সড়কে ছয় ভাইয়ের মৃত্যু

মৃণালিনীর জীবনে যেন চিরদিনের আঁধার

সন্তানদের হারিয়ে রোগে-শোকে ভুগছেন মা মৃণালিনী। কষ্টে কাটছে পরিবারটির দিন।

বাড়ির উঠানে ষাটোর্ধ্ব মৃণালিনী শীল। গত মঙ্গলবার বেলা সাড়ে তিনটায় কক্সবাজারের চকরিয়া উপজেলার ডুলাহাজারা ইউনিয়নের মালুমঘাটের হাসিনাপাড়ায়
ছবি: প্রথম আলো

এক দুর্ঘটনা তছনছ করে দিয়েছে মৃণালিনী শীলের (৬২) জীবন। এই বৃদ্ধাকে ধসিয়ে দিয়েছে আজীবনের জন্য। চিরদিনের আঁধার নেমে এসেছে তাঁর মনে। পিকআপের চাপায় একে একে নিভে যায় ছয় সন্তানের জীবনপ্রদীপ। ছেলেদের হারিয়ে এখনো পাগলপ্রায় এই মা। হারানোর এই বেদনা থেকে যাবে তাঁর জীবন সায়াহ্নেও। নিঃস্ব এই নারী এখন জীর্ণ ঘরে যাপন করেন ভীষণ করুণ জীবন।

গত ৮ ফেব্রুয়ারি ভোরে চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়কে পিকআপ চাপায় ঘটনাস্থল ও চিকিৎসাধীন অবস্থায় মৃত্যু হয় মৃণালিনী শীলের ছয় ছেলের। ঘটনাস্থলেই মারা যান অনুপম সুশীল (৪৬), নিরুপম সুশীল (৪০), দীপক সুশীল (৩৫), চম্পক সুশীল (৩০) ও স্মরণ সুশীল (২৯)। আর চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান রক্তিম সুশীল (৩৪)। আহত হয়েছিলেন আরেক ছেলে প্লাবন সুশীল (২২) ও মেয়ে হীরা সুশীল (৪৫)। অক্ষত অবস্থায় বেঁচে যান মুন্নী সুশীল (২৮)। মহাসড়কের চকরিয়া উপজেলার ডুলাহাজারা ইউনিয়নের মালুমঘাটের হাসিনাপাড়া এলাকায় এই ঘটনা ঘটে।

এই ঘটনার ঠিক ৯ দিন আগে স্বামী সুরেশ চন্দ্র সুশীলকে হারিয়েছিলেন মৃণালিনী শীল। আর বাবার শ্রাদ্ধানুষ্ঠানে যোগ দিতে সমবেত হয়েছিলেন ৯ ভাই-বোন। সেখানে একটি মন্দিরে ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান শেষে হেঁটে বাড়িতে আসার সময় একটি পিকআপ চাপা দেয় তাঁদের।

মৃত্যু যন্ত্রণায় যখন তাঁরা ছটফট করছিলেন, তখন চালক গাড়িটি পেছনের দিকে নিয়ে এসে আবার চাপা দিয়ে মৃত্যু নিশ্চিত করেন।

সে বিভীষিকাময় ঘটনার পর সন্তান হারানো মা কেমন আছেন, তা দেখতে গত মঙ্গলবার বিকেলে তাঁর বসতভিটায় যান প্রথম আলোর প্রতিনিধি। বাড়ির উঠানে একটি চেয়ারে বসে আছেন মৃণালিনী শীল। শরীরের বিভিন্ন অংশ ফুলে গেছে। ১৫ দিন ধরে অসুস্থ। ব্যথার যন্ত্রণায় ছটফট করছিলেন।

