
তৃতীয়বারের মতো এনইআইআর চালুর উদ্যোগ নিয়েছে বিটিআরসি। তবে অবৈধ ফোন বন্ধের আগে বৈধ ফোনের দাম কমানোকে গুরুত্ব দিচ্ছে সরকার।
অবৈধ মুঠোফোন সেট বন্ধে তৃতীয়বারের মতো ন্যাশনাল ইকুইপমেন্ট আইডেন্টিটি রেজিস্টার (এনইআইআর) চালুর উদ্যোগ নিতে যাচ্ছে নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিটিআরসি। আগামী বছরের ১ জানুয়ারি থেকে দুই ধাপে এই ব্যবস্থা চালুর পরিকল্পনা রয়েছে। তবে সরকারের সূত্রগুলো বলছে, বাজারে বৈধ মুঠোফোন সেটের দাম না কমিয়ে এই ব্যবস্থা পুরোপুরি চালু করতে চায় না সরকার।
এনইআইআর হলো সরকারের একটি কেন্দ্রীয় তথ্যভান্ডার। এর মাধ্যমে টেলিযোগাযোগ নেটওয়ার্কগুলো মুঠোফোনের আইএমইআই (শনাক্তকরণ নম্বর) যাচাই করে অবৈধ বা চুরি যাওয়া ফোন বন্ধ করতে পারে।
বিটিআরসি কর্মকর্তারা বলছেন, দুই ধাপে তারা এনইআইআর বাস্তবায়ন করতে চান। প্রথম ধাপে বৈধভাবে উৎপাদিত ও আমদানি করা মুঠোফোন সেট শনাক্ত করতে চায় তারা। এই ধাপে সেটের নিবন্ধন বাতিলের ব্যবস্থা (ডি-রেজিস্ট্রেশন) থাকবে না। পরে দ্বিতীয় ধাপে ডি-রেজিস্ট্রেশন ব্যবস্থা চালু করার পরিকল্পনা রয়েছে।
দেশে ‘অফিশিয়াল’ ও ‘আনঅফিশিয়াল’—এই দুই ধরনের মুঠোফোন সেট বিক্রি হয়। তুলনামূলক কম দামের কারণে অনানুষ্ঠানিকভাবে দেশে আসা ফোনসেটের প্রতি ক্রেতাদের আগ্রহ বেশি। তবে এতে বছর বছর রাজস্ব হারায় সরকার। এই প্রবণতা কমাতে ২০২১ সালের ১ জুলাই পরীক্ষামূলকভাবে প্রথম এনইআইআর চালু করে বিটিআরসি। তবে পরে অবৈধভাবে আমদানি করা ফোন স্বয়ংক্রিয়ভাবে বন্ধ করা এবং ক্লোন হ্যান্ডসেট শনাক্ত করে ব্যবহারে বাধা দেওয়ার ফিচার বাদ রাখা হয়।
পরে অবৈধ ফোনসেটের কারণে বছরে দুই হাজার কোটি টাকার রাজস্ব ক্ষতি হচ্ছে উল্লেখ করে ২০২৪ সালের ২৯ অক্টোবর এনইআইআর পুরোপুরি চালুর উদ্যোগ নিতে বিটিআরসিকে চিঠি দেয় জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। ২০২৫ সালের ২৮ জুন ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগ এ বিষয়ে অনুমোদন দেয়। একই বছরের ১ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত এক সভায়ও ব্যবস্থা পুরোপুরি চালুর সিদ্ধান্ত হয়।
দেশে ‘অফিশিয়াল’ ও ‘আনঅফিশিয়াল’—এই দুই ধরনের মুঠোফোন সেট বিক্রি হয়। তুলনামূলক কম দামের কারণে অনানুষ্ঠানিকভাবে দেশে আসা ফোনসেটের প্রতি ক্রেতাদের আগ্রহ বেশি। তবে এতে বছর বছর রাজস্ব হারায় সরকার।
বিটিআরসি ২০২৬ সালের ১ জানুয়ারি সব ফিচারসহ এনইআইআর চালুর প্রস্তুতি নিয়েছিল। তবে ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে অনানুষ্ঠানিকভাবে মুঠোফোন বিক্রেতাদের বিক্ষোভের পর জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে অবৈধ ফোন স্বয়ংক্রিয়ভাবে বন্ধ করার ফিচার ছাড়াই ব্যবস্থা চালু রাখা হয়।
বিটিআরসির নথিপত্র বলছে, চলতি বছরের ৯ জুন অর্থনীতি ও জননিরাপত্তার বিষয় উল্লেখ করে এনইআইআর পুরোপুরি চালুর বিষয়ে বিটিআরসিকে চিঠি দেয় জাতীয় নিরাপত্তা গোয়েন্দা সংস্থা (এনএসআই)। এরপর ২ জুলাই স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক সভায় এবং ২২ সেপ্টেম্বর স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সভায় ব্যবস্থা চালুর বিষয়ে আলোচনা হয়। সর্বশেষ সভায় ২০২৭ সালের ১ জানুয়ারির মধ্যে এনইআইআর চালুর প্রস্তাব করা হয়। সেই হিসেবে এনইআইআর চালুর তৃতীয়বারের চেষ্টা হবে এটি।
