বাংলাদেশ সরকারি কর্ম কমিশন (পিএসসি)
বাংলাদেশ সরকারি কর্ম কমিশন (পিএসসি)

স্বায়ত্তশাসন চায় পিএসসি, সিদ্ধান্ত জানায়নি সরকার

সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে আর্থিক ও প্রশাসনিক স্বায়ত্তশাসন চেয়েছে সরকারি কর্ম কমিশন (পিএসসি)। এ–সংক্রান্ত একটি অধ্যাদেশের খসড়া প্রস্তুত করে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়েছে সংস্থাটি। একই সঙ্গে খসড়াটি উপদেষ্টা পরিষদের বৈঠকে উপস্থাপনের জন্য মন্ত্রণালয়ের জ্যেষ্ঠ সচিবের কাছে আধা সরকারি পত্র (ডিও লেটার) দিয়েছেন পিএসসির চেয়ারম্যান।

তবে সরকারের পক্ষ থেকে এ বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্ত জানানো হয়নি। এ বিষয়ে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকেও স্পষ্ট করে কিছু বলা হচ্ছে না।

সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, আসছে ১২ ফেব্রুয়ারি জাতীয় নির্বাচন। এরপর গঠিত হবে নতুন সরকার। অন্তর্বর্তী সরকারের মেয়াদ একেবারেই শেষ পর্যায়ে। এ পরিস্থিতিতে পিএসসির বিষয়ে এমন একটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে কি না, সেটি একটি বড় প্রশ্ন। আবার পিএসসির আর্থিক স্বায়ত্তশাসনের বিষয়ে সরকারের, বিশেষ করে অর্থ মন্ত্রণালয়ের নীতিনির্ধারকদের কারও কারও আপত্তি আছে। তবে তাঁরা পিএসসির পরিচালনার (প্রশাসনিক) ক্ষেত্রে স্বায়ত্তশাসনের পক্ষে।

আর্থিক ও প্রশাসনিক স্বাধীনতা না থাকায় অনেক সময় নিজেদের অসহায় মনে হয়। পিএসসি সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান হলেও বাস্তবে নানা প্রশাসনিক জটিলতায় পড়তে হয়। এখন কাজের পরিধি বেড়েছে এবং এক বছরের মধ্যে একটি বিসিএস শেষ করার লক্ষ্যমাত্রা গ্রহণ করা হয়েছে। আর্থিক ও প্রশাসনিক স্বায়ত্তশাসন পেলে কমিশনের কাজের গতি ও দক্ষতা অনেক বাড়বে।
অধ্যাপক মোবাশ্বের মোনেম, চেয়ারম্যান, পিএসসি

পিএসসি খসড়াটি পাঠিয়েছে গত জানুয়ারি মাসের মাঝামাঝি সময়ে। এ বিষয়ে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের জ্যেষ্ঠ সচিব মো. এহছানুল হকের বক্তব্যের জন্য চেষ্টা করেও পাওয়া যায়নি। পরে গত রোববার জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে গেলে মন্ত্রণালয়ের জনসংযোগ কর্মকর্তার মাধ্যমে তিনি জানান, এ বিষয়ে তিনি কোনো মন্তব্য করবেন না।

নিয়োগপ্রক্রিয়াসহ প্রতিষ্ঠানের কাজের গতি বাড়াতে পিএসসির আর্থিক ও প্রশাসনিক স্বায়ত্তশাসন প্রয়োজন বলে মনে করেন সংস্থাটির নীতিনির্ধারকেরা। তাঁদের ভাষ্য, বর্তমানে আর্থিক বিষয়ে অর্থ মন্ত্রণালয়সহ একাধিক স্তরের অনুমতির ওপর নির্ভর করতে হয়। এতে সময় লাগে এবং কাজের ধারাবাহিকতাও ব্যাহত হয়।

পিএসসি জানিয়েছে, প্রতিষ্ঠার ৫৩ বছর পেরিয়ে গেলেও আর্থিক ও প্রশাসনিক ক্ষেত্রে সংবিধানে যে স্বাধীনতার কথা বলা হয়েছে, বাস্তবে তা কার্যকর হয়নি। কমিশন এখনো অনেক ক্ষেত্রে সরকারের অন্যান্য অধিদপ্তরের মতোই বিবেচিত হচ্ছে। সংবিধান অনুযায়ী বাজেট বরাদ্দের যে বিধান রয়েছে, পিএসসির ক্ষেত্রে তা অনুসরণ করা হয় না। ফলে কমিশনকে অর্থ মন্ত্রণালয়ের ওপর নির্ভরশীল থাকতে হয়। এতে কমিশনের কার্যক্রমে প্রভাব পড়ছে, এমনটাই পিএসসির দাবি।

চলতি অর্থবছরের জুলাই মাসে কমিশনের সদস্যদের বেতন-ভাতা উত্তোলন নিয়েও সাময়িক জটিলতা দেখা দিয়েছিল। সে সময় পিএসসি সদস্যদের প্রজাতন্ত্রের কর্মচারী হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছিল। কমিশনের মতে, এ ধরনের পরিস্থিতি এড়াতেও স্বায়ত্তশাসনের বিষয়টি স্পষ্ট করা প্রয়োজন।

প্রশাসনিক ক্ষেত্রেও একই ধরনের সীমাবদ্ধতার কথা বলছে কমিশন। বিধি প্রণয়ন বা সংশোধন, প্রার্থী বাছাই কিংবা পরামর্শ দেওয়ার মতো কাজে সরকারের ওপর নির্ভরতার কারণে দীর্ঘসূত্রতা তৈরি হয়।

চলতি অর্থবছরের জুলাই মাসে কমিশনের সদস্যদের বেতন-ভাতা উত্তোলন নিয়েও সাময়িক জটিলতা দেখা দিয়েছিল। সে সময় পিএসসি সদস্যদের প্রজাতন্ত্রের কর্মচারী হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছিল। কমিশনের মতে, এ ধরনের পরিস্থিতি এড়াতেও স্বায়ত্তশাসনের বিষয়টি স্পষ্ট করা প্রয়োজন।

কী আছে খসড়ায়

পিএসসির তৈরি করে দেওয়া ‘বাংলাদেশ সরকারি কর্ম কমিশন (সংশোধন) অধ্যাদেশ, ২০২৬’ খসড়ায় বলা হয়েছে, কমিশনের চেয়ারম্যান সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের বিচারপতিদের এবং সদস্যরা হাইকোর্ট বিভাগের বিচারপতিদের সমপর্যায়ের বেতন, ভাতা ও অন্যান্য সুবিধা পাওয়ার অধিকারী হবেন।

খসড়ায় আরও উল্লেখ আছে, প্রতি অর্থবছরে কমিশন থেকে পাওয়া প্রস্তাব বিবেচনা করে সরকার নির্দিষ্ট করা অর্থ বরাদ্দ দেবে। অনুমোদিত খাতে সেই অর্থ ব্যয়ের জন্য সরকারের পূর্বানুমোদন নিতে হবে না। তবে সরকারের জারি করা ব্যয় বন্ধ সম্পর্কিত বিধিবিধান এই ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হবে।

কমিশনের বাজেট থেকে ব্যয় অনুমোদনের ক্ষেত্রে কমিশনের সভাপতি চূড়ান্ত কর্তৃপক্ষ হবেন। তবে মহাহিসাব নিরীক্ষকের সাংবিধানিক অধিকার ক্ষুণ্ন করা যাবে না।

‘স্বায়ত্তশাসন হলে নিয়োগ কম সময়ে হবে’

পিএসসি একটি সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান, যা বিসিএসসহ প্রতিযোগিতামূলক বিভিন্ন পরীক্ষার মাধ্যমে প্রজাতন্ত্রের কর্মে যোগ্য ও মেধাভিত্তিক জনবল নিয়োগ নিশ্চিত করে। পাশাপাশি নিয়োগ, পদোন্নতি, শৃঙ্খলাসহ আনুষঙ্গিক বিষয়ে মতামত দেয়।

জনপ্রশাসনসচিবকে দেওয়া পিএসসি চেয়ারম্যানের চিঠি এবং পিএসসির নীতিনির্ধারকদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, কমিশনের চেয়ারম্যান ও সদস্যদের অপসারণের ক্ষেত্রে সুপ্রিম কোর্টের বিচারকদের মতো পদ্ধতি অনুসরণ করা হয়। সে কারণে বেতন-ভাতার ক্ষেত্রেও তাঁদের মর্যাদা বিচারকদের সমপর্যায়ের হওয়া উচিত। সংবিধানে পিএসসি সদস্যদের বেতন-ভাতা অন্যান্য সাংবিধানিক পদধারীদের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করার কথা বলা হলেও বাস্তবে তা প্রজাতন্ত্রের কর্মচারীদের মতো নির্ধারণ করা হয়েছে বলে কমিশনের দাবি।

পিএসসি মনে করে, আর্থিক ও প্রশাসনিক স্বায়ত্তশাসন হলে নিয়োগ কার্যক্রম কম সময়ে করার পরিকল্পনা বাস্তবায়ন সহজ হবে, যেটা চাকরিপ্রার্থীদের উপকার হবে।

এই প্রেক্ষাপটে পিএসসি মনে করছে, কমিশনের সাংবিধানিক মর্যাদা সুস্পষ্ট করতে এবং আর্থিক ও প্রশাসনিক কার্যক্রম স্বাধীনভাবে পরিচালনার জন্য বাংলাদেশ কর্ম কমিশন আইন, ২০২৩ সংশোধন প্রয়োজন। পিএসসি মনে করে, আর্থিক ও প্রশাসনিক স্বায়ত্তশাসন হলে নিয়োগ কার্যক্রম কম সময়ে করার পরিকল্পনা বাস্তবায়ন সহজ হবে, যেটা চাকরিপ্রার্থীদের উপকার হবে।

পিএসসির চেয়ারম্যান অধ্যাপক মোবাশ্বের মোনেম প্রথম আলোকে বলেন, আর্থিক ও প্রশাসনিক স্বাধীনতা না থাকায় তাঁরা অনেক সময় নিজেদের অসহায় মনে করেন। পিএসসি সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান হলেও বাস্তবে নানা প্রশাসনিক জটিলতায় পড়তে হয়। এখন কাজের পরিধি বেড়েছে এবং এক বছরের মধ্যে একটি বিসিএস শেষ করার লক্ষ্যমাত্রা গ্রহণ করা হয়েছে। আর্থিক ও প্রশাসনিক স্বায়ত্তশাসন পেলে কমিশনের কাজের গতি ও দক্ষতা অনেক বাড়বে। তিনি বলেন, সরকার সংবিধান মোতাবেক বাজেট দেবে, সেটি ব্যয়ে সরকারি বিধিবিধান অনুযায়ী জবাবদিহি নিশ্চিত করা হবে। পিএসসিকে আর্থিক ও প্রশাসনিক স্বায়ত্তশাসন দিলে দেশেরই মঙ্গল হবে।