বেসরকারি চাকরিজীবী জাকি হায়দার বেড়াতে পছন্দ করেন। ঈদ এলেই পরিবার বা বন্ধুদের নিয়ে কোথাও বেড়ানোর পরিকল্পনা করেন। এবারও ঈদে লম্বা ছুটি তাঁর, কিন্তু কোথাও যাওয়া হচ্ছে না। তিনি বলেন, একের পর এক দেশ ভিসা বন্ধ করে দিয়েছে। নতুন গন্তব্য খুঁজে পাওয়া কঠিন। যা-ও আছে, উড়োজাহাজের টিকিটের দামের সঙ্গে বাজেট মেলানো যায় না। তাই বাধ্য হয়েই এবার বাদ দিতে হয়েছে ভ্রমণ পরিকল্পনা।
শুধু জাকি হায়দার নন, এমন সমস্যা এখন অনেকের। নিয়মিত বেড়াতে যান, এমন পাঁচজনের সঙ্গে কথা বলে একই ধারণা পাওয়া গেছে। তাঁরা বলেন, মধ্যবিত্তের বিদেশ ভ্রমণে এশিয়ার দেশগুলোই মূলত ভরসা। এর মধ্যে দুবাই অনেক দিন ধরে বন্ধ। উজবেকিস্তান, ভিয়েতনাম, কম্বোডিয়া জনপ্রিয় হয়ে উঠলেও বন্ধ হয়ে গেছে ভিসা। ভারতের ভিসা বন্ধ প্রায় দুই বছর ধরে।
বাংলাদেশ ট্যুর অপারেটরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (টোয়াব), অ্যাসোসিয়েশন অব ট্রাভেল এজেন্সিজ অব বাংলাদেশ (আটাব), প্যাসিফিক এশিয়া ট্রাভেল অ্যাসোসিয়েশন (পাটা) বাংলাদেশ, ট্যুরিজম রিসোর্ট ইন্ডাস্ট্রিজ অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ সূত্র বলছে, রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর পরিস্থিতি খারাপ হতে থাকে। গত দেড় বছর পর্যটন খাত মন্দা ছিল। বিদেশি পর্যটক আসা টানা কমেছে, এখন আসে না বললেই চলে। নির্বাচনের পর পরিস্থিতির উন্নতি আশা করা হয়েছিল। তিন মাসে তেমন উন্নতি হয়নি। বিভিন্ন দেশের সঙ্গে ভিসা চালু করতে সরকারের কূটনৈতিক তৎপরতা চালাতে হবে।
মধ্যবিত্তের বিদেশ ভ্রমণে এশিয়ার দেশগুলোই মূলত ভরসা। এর মধ্যে দুবাই অনেক দিন ধরে বন্ধ। উজবেকিস্তান, ভিয়েতনাম, কম্বোডিয়া জনপ্রিয় হয়ে উঠলেও বন্ধ হয়ে গেছে ভিসা। ভারতের ভিসা বন্ধ প্রায় দুই বছর ধরে।
পর্যটন খাতসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, নেপাল এখনো অন অ্যারাইভাল ভিসা দিচ্ছে। তবে দেশটিতে যেতে ৪০ হাজার টাকার নিচে টিকিট পাওয়া মুশকিল। ভুটান, মালদ্বীপ ও শ্রীলঙ্কায় আগে অনলাইনে আবেদন করে যেতে পারছেন পর্যটকেরা। ভুটানের টিকিট অন্তত ৫৫ হাজার ও শ্রীলঙ্কায় সরাসরি যেতে চাইলে কমপক্ষে ৭০ হাজার টাকা গুনতে হবে। মালদ্বীপ এ অঞ্চলের সবচেয়ে ব্যয়বহুল দেশ, তাই পর্যটকের চাপ কম। থাইল্যান্ডের ভিসা পেতেও লাগছে লম্বা সময়, নিয়মিত বাতিল হচ্ছে ভিসার আবেদন। আগে ভিসা থাকার পরও নতুন আবেদন বাতিল হচ্ছে কারও কারও। সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া ই-ভিসা দিলেও নতুন পাসপোর্টের ক্ষেত্রে দিচ্ছে না। যাঁদের আগে ভ্রমণের অভিজ্ঞতা আছে, তাঁরা পাচ্ছেন।
টোয়াব সদস্যরা বলছেন, ২০১৬ সালের হোলি আর্টিজানে হামলার পর বিদেশি পর্যটক আসায় বড় ধাক্কা লাগে। এরপর পরিস্থিতি একটু উন্নতি হলে দেখা দেয় ২০২০ সালের বৈশ্বিক মহামারি করোনা। ২০২২ সালে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের পর দেশে ২০২৪ সালের শুরুতে নির্বাচন নিয়েও নানা শঙ্কা তৈরি হয়। এরপর জুলাইয়ের গণ-অভ্যুত্থান ও পরবর্তী দেড় বছরে দেশের পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়নি। এর মধ্যে শুরু হয়েছে মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ শুরু হয়। যুদ্ধবিরতি চালু থাকলেও অনিশ্চয়তা কাটেনি।
যুদ্ধ শুরুর আগে ফেব্রুয়ারিতে প্রতি লিটার জেট ফুয়েলের দাম ছিল ৯৫ টাকা ১২ পয়সা। একইভাবে বেড়েছে আন্তর্জাতিক ফ্লাইটের ক্ষেত্রেও। সীমিত গন্তব্যে বাড়তি চাহিদা ও তেলের বাড়তি দামের কারণে উড়োজাহাজের টিকিটের দাম চড়া।
দেশে উড়োজাহাজের টিকিটের দাