কোথায় যাবেন, কীভাবে যাবেন, খরচ কত হতে পারে—ভ্রমণের আগে গন্তব্য সম্পর্কে এসব প্রশ্নের উত্তর এখন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) সাহায্যেই পাওয়া সম্ভব। পর্যটকের পছন্দ বিশ্লেষণ করে ভ্রমণসূচি তৈরি, হোটেল ও পরিবহন ব্যবস্থাপনা—সব ক্ষেত্রেই ব্যবহার বাড়ছে এআইয়ের। তবে এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশ অনেকটাই পিছিয়ে। খাতসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, এ অবস্থা থেকে শিগগির উত্তরণ ঘটবে, এমন লক্ষণও দেখা যাচ্ছে না।
আন্তর্জাতিক সূচকে পর্যটন খাতের উন্নয়নের সক্ষমতায় বাংলাদেশের অবস্থান দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর পেছনে। পর্যটকের সংখ্যা ও আয় কমার পাশাপাশি ঘাটতি রয়েছে পর্যটনের তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ ও ব্যবস্থাপনাতেও। পর্যটকদের নিয়ে একক তথ্যভান্ডার না থাকায় প্রযুক্তিগত সক্ষমতায়ও পিছিয়ে আছে বাংলাদেশ। যদিও পর্যটক আকর্ষণ করার মতো প্রাকৃতিক, প্রত্নতাত্ত্বিক ও সাংস্কৃতিক সম্পদ রয়েছে বাংলাদেশের।
এ পটভূমিতে আজ ২৭ সেপ্টেম্বর পালিত হচ্ছে বিশ্ব পর্যটন দিবস। দিবসটির প্রতিপাদ্য—‘ডিজিটাল রূপান্তর ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তায় আগামীর পর্যটন’।
পর্যটকের পছন্দ বিশ্লেষণ করে ভ্রমণসূচি তৈরি, হোটেল ও পরিবহন ব্যবস্থাপনা—সব ক্ষেত্রেই ব্যবহার বাড়ছে এআইয়ের। তবে এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশ অনেকটাই পিছিয়ে।
সর্বশেষ ২০২৪ সালে প্রকাশিত ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের (ডব্লিউইএফ) ট্রাভেল অ্যান্ড ট্যুরিজম ডেভেলপমেন্ট ইনডেক্স (টিটিডিআই) অনুযায়ী, ১১৯টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ১০৯তম। এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের ১৯টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান সবার শেষে। মোট ৭ পয়েন্টের মধ্যে বাংলাদেশের স্কোর ৩ দশমিক ১৯, যা দক্ষিণ এশিয়ার পাঁচ দেশের চেয়ে কম। বাংলাদেশের ওপরে রয়েছে নেপাল (১০৫), পাকিস্তান (১০১), শ্রীলঙ্কা (৭৬) ও ভারত (৩৯)।
টিটিডিআই সূচকে ব্যবসার পরিবেশ, নিরাপত্তা, স্বাস্থ্য ও পরিচ্ছন্নতা, মানবসম্পদ, তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি, পরিবহন অবকাঠামো, পর্যটনসেবা, প্রাকৃতিক ও সাংস্কৃতিক সম্পদ এবং টেকসই পর্যটনসহ ১৭টি বিষয় বিবেচনায় নেওয়া হয়। এ সূচকে ২০১৭ সালে বাংলাদেশের অবস্থান ছিল ১২৫তম; ২০২১ সালে ১০০তম অবস্থানে উঠে আসে। তবে ২০২৪ সালে ৯ ধাপ পিছিয়ে হয় ১০৯তম। এ বছর বাংলাদেশ সবচেয়ে ভালো করেছে প্রাকৃতিক ও সাংস্কৃতিক সম্পদ বিভাগে। সবচেয়ে খারাপ করেছে টেকসই উন্নয়নে; এ ক্ষেত্রে সব দেশের মধ্যে বাংলাদেশের স্কোর সর্বনিম্ন।
প্রতি দুই বছর পর টিটিডিআই সূচক প্রকাশ করা হয়। এ বছরের সূচক আগামীকাল প্রকাশ করার কথা।
বাংলাদেশ পর্যটন করপোরেশনের চেয়ারম্যান মো. সামীমুজ্জামান প্রথম আলোকে বলেন, একটি পর্যটনকেন্দ্রে ক্লিক করলেই সেখানে যাওয়ার উপায়, আবহাওয়া, থাকার ব্যবস্থা, বুকিং, দর্শনীয় স্থান, ইতিহাস ও আশপাশের তথ্য পাওয়া যাবে, এমন ব্যবস্থা গড়ে তোলার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। এআইয়ের মাধ্যমে অল্প সময়ে এসব তথ্য দেশ-বিদেশের বিপুলসংখ্যক পর্যটকের কাছে পৌঁছে দেওয়া সম্ভব হবে। এ খাতের বিকাশে বিনিয়োগ বাড়ানো ও অবকাঠামো উন্নয়নের পাশাপাশি স্থানীয় জনগোষ্ঠীকে সম্পৃক্ত করার ওপরও গুরুত্ব দেন তিনি।
সুন্দরবন ও সেন্ট মার্টিনের মতো সংবেদনশীল এলাকায় পর্যটকের চাপ ও পরিবেশগত প্রভাব পর্যবেক্ষণেও এআই ব্যবহারের সুযোগ রয়েছে। তবে এ জন্য জাতীয় পর্যায়ে তথ্য ব্যবস্থাপনা ও ডেটা গভর্ন্যান্স কাঠামো, সরকারি-বেসরকারি সমন্বয় এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বাড়ানো প্রয়োজন বলে গবেষণায় বলা হয়েছে।
জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচি (ইউএনডিপি) বাংলাদেশের এক গবেষণাতেও পর্যটন খাতে তথ্যব্যবস্থা ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতার ঘাটতির বিষয়টি উঠে এসেছে। ‘তথ্য ব্যবস্থাপনা ভাবনা: কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও তথ্য উদ্ভাবন ব্যবহার করে টেকসই পর্যটনে বাংলাদেশ কতটা এগোল?’ শীর্ষক গবেষণায় বলা হয়েছে, পর্যটন খাতের বিভিন্ন অংশীজনের মধ্যে কার্যকর সমন্বয় এবং সমন্বিত তথ্য ব্যবস্থাপনা না থাকায় খাতের উন্নয়ন বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
ডিজিটাল রূপান্তরের জন্য তথ্য সংগ্রহ, সংরক্ষণ ও ব্যবহারের সমন্বিত ব্যবস্থা গড়ে তোলার সুপারিশ করেছে ইউএনডিপি। বাংলাদেশ ট্যুরিজম বোর্ডের অধীনে এআইভিত্তিক জাতীয় পর্যটন ‘ড্যাশবোর্ড’ তৈরির কথাও বলা হয়েছে। এতে জাতীয় পর্যটক তথ্যভান্ডার, ট্যুরিজম স্যাটেলাইট অ্যাকাউন্ট, পরিসংখ্যানভিত্তিক তথ্যচিত্র ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের তথ্য যুক্ত করার সুপারিশ রয়েছে।
সুন্দরবন ও সেন্ট মার্টিনের মতো সংবেদনশীল এলাকায় পর্যটকের চাপ ও পরিবেশগত প্রভাব পর্যবেক্ষণেও এআই ব্যবহারের সুযোগ রয়েছে। তবে এ জন্য জাতীয় পর্যায়ে তথ্য ব্যবস্থাপনা ও ডেটা গভর্ন্যান্স কাঠামো, সরকারি-বেসরকারি সমন্বয় এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বাড়ানো প্রয়োজন বলে গবেষণায় বলা হয়েছে।
বাংলাদেশের পর্যটন খাতের নানা চ্যালেঞ্জের মধ্যে ডিজিটাল রূপান্তরও একটি। সরকারের উচিত এখনই এ খাতের উন্নয়নে নজর দেওয়া।তৌফিক রহমান, মহাসচিব, পিএটিএ বাংলাদেশ চ্যাপটার
প্যাসিফিক এশিয়া ট্রাভেল অ্যাসোসিয়েশন (পিএটিএ) বাংলাদেশ চ্যাপটারের মহাসচিব তৌফিক রহমান প্রথম আলোকে বলেন, বাংলাদেশের পর্যটন খাতের নানা চ্যালেঞ্জের মধ্যে ডিজিটাল রূপান্তরও একটি। সরকারের উচিত এখনই এ খাতের উন্নয়নে নজর দেওয়া। অভ্যন্তরীণ পর্যটনের পাশাপাশি বিদেশি পর্যটকের আগমন বাড়াতে এবং দেশের পর্যটনকেন্দ্রগুলো আন্তর্জাতিকভাবে ব্র্যান্ডিং ও বাজারজাতকরণে জোর দেওয়া প্রয়োজন।
