
জাতীয় নদী রক্ষা কমিশন স্বাধীনভাবে কাজ করুক, সেটা কখনো নৌপরিবহন মন্ত্রণালয় চায়নি। মন্ত্রণালয় সব সময় কমিশনকে তার একটি উইং (শাখা) হিসেবে দেখে এসেছে। তাই নদী রক্ষা করতে হলে নদী কমিশনকে মন্ত্রণালয়ের প্রভাবমুক্ত করতে হবে। কমিশনকে স্বাধীন প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে তুলতে আদালতের যে আদেশ সেটাও লঙ্ঘন করা হয়েছে।
সোমবার রাজধানীর আইডিবি ভবনে জাতিসংঘের উন্নয়ন সংস্থা ইউএনডিপি আয়োজিত ‘বাংলাদেশে পরিবেশগত ন্যায়বিচার: প্রেক্ষিত নদী ও পানি’ শীর্ষক অংশীজনদের সঙ্গে এক মতবিনিময় সভায় এ কথা বলেন পরিবেশ বিশেষজ্ঞ ও নদীকর্মীরা।
আলোচনায় অংশ নিয়ে এনভায়রনমেন্টাল রিসার্চ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট অল্টারনেটিভসের নির্বাহী পরিচালক মনির হোসাইন চৌধুরী বলেন, নদী কমিশন গঠনের উদ্দেশ্য ছিল দেশের নদ–নদী রক্ষা করা। কিন্তু সে কমিশনের হাত–পা বেঁধে মন্ত্রণালয়ের কাছে সঁপে দেওয়া হয়েছে।
পরিবেশ রক্ষাবিষয়ক সংগঠন ধরার (ধরিত্রী রক্ষায় আমরা) সদস্যসচিব শরীফ জামিল বলেন, ‘আদালতের আদেশে নদী রক্ষা কমিশন গঠন করা হয়েছিল। তখন আদালত বলেছিল এ প্রতিষ্ঠানকে স্বাধীনভাবে গড়ে তুলতে হবে। কিন্তু আমরা দেখলাম প্রতিষ্ঠানটি এমনভাবে তৈরি করা হয়েছে যাতে এটি মন্ত্রণালয়ের ওপর নির্ভরশীল থাকে।’
শরীফ জামিল বলেন, ‘আমাদের নদীগুলো ধ্বংস হয়েছে গত তিন দশকে। এর আগে নদী আমাদের দৈনন্দিন জীবনের অংশ ছিল। নদী ধ্বংসে বড় ভূমিকা রেখেছে পানি উন্নয়ন বোর্ড। ১৯৭০–এর দশকে নেদারল্যান্ডসের অভিজ্ঞতার আলোকে পোল্ডার, স্লুইসগেট করে নদীগুলোকে মানুষের জীবন থেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলা হয়েছে।’
শুধু দূষণ বন্ধ করে নদী রক্ষার দায়িত্ব প্রকৃতির ওপর ছেড়ে দেওয়ার আহ্বান জানিয়ে শরীফ জামিল বলেন, নদীর দূষণ বন্ধ করতে পারলে প্রকৃতি নিজে থেকে নদীকে সারিয়ে তুলবে। নদী রক্ষায় আমাদের হাইব্রিড গভর্ন্যান্সে (সমন্বিত সুশাসন) যেতে হবে, যেখানে কমিউনিটি (সমাজ) নদীরক্ষায় কাজ করবে। একই সঙ্গে রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠান ও পলিসি তাদের পাশে থাকবে।
নদীবিষয়ক সংগঠন রিভারাইন পিপলের মহাসচিব শেখ রোকন বলেন, পরিবেশগত সুবিচারের জন্য একটা ট্রাজেক্টরি (গতিপথ) নির্ধারণ করা দরকার। জার্মান দার্শনিক কার্ল মার্ক্সের বিখ্যাত উক্তি উদ্ধৃত করে তিনি বলেন, মার্ক্স বলেছিলেন, ‘পৃথিবীকে যথেষ্ট ব্যাখ্যা করা হয়েছে, এখন প্রয়োজন তাকে পরিবর্তন করা’। শুধু গবেষণা, তথ্য–উপাত্ত নয়, নদীর যে অবস্থা তাতে আমাদের এখন দৃশ্যমান পরিবর্তন দরকার।
বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতির প্রধান নির্বাহী তাসলিমা ইসলাম বলেন, নদী রক্ষায় আদালতের আদেশ অনুসরণ করে না সরকার। আইনও কাজ করে না। কারণ প্রতিষ্ঠান আইনের সমর্থনে কাজ করে না। সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয়হীনতা আছে। তারা তাদের ম্যান্ডেট সম্পর্কে ওয়াকিবহাল না। আমরা আশা হারাচ্ছি না। ভয়ভীতি আছে। এরপরও পরিবেশ রক্ষায় সোচ্চার থাকতে হবে।
দীর্ঘদিন ধরে পরিবেশ আদালতের বিচারক হিসেবে কাজ করছেন সাবেক জ্যেষ্ঠ জেলা ও দায়রা জজ ফউজুল আজিম বলেন, যে হারে পরিবেশের দূষণ হচ্ছে তাতে আর কিছুদিন পুরো বাংলাদেশকে পরিবেশগত সংকটাপন্ন হিসেবে ঘোষণা দিতে হবে। এ অবস্থার পরিবর্তন দরকার।
অনুষ্ঠানে বাংলাদেশে পরিবেশগত সুবিচারের ওপর একটি প্রেজেন্টেশন দেন ইউএনডিপির ন্যাশনাল কনসালট্যান্ট মোহাম্মদ সারওয়ার আলম।