মায়ের সেবাশুশ্রূষা করার জন্য শ্বশুরবাড়ি থেকে এসেছেন মেয়ে মুন্নী সুশীল। কান্নাজড়িত কণ্ঠে মায়ের শারীরিক ও মানসিক অবস্থার বর্ণনা দিতে গিয়ে তিনি বলেন, ‘মা ঘুমাতে পারেন না। ছেলেদের জন্য সারা রাত কেঁদে বুক ভাসান। কখনো কখনো বিলাপ করতে থাকেন। কখনো নিঃশব্দে কেঁদে চলেন। এর মধ্যে শরীর ভর করেছে নানা অসুখ।’

সন্তানদের কথা উঠতেই আর নীরব থাকতে পারলেন না মৃণালিনী শীল। বলেন, ‘ভগবান আমাকে সবকিছু দিয়েছিল। আবার সবকিছু কেড়ে নিল। শুধু আমাকে বাঁচিয়ে রাখল। এখন তো আর বাঁচার কিছুই নেই। ছোট ছেলে আছে। তাঁকে আঁকড়ে আছি।’

অর্থ কষ্টে আছেন মা

পিকআপ চাপায় নিহত ছয় ছেলের স্ত্রীকে পাঁচ লাখ করে করে দিয়েছে সরকার। হীরা সুশীল, প্লাবন সুশীল ও মৃণালিনী শীলকেও দেওয়া হয় পাঁচ লাখ টাকা করে। আমেরিকা থেকে মানবিক সহায়তা হিসেবে প্রতিজনকে দেড় লাখ টাকা করে দেওয়া হয়।

এ ছাড়া নিহত ছয় ছেলের স্ত্রী, জীবিত প্লাবন এবং ২০১৯ সালে অসুস্থ হয়ে মারা যাওয়া আরেক ছেলে হীরক সুশীলের স্ত্রীকে মুজিব বর্ষের উপহার হিসেবে একটি করে ঘর তৈরি করে দিচ্ছে সরকার। জমির দলিল হস্তান্তর করা হলেও ঘরের নির্মাণকাজ সম্পন্ন হয়নি।

ছয় ছেলের স্ত্রীরা মৃণালিনীর সঙ্গে থাকেন না। তাঁরা তাঁদের সন্তানদের নিয়ে আলাদা আলাদা বাড়িতে থাকেন। তবে মৃণালিনী রয়ে গেছেন স্বামীর ভিটায়। সঙ্গে আছেন ছোট ছেলে প্লাবন। তিনি চট্টগ্রামের নাসিরাবাদ পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটে ইলেকট্রিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের তৃতীয় সেমিস্টারের ছাত্র।

মৃণালিনী বলেন, ‘ছেলের স্ত্রীরা আলাদা আলাদা থাকেন। ছোট সন্তান প্লাবনকে নিয়ে আমি থাকি। এখন তাঁর পড়াশোনা ও আমার চিকিৎসা চালাতে হিমশিম খেতে হচ্ছে। সবাই ভাবছে অনুদান আসছে, পাচ্ছি। এই টাকায় ভালো আছি। আসলে ঘটনা তো সেটি না। অনেক দিন ধরে রোগ-শোকে ভুগছি। টাকার অভাবে চিকিৎসা করাতে পারছি না ঠিকমতো।’

এদিকে দুর্ঘটনায় নিহত ছয় ভাইয়ের স্ত্রী উপজেলা মহিলাবিষয়ক কর্মকর্তার কার্যালয়ের আওতায় তিন মাস মেয়াদি বিউটিফিকেশন (পারলার) কাজের প্রশিক্ষণ নিচ্ছেন।

একসঙ্গে ছয় ভাইয়ের মৃত্যুকে পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড বলছেন বোন মুন্নী সুশীল। একই কথা মা মৃণালিনীরও। পিকআপচালক শহিদুল ইসলাম ওরফে সাইফুল গ্রেপ্তার হয়ে কারাগারে থাকায় স্বস্তি প্রকাশ করলেও তাঁকে যেন সর্বোচ্চ শাস্তি দেওয়া হয়—এমনটি চাওয়া মা মৃণালিনীর।