ডব্লিউইএফের সূচকে ইন্টারনেট ব্যবহার, ডিজিটাল পেমেন্টসহ তথ্যপ্রযুক্তির সক্ষমতাকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। ২০১৯ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে পর্যটন খাতে তথ্যপ্রযুক্তির সক্ষমতার বৈশ্বিক গড় স্কোর ৭ দশমিক ২ শতাংশ বেড়েছে। অনলাইন প্রবেশাধিকার, মোবাইল নেটওয়ার্ক ও ডিজিটাল পেমেন্টের বিস্তার এতে ভূমিকা রেখেছে।
বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব (পর্যটন অনুবিভাগ) মো. আব্দুর রউফ প্রথম আলোকে বলেন, পর্যটন খাতের ব্যবস্থাপনাকে পুরোপুরি ডিজিটাল করার লক্ষ্যে সরকার কাজ করছে। এআইসহ ডিজিটাল প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। তবে এ খাতে নির্দিষ্ট রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা এখনো ঠিক করা হয়নি বলে জানান তিনি।
পর্যটন খাতে ডিজিটাল রূপান্তরের পাশাপাশি প্রযুক্তি ব্যবহারের সক্ষমতায় বড় ঘাটতি রয়েছে। তথ্যের গোপনীয়তা, ব্যবহারের সীমা ও ডেটা সার্বভৌমত্বের বিষয়েও ঘাটতি রয়েছে। দুর্বল ডিজিটাল অবকাঠামো, ইন্টারনেটের গতি ও প্রযুক্তিতে বিনিয়োগের সীমাবদ্ধতাও চ্যালেঞ্জ।পর্যটন খাতবিশেষজ্ঞ ও জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যবসায় শিক্ষা অনুষদের সহযোগী অধ্যাপক মো. আনোয়ার হোসেন ভূঁঞা
বিশ্ব ভ্রমণ ও পর্যটন কাউন্সিলের (ডব্লিউটিটিসি) গত মে মাসের প্রতিবেদন অনুযায়ী, আগামী দশকে বৈশ্বিক অর্থনীতির তুলনায় পর্যটন খাত দ্রুত বাড়বে। এ সময়ে পর্যটন খাতের বৈশ্বিক জিডিপি বার্ষিক গড়ে ৩ দশমিক ৬ শতাংশ হারে বাড়তে পারে। সামগ্রিক বৈশ্বিক অর্থনীতির প্রবৃদ্ধি হতে পারে ২ দশমিক ৪ শতাংশ।
২০২৬ সালে পর্যটন খাত বৈশ্বিক অর্থনীতিতে প্রায় ১২ ট্রিলিয়ন ডলার অবদান রাখবে, যা বৈশ্বিক জিডিপির ৯ দশমিক ৯ শতাংশ। এ খাতে কর্মসংস্থান হবে প্রায় ৩৭ কোটি ৬০ লাখ মানুষের। আগামী ১০ বছরে প্রায় ৮ কোটি ৯০ লাখ নতুন কর্মসংস্থান হতে পারে।
দেশে বর্তমানে জিডিপিতে পর্যটন খাতের অবদান ২ থেকে ৩ শতাংশ। বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয় বলছে, সরকারের লক্ষ্য তা ৭ শতাংশের বেশি করা। এ লক্ষ্যে আগামী ডিসেম্বরের মধ্যে মহাপরিকল্পনা চূড়ান্ত করার কাজ চলছে।
পর্যটন খাতবিশেষজ্ঞ ও জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যবসায় শিক্ষা অনুষদের সহযোগী অধ্যাপক মো. আনোয়ার হোসেন ভূঁঞা প্রথম আলোকে বলেন, পর্যটন খাতে ডিজিটাল রূপান্তরের পাশাপাশি প্রযুক্তি ব্যবহারের সক্ষমতায় বড় ঘাটতি রয়েছে। তথ্যের গোপনীয়তা, ব্যবহারের সীমা ও ডেটা সার্বভৌমত্বের বিষয়েও ঘাটতি রয়েছে। দুর্বল ডিজিটাল অবকাঠামো, ইন্টারনেটের গতি ও প্রযুক্তিতে বিনিয়োগের সীমাবদ্ধতাও চ্যালেঞ্জ।