বিটিআরসি কর্মকর্তারা বলছেন, দুই ধাপে তারা এনইআইআর বাস্তবায়ন করতে চান। প্রথম ধাপে বৈধভাবে উৎপাদিত ও আমদানি করা মুঠোফোন সেট শনাক্ত করতে চায় তারা। এই ধাপে সেটের নিবন্ধন বাতিলের ব্যবস্থা (ডি-রেজিস্ট্রেশন) থাকবে না। পরে দ্বিতীয় ধাপে ডি-রেজিস্ট্রেশন ব্যবস্থা চালু করার পরিকল্পনা রয়েছে। এ ক্ষেত্রে প্রকৃত বা সর্বশেষ মালিকের মাধ্যমে হ্যান্ডসেটের ব্যবহার নিশ্চিত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং এনবিআরের সঙ্গে আলোচনার বিষয় রয়েছে। সরকার সব পক্ষের সঙ্গে আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নিতে চায়। এ ছাড়া অবৈধ মুঠোফোন বন্ধের আগে বৈধ ফোনের দাম কমানোর বিষয়টি সরকারের বিবেচনায় রয়েছে।
তাড়াহুড়া চায় না সরকার
বিটিআরসি সূত্র বলছে, ১ জানুয়ারি থেকে এনইআইআর চালুর বিষয়ে সরকারের অনুমোদন নিতে ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগে চিঠি পাঠানোর সিদ্ধান্ত হয়েছে।
তবে ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগের একটি সূত্র প্রথম আলোকে জানিয়েছে, এনইআইআর চালু নিয়ে সরকার তাড়াহুড়া করতে চায় না। এই কার্যক্রমের সঙ্গে বিপুলসংখ্যক ব্যবসায়ী যুক্ত রয়েছেন। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং এনবিআরের সঙ্গে আলোচনার বিষয় রয়েছে। সরকার সব পক্ষের সঙ্গে আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নিতে চায়। এ ছাড়া অবৈধ মুঠোফোন বন্ধের আগে বৈধ ফোনের দাম কমানোর বিষয়টি সরকারের বিবেচনায় রয়েছে।
বিষয়টি নিয়ে জানতে চাইলে ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তিমন্ত্রী ফকির মাহবুব আনাম প্রথম আলোকে বলেন, রাজস্ব আয় বাড়াতে অবৈধ ফোন বন্ধ করা প্রয়োজন। তবে বন্ধ করার আগে ক্রেতাদের ওপর এর প্রভাব কতটা পড়বে তা বিবেচনায় নিতে হবে। কম দামে বৈধ সেট সরবরাহ নিশ্চিত করা গেলে এই বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়াটা অনেক সহজ হবে। সরকার সেই লক্ষ্যে হ্যান্ডসেট উৎপাদনকারীদের সঙ্গে আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে।
অনেক দেশ বিভিন্ন ধরনের শুল্ক কমিয়ে মুঠোফোনের দাম হাতের নাগালে রাখার উদ্যোগ নিয়েছে। ক্যামেরা, ডিসপ্লে প্যানেল, ব্যাটারিসহ ইত্যাদি বিভিন্ন খুচরা যন্ত্রাংশের আমদানি শুল্ক কমাতে পারলে দেশীয় বাজারে তৈরি হওয়া সেটের দাম বাজেটের মধ্যে থাকতে পারে।ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তথ্যপ্রযুক্তি ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক বি এম মইনুল হোসেন
বৈধ সেটের দাম আরও বাড়বে
এক দশকে দেশে মুঠোফোন সংযোজন ও উৎপাদনশিল্প গড়ে উঠেছে। স্থানীয় কারখানাগুলো মূলত নিম্ন ও মধ্যম দামের ফোন সংযোজন করে থাকে। তবে খাতসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, অ্যাপল, গুগল, হুয়াওয়ে, মটোরোলা, স্যামসাং ও শাওমির অনেক প্রিমিয়াম মডেল স্থানীয়ভাবে বাণিজ্যিকভাবে উৎপাদন করা সম্ভব নয়। জটিল সরবরাহব্যবস্থা, বিশেষায়িত যন্ত্রাংশ এবং সীমিত বাজার চাহিদা এর অন্যতম কারণ।
চলতি বছরের শুরুতে বৈধভাবে আমদানি করা মুঠোফোনের দাম কমাতে সরকার শুল্ক কমানোর সিদ্ধান্ত নেয়। সরকারের যুক্তি ছিল, বৈধ ও অবৈধ ফোনসেটের দামের ব্যবধান কমে এলে ক্রেতারা বৈধ পথে আমদানি করা সেট কিনতে উৎসাহিত হবেন। তবে বাজারে প্রত্যাশিত প্রভাব দেখা যায়নি।
ব্যবসায়ীদের তথ্য বলছে, চলতি বছরের শুরুতে দেশে যে ব্র্যান্ডের স্মার্টফোনটি ১৩ হাজার টাকায় পাওয়া যেত, সেটি সেপ্টেম্বর নাগাদ দাম বেড়ে প্রায় ১৮ হাজার টাকায় দাঁড়িয়েছে। বছরের শেষ নাগাদ সর্বনিম্ন দামের স্মার্টফোনের দাম ২৫ হাজার টাকা পর্যন্ত যেতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন উৎপাদকেরা।
শুল্ক কমানোর আগেই বিভিন্ন ব্র্যান্ডের মুঠোফোনের দাম ৫০০ থেকে ৫ হাজার টাকা পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছিল। ব্যবসায়ীরা তখন এর কারণ হিসেবে বৈশ্বিক বাজারে মেমোরি চিপের মূল্যবৃদ্ধির কথা উল্লেখ করেছিলেন। সেই থেকে ধারাবাহিকভাবে দেশের বাজারে বৈধ ফোনের দাম বেড়েছে। ব্যবসায়ীদের তথ্য বলছে, চলতি বছরের শুরুতে দেশে যে ব্র্যান্ডের স্মার্টফোনটি ১৩ হাজার টাকায় পাওয়া যেত, সেটি সেপ্টেম্বর নাগাদ দাম বেড়ে প্রায় ১৮ হাজার টাকায় দাঁড়িয়েছে। বছরের শেষ নাগাদ সর্বনিম্ন দামের স্মার্টফোনের দাম ২৫ হাজার টাকা পর্যন্ত যেতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন উৎপাদকেরা।
এক্সেল টেলিকমের (স্যামসাং ব্র্যান্ড) নির্বাহী পরিচালক সাইফুদ্দিন টিপু প্রথম আলোকে বলেন, মেমোরি চিপের বৈশ্বিক সরবরাহ ও দাম নিয়ে সংকট তৈরি হয়েছে। বিশ্বে অল্প কয়েকটি প্রতিষ্ঠান মেমোরি চিপ উৎপাদন করে। ফলে এসব প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকেই চাহিদা অনুযায়ী চিপ সংগ্রহ করতে হচ্ছে। এতে উৎপাদন খরচ বাড়ছে, বাড়ছে সেটের দাম।
তবে গ্রাহককে অফিশিয়াল সেট কিনতে উৎসাহিত করতে হলে দাম কমানোর বিকল্প নেই বলে মনে করছেন টেলিযোগাযোগ বিশেষজ্ঞেরা। তাঁরা বলছেন, মুঠোফোনের দাম কমানো না গেলে এনইআইআর বাস্তবায়নও চ্যালেঞ্জের মুখে পড়বে।
ক্রেতারা কোথায় যাবে
আনঅফিশিয়াল মুঠোফোনের সবচেয়ে বড় সুবিধা সেটি অফিশিয়াল সেটের চেয়ে বেশ খানিকটা কমদামে পাওয়া যায়। গ্রাহকেরা তাই দাম বৃদ্ধির খড়্গ এড়াতে এমন ফোনে ঝুঁকছে। তবে বৈধ মুঠোফোন উৎপাদকদের দাবি, দেশের বাজারে বিক্রি হওয়া আনঅফিশিয়াল ফোনের অন্তত ৭৫ শতাংশই রিফার্বিশড এবং সেকেন্ডহ্যান্ড। একটি বৈধ ফোনসেট কিনে সেটি গ্রাহক যতটা মেয়াদে ব্যবহার করতে পারেন, আনঅফিশিয়াল ফোনে সেই মেয়াদ তাঁরা পাচ্ছেন না। ফলে সল্পমেয়াদে সুবিধা পেতে গিয়ে দীর্ঘমেয়াদে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন।
তবে গ্রাহককে অফিশিয়াল সেট কিনতে উৎসাহিত করতে হলে দাম কমানোর বিকল্প নেই বলে মনে করছেন টেলিযোগাযোগ বিশেষজ্ঞেরা। তাঁরা বলছেন, মুঠোফোনের দাম কমানো না গেলে এনইআইআর বাস্তবায়নও চ্যালেঞ্জের মুখে পড়বে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তথ্যপ্রযুক্তি ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক বি এম মইনুল হোসেন প্রথম আলোকে বলেন, অনেক দেশ বিভিন্ন ধরনের শুল্ক কমিয়ে মুঠোফোনের দাম হাতের নাগালে রাখার উদ্যোগ নিয়েছে। ক্যামেরা, ডিসপ্লে প্যানেল, ব্যাটারিসহ ইত্যাদি বিভিন্ন খুচরা যন্ত্রাংশের আমদানি শুল্ক কমাতে পারলে দেশীয় বাজারে তৈরি হওয়া সেটের দাম বাজেটের মধ্যে থাকতে পারে। দাম নিয়ন্ত্রণ করা না গেলে, আনঅফিশিয়াল চ্যানেলে সেট বিক্রি অনুৎসাহিত করা, এমনকি এনইআইআর বাস্তবায়নও চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ে যেতে পারে।