বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর
বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর

দ্য হিন্দুকে মির্জা ফখরুল

শেখ হাসিনার ভারতে অবস্থান ঢাকা-নয়াদিল্লি সম্পর্কে ‘বাধা’ হবে না

ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক একক কোনো ইস্যুতে ‘আটকে’ থাকবে না। একই সঙ্গে ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ভারতে অবস্থান দেশটির সঙ্গে বৃহৎ পরিসরে সম্পর্ক এগিয়ে নিতে বাংলাদেশকে ‘বাধা’ দেবে না। বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর এসব কথা বলেছেন।

মঙ্গলবার বাংলাদেশে পরবর্তী সরকার গঠন করবে বিএনপি। ঢাকার গুলশান এলাকার দলীয় কার্যালয়ে দ্য হিন্দুকে দেওয়া একান্ত সাক্ষাৎকারে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, বাংলাদেশের স্বার্থে যেসব প্রকল্প রয়েছে, সেগুলো দ্রুত এগিয়ে নেওয়া হবে এবং ভারতের সঙ্গে উন্নয়ন অংশীদারত্ব আরও জোরদার করা হবে।

বৃহৎ পরিসরে বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে যে সম্পর্ক রয়েছে, তা কোনো একক ইস্যুতে ‘আটকে’ থাকা উচিত নয় উল্লেখ করে মির্জা ফখরুল বলেন, ‘আমি বিশ্বাস করি যে শেখ হাসিনা সত্যিই মানবাধিকারের গুরুতর লঙ্ঘন করেছেন। তাঁকে শাস্তি দেওয়ার বিষয়ে জনমানুষের দাবি রয়েছে। আর আমরা মনে করি, ভারত তাঁকে আমাদের হাতে তুলে দেবে। কিন্তু শেখ হাসিনাকে যদি বাংলাদেশের হাতে তুলে না দেওয়া হয়, তাহলে তা বাণিজ্যিক সম্পর্কসহ বৃহৎ সম্পর্ক গড়ে তোলার ক্ষেত্রে কোনো বাধা হবে না। এমনকি আমরা আরও ভালো সম্পর্ক গড়তে চাই।’

২০২৪ সালের গণ–অভ্যুত্থানের পর দেশ ছেড়ে পালিয়ে যাওয়া শেখ হাসিনা ও আওয়ামী লীগের কয়েকজন জ্যেষ্ঠ নেতাকে হস্তান্তরের জন্য বারবার ভারতের কাছে অনুরোধ জানিয়েছে বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকার। তবে গত ১৭ মাসে ভারত এসব অনুরোধের জবাব দেয়নি। মির্জা ফখরুল বলেন, অভ্যুত্থানের সময় হত্যা ও অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের অভিযোগে অভিযুক্ত শেখ হাসিনা এবং তাঁর মন্ত্রী ও আমলাদের বিরুদ্ধে আইনি প্রক্রিয়া চলছে। সেই প্রক্রিয়া চলবে।

মির্জা ফখরুল বলেন, ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের কিছু জটিল বিষয় রয়েছে, যা সমাধান করা প্রয়োজন। তবে সেগুলো সহযোগিতার ক্ষেত্রগুলোকে ছাপিয়ে যাওয়া উচিত নয়। তিনি বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কে অনেক সমস্যা রয়েছে। তবু তারা একে অপরের সঙ্গে কাজ করছে। শুধু একটি ইস্যুতে আমাদের বাংলাদেশ–ভারত সম্পর্ককে আটকে রাখা উচিত হবে না।’

বাংলাদেশের রাজনীতিতে বিএনপির ঐতিহাসিক ভূমিকার কথা তুলে ধরেন মির্জা ফখরুল। তিনি স্মরণ করিয়ে দেন—১৯৭৫ সালের আগস্টে শেখ মুজিবুর রহমানকে হত্যার পর যখন শেখ হাসিনা ও তাঁর পরিবারের অন্যান্য সদস্য ভারতে ছিলেন, তখন বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ভারত সফর করেছিলেন এবং ঢাকায় প্রধানমন্ত্রী মোরারজি দেশাইকে আতিথেয়তা দিয়েছিলেন। মির্জা ফখরুল আরও স্মরণ করিয়ে দেন যে ১৯৮০ সালের জানুয়ারি মাসে জিয়াউর রহমান যখন দিল্লি সফরে গিয়ে ইন্দিরা গান্ধীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছিলেন, তখন শেখ হাসিনা রাজনৈতিক জীবন শুরুর জন্য বাংলাদেশে ফেরার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। তিনি বলেন, ‘এটাই রাষ্ট্রনায়কের মতো দৃষ্টিভঙ্গি।’

মির্জা ফখরুল বলেন, ‘আগামী বছরের আগেই গঙ্গা পানি চুক্তির নবায়নের প্রসঙ্গে ফারাক্কার পানির বিষয়টি সামনে আসবে। এরপর আছে সীমান্তে হত্যাকাণ্ডের বিষয়টি। আর এসব নিয়ে আমাদের কথা বলতে হবে।’ তিনি আরও বলেন, ‘আমরা ভারতের সঙ্গে যুদ্ধ করতে পারি না। আমাদের আলোচনা করতে হবে। যাঁরা ভারতের সঙ্গে যুদ্ধের কথা বলেন, তাঁরা উন্মাদের মতো কথা বলেন।’

বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমানের পাশাপাশি মির্জা ফখরুলও রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের সঙ্গে সমঝোতার পক্ষে। গত রোববার দলীয় চেয়ারম্যানের সঙ্গে তিনিও জামায়াতে ইসলামী ও জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) নেতাদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন।

মির্জা ফখরুল বলেন, প্রতিশোধ ও সহিংসতা বাংলাদেশে সুস্থ গণতান্ত্রিক পরিবেশ গঠনের জন্য ক্ষতিকর। তিনি বলেন, ২০২৪ সালের আগস্টে সহিংস অভ্যুত্থানের পর অন্তর্বর্তী সরকার সম্প্রীতি প্রতিষ্ঠা করতে পারেনি। কারণ, ‘অভ্যুত্থানের নেতারা অধ্যাপক ইউনূসকে বেছে নিয়েছিলেন। তাঁরা অধ্যাপক ইউনূসকে যে সীমা বেঁধে দিয়েছিলেন, তার বাইরে তিনি যেতে পারেননি।’

মির্জা ফখরুল বিএনপির ৩১ দফা কর্মসূচিকে এমন একটি সুযোগ হিসেবে তুলে ধরেন, যা বাংলাদেশ ও ভারতকে বাণিজ্য, ব্যবসা, সক্ষমতা তৈরি এবং ডিজিটাল অবকাঠামোর মতো ক্ষেত্রে কাজ করার সুযোগ দেবে। তিনি বলেন, ‘প্রযুক্তিগত শিক্ষায় ভারতের সক্ষমতা রয়েছে। আর আমাদের রয়েছে বিপুলসংখ্যক বেকার তরুণ। তাদের সক্ষমতা বৃদ্ধিতে আমাদের সহায়তা করতে হবে, যেন তারা উপসাগরীয় দেশগুলোতে চাকরি পেতে পারে।’ মির্জা ফখরুল আরও উল্লেখ করেন যে আওয়ামী লীগ সরকারের রেখে যাওয়া ঋণের বোঝা বিএনপি সরকারকে সামলাতে হবে। একই সঙ্গে বিভিন্ন প্রকল্প পুনর্মূল্যায়ন করা হবে, যাতে বোঝা যায় কোন কোন মেগা প্রকল্প অপচয়মূলক। তিনি বলেন, ‘এই প্রকল্পগুলোর মধ্যে যেগুলো বাংলাদেশের স্বার্থে কাজে লাগবে, সেগুলো আমরা বজায় রাখব।’