক বেশি দর্শক এসেছিলেন প্রদর্শনীতে। তাঁরা গণমাধ্যমে হামলা ও অগ্নিসংযোগের নিন্দায় সরব হয়েছেন। হামলাকারীদের বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়ারও আহ্বান জানিয়েছেন তাঁরা।
রামেন্দু মজুমদার বলেন, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা আটকাতে যতই চেষ্টা করা হোক, শেষ পর্যন্ত দমিয়ে রাখা যায় না। সত্য প্রকাশিত হবেই। প্রথম আলো এটাও প্রমাণ করেছে যে সভ্যতাকে কখনো আগুন দিয়ে পুড়িয়ে দেওয়া যায় না। সভ্যতা আপন শক্তিতে জেগে উঠবে।
বিশিষ্ট শিল্পী শহীদ কবির প্রদর্শনী দেখে ভূয়সী প্রশংসা করলেন। শিল্পী মাহ্বুবুর রহমানের কাজ সম্পর্কে তিনি বলেন, এটি একটি বিশ্বমানের প্রদর্শনী। তিনি বলেন, বাঙালি জাতির যে কৃষ্টি, যে সংস্কৃতি, এটা কোনোভাবে কোনো অপশক্তি ধ্বংস করতে পারবে না।
সাবেক সচিব আবু আলম শহীদ খান বিকেলে প্রদর্শনী দেখতে এসে বললেন, ‘এমন বর্বরতা মানুষ করতে পারে, ভাবা যায় না। প্রদর্শনীটি দেখে মনে হচ্ছে ইতিহাসের সাক্ষী হয়ে গেলাম। বেছে বেছে কিছু গণমাধ্যম ও প্রগতিশীল সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানে যেসব হামলা চালানো হয়েছে, তাতে এটা অত্যন্ত পরিষ্কার যে এগুলো কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। অত্যন্ত সুপরিকল্পিতভাবে, বিশেষ উদ্দেশ্য নিয়ে এসব হামলা চালানো হয়েছে। তবে এ কথাটি সত্য যে গণমানুষের মতকে মব দিয়ে ঠেকানো যায় না।’
বিশিষ্ট শিল্পী শহীদ কবির প্রদর্শনী দেখে ভূয়সী প্রশংসা করলেন। শিল্পী মাহ্বুবুর রহমানের কাজ সম্পর্কে তিনি বলেন, এটি একটি বিশ্বমানের প্রদর্শনী। তিনি বলেন, বাঙালি জাতির যে কৃষ্টি, যে সংস্কৃতি, এটা কোনোভাবে কোনো অপশক্তি ধ্বংস করতে পারবে না।
একাত্তর টিভির প্ল্যানিং এডিটর মিলটন আনোয়ার বলেন, প্রদর্শনীতে অনেকগুলো বিষয় উঠে এসেছে। গণমাধ্যমের স্বাধীনতা ও নিরাপত্তার জন্য এখন মতপার্থক্য দূরে সরিয়ে রেখে গণমাধ্যমকর্মীদের মধ্যে দৃঢ় ঐক্য গড়ে তোলার কোনো বিকল্প নেই।
জাতিসংঘ মিশনের অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তা জয়ন্ত অধিকারী এসেছিলেন সস্ত্রীক। তিনি বললেন, ‘এই প্রদর্শনী হওয়া খুবই দরকার ছিল। প্রথম আলোর মতো গণমাধ্যমে যে এমন হামলা হলো, এটা অভাবনীয়। আমরা সেই ষাট দশক থেকে দেশে বহু হামলা, নাশকতা দেখে আসছি। এসব বন্ধ হওয়া একান্ত দরকার। নতুন প্রজন্মের জন্য একটি শান্তি ও স্থিতিশীলতাপূর্ণ দেশ ও সমাজ প্রয়োজন।’
টঙ্গীর জামিয়া রহমানিয়া সওতুল হেরা মাদ্রাসার শিক্ষক মুফতি মো. ইউসুফ হোসেন কারওয়ান বাজারে এসেছিলেন বিশেষ কাজে। বিকেলে ফেরার আগে প্রদর্শনী দেখে তিনি বিস্ময় প্রকাশ করেন। তিনি জানালেন, প্রথম আলো ভবনে হামলার খবর কিছু কিছু শুনেছিলেন কিন্তু ভবনের ভেতরে গিয়ে বিধ্বস্ত অবস্থা দেখে তিনি অবাক হয়েছেন। সবাইকে সহনশীল হতে হবে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির সাবেক সাধারণ সম্পাদক রুহিন হোসেন প্রিন্স এসেছিলেন সিপিবির বেশ কিছু নেতা-কর্মীসহ। প্রদর্শনী দেখে তিনি মন্তব্য করলেন, ধ্বংসযজ্ঞ দেখার পর প্রথমেই মনে হয়েছে এই উগ্র হামলাকারীদের প্রতিরোধ করার কোনো বিকল্প নেই। গত বছরের ১৮ ডিসেম্বর রাতে প্রথম আলো, ডেইলি স্টার, ছায়ানট এবং পরদিন উদীচী কার্যালয়ে যেভাবে একের পর এক হামলা হয়েছে, তাতে বোঝাই যায় তৎকালীন সরকারের প্রশ্রয় ছাড়া এমন তাণ্ডব চালানো সম্ভব ছিল না। জুলাই বিপ্লবের নাম করে একটি মহল সুনির্দিষ্টভাবে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা, অসাম্প্রদায়িক আদর্শ ও মুক্তবুদ্ধির চর্চার প্রতিষ্ঠানগুলোকে লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করেছিল। এই প্রদর্শনী অপশক্তির বিরুদ্ধে প্রতিবাদ-প্রতিরোধের শক্তিকে জাগিয়ে তুলবে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের অধ্যাপক তারিক মনজুর প্রদর্শনী দেখতে এসে বলেন, ‘প্রথম আলোয় আগুন দেওয়া, এর ওপর হামলা, এটা আক্রোশের ভাষা, হিংসার ভাষা।এটা দেখার জন্য একাত্তরে দেশ স্বাধীন করিনি, চব্বিশের আন্দোলনে নামিনি। আক্রোশ আর হিংসার জবাবে আক্রান্ত ও অগ্নিদগ্ধ ভবন নিয়ে প্রথম আলো যে প্রদর্শনী করেছে, সেটা শিল্পের ভাষা। শিল্পের ভাষাই পারে মুক্তবোধ আর মুক্তবুদ্ধির প্রসার ঘটাতে।’
প্রথম আলো, ডেইলি স্টার ও ছায়ানটে হামলা-ভাঙচুরের সময় উগ্রবাদীদের কেন থামানো গেল না, এমন প্রশ্ন তুলে শিল্পী ঋতু সাত্তার বলেন, খবরের কাগজ তার পাঠকের সঙ্গে একটি সম্পর্ক তৈরি করে, সেটি কখনো কখনো পাঠকের মতের সঙ্গে না-ও মিলতে পারে। তাই বলে ভেঙে দেওয়া বা পুড়িয়ে দেওয়া কোনো সমাধান হতে পারে না।
প্রদর্শনীতে সারা দিন আরও এসেছিলেন বিশিষ্ট ব্যবসায়ী তাহজীব আলম সিদ্দিকী, আলোকচিত্রী মনির মহিউদ্দিন। বেসরকারি চাকরিজীবী রবিউল ইসলাম, ব্যবসায়ী সাখাওয়াত হোসেন এবং শেখ হুমায়রা বিনতে হাকিমসহ ইউল্যাবের একদল শিক্ষার্থী।