
প্রিয় পাঠক, প্রথম আলোয় নিয়মিত প্রকাশিত হচ্ছে আপনাদের লেখা। আপনিও পাঠান। গল্প-কবিতা নয়, বাস্তব অভিজ্ঞতা। আপনার নিজের জীবনের বা চোখে দেখা সত্যিকারের গল্প; আনন্দ বা সফলতায় ভরা কিংবা মানবিক, ইতিবাচক বা অভাবনীয় সব ঘটনা। শব্দসংখ্যা সর্বোচ্চ ৬০০। দেশে থাকুন কি বিদেশে; নাম, ঠিকানা, ফোন নম্বরসহ পাঠিয়ে দিন এই ঠিকানায়: readers@prothomalo.com
১৯৮২ সাল। আমি পড়ি ক্লাস থ্রিতে। সেই সময় আমাদের এলাকায় যানবাহন বলতে ছিল কাঠের চাকার গরু-মহিষের গাড়ি, রিকশা ও জংধরা সাইকেল। মোটরসাইকেল চোখে পড়ত কালেভদ্রে। মানুষ হেঁটেই এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় যেত। বর্ষাকালে ভরসা ছিল ভেলা বা নৌকা। বাস-রেল ছিল রূপকথার মতো।
ঢাকা বা রংপুর যেতে হলে প্রথমে হেঁটে বা রিকশায় যেতে হতো ধরলা নদীর পাটেশ্বরী ঘাট পর্যন্ত। তারপর নৌকায় নদী পার হয়ে কুড়িগ্রাম গিয়ে বাস বা ট্রেনে চড়তে হতো। এরপর কাউনিয়া হয়ে রংপুর বা ঢাকা। আর নাগেশ্বরী থেকে তখনকার জেলা শহর রংপুরে যেতে লেগে যেত এক দিন এক রাত। তাই এলাকায় একটি প্রবাদ চালু ছিল, ‘যাই যায় রমপুর, তাই যায় যমপুর।’
যাঁরা বিশেষ প্রয়োজনে দু-একবার রংপুর বা ঢাকা গিয়েছিলেন, তাঁদের কাছে বাস বা ট্রেনে চড়ার গল্প মুগ্ধ হয়ে শুনতাম। আর মনে মনে ভাবতাম, ইশ্, কখনো যদি বাস বা ট্রেনে ওঠার সৌভাগ্য হতো!
একদিন খবর ছড়াল, কুড়িগ্রাম সদরের ইট ও আড়ত ব্যবসায়ী গেন্দু মিয়া পাটেশ্বরী-ভূরুঙ্গামারী রুটে বাস নামিয়েছেন। দূরত্ব প্রায় ৩৫ কিলোমিটার। ভাড়া ১০ টাকা। আজব সে গাড়ি! ডিজেলে চলে, হ্যান্ডেল ঘুরিয়ে স্টার্ট দিতে হয়।
গ্রামের ছোট-বড় সবাই ছুটল গেন্দু মিয়ার সেই বাস দেখতে। স্কুল থেকে ফেরার পথে আমরা চার বন্ধু ঠিক করলাম, সামনের বন্ধে ব্যাপারী হাটে গিয়ে বাস দেখব।
সেদিন ছিল শুক্রবার। আমি, লুৎফর, কাশেম ও রূপাতন সকালের নাশতা সেরে রওনা দিলাম। বিস্তীর্ণ আউশের মাঠ। পায়ে চলা সরু পথ। মাঠে কৃষকেরা আগাছা পরিষ্কার করছিলেন। তাঁদের একজন জিজ্ঞেস করলেন, ‘ক্যা বাহে, কোডাই যান?’
‘ব্যাপারী হাট। গেন্দু মিয়ার বাস দেইখপার।’
‘যাও, যাও। কী তামশার গাড়ি! ডিজল দিয়া চলে, হ্যান্ডেল মারি এস্টাট দ্যাওয়া নাগে। জীবনেও এমন শুনি নাই।’
কথা শুনে কৌতূহল আরও বেড়ে গেল। প্রায় আধা ঘণ্টা হাঁটার পর পৌঁছালাম ব্যাপারীর হাটে। তখন ওটা ছিল ছোট্ট বাজার। চার-পাঁচটি মুদি, একটি পান-সিগারেট ও চায়ের দোকান।
এক মুদিদোকানি আমাকে দেখে চিনে বললেন, ‘ক্যা বাহে, তোমরা এত্তি?’
‘বাস দেইখপার আসচি।’
‘ইশ্! একনা আগোত আইসলে তো দেইখপার পাইলেন হয়। বাস তো খানেক আগোত গেইল। বইসো, আবার আইসপে।’
আমাদের আশা মুহূর্তেই নিভে গেল। বললাম, ‘আজ আর হবে না, চল বাড়ি ফিরে যাই।’
রূপাতন নাছোড়বান্দা। বলল, ‘ তোরা যা। আসছি যখন আমি দেখেই যাব।’
অবশেষে ওর জেদের কাছে হার মানলাম। বসে অপেক্ষা করতে লাগলাম। বাড়তে লাগল বাস দেখতে আসা কৌতূহলী মানুষের সংখ্যা। সূর্য মাথার ওপর না উঠতেই ভরে গেল বাজার।
২.
হঠাৎ হর্নের আওয়াজ। ‘এ বাস আইসচে রে, বাস আইসচে’ বলে সবাই উল্লাস করতে লাগল।
ধুলা উড়িয়ে এসে থামল রংচটা ছোট্ট মিনিবাস। জানালার বেশির ভাগ কাচই ভাঙা। হেলপার লাফ দিয়ে নেমে হাঁকলেন, ‘এ নামেন, নামেন। ব্যাপারী হাট, ব্যাপারী হাট।’
ভিড় ঠেলে দু-তিনজন যাত্রী নামলেন।
কন্ডাক্টর দরজায় দাঁড়ানো। বাঁ হাতের আঙুলের ভাঁজে ভাঁজে ১, ৫, ১০, ২০ টাকার নোট। আমরা বিস্ময়ে সেই কৌশল দেখি।
একটি ৫ টাকার নোট হেলপারকে দিয়ে তিনি বললেন, ‘যা, ওস্তাদের জন্য পান-সিগারেট নিয়া আয়।’
আমাদের মধ্যে তখন চরম উত্তেজনা। খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে বাসটা দেখছি। কাঠের সিট। লোহার হাতল। ইঞ্জিন থেকে কুণ্ডলী পাকিয়ে কালো ধোঁয়া বের হচ্ছে।
রূপাতনই প্রথম হাত দিল। তারপর একে একে আমরা সবাই। খোলটা গরম। ঘড়ঘড় করে মৃদু কাঁপছে। ভেতরে অন্য রকম শিহরণ।
হেলপার এসে আবারও হাঁকলেন, ‘এ ছাড়ি গ্যালো, ছাড়ি গ্যালো। নাগেশ্বরী, ভূরুঙ্গামারী। আইসেন, আইসেন।’
ঠেলাঠেলি করে পাঁচ-ছয়জন যাত্রী উঠলেন। এরপর বিকট হর্ন বাজিয়ে ধুলা উড়িয়ে বাস আবারও ছুটতে লাগল। আমরা অভিভূত হয়ে দাঁড়িয়ে সেই দৃশ্য দেখলাম।
সময় বদলেছে। ২০০৩ সালে ধরলার ওপর সেতু হয়েছে। ভূরুঙ্গামারী থেকে কুড়িগ্রাম পর্যন্ত এখন ডাবল লেনের পাকা সড়ক। প্রতিদিন শত শত গাড়ি এখান থেকে ঢাকা, চট্টগ্রাম, রাজশাহীসহ দেশের নানা প্রান্তে যায়।
এসব বাসের ঝকঝকে রং এবং ভেতরের বাহার দেখলে চোখ ধাঁধিয়ে যায়। বিশেষ করে রাতের বেলায় বাসগুলোর লাল-হলুদ-সবুজের আলোর মিছিল আলাদা আবহের সৃষ্টি করে।
তবু জীবনের প্রথম গেন্দু মিয়ার হ্যান্ডেল ঘুরিয়ে স্টার্ট দেওয়া সেই বাস দেখার অনুভূতিটা ছিল অন্য রকম।
রিজভী আহমেদ, নাগেশ্বরী, কুড়িগ্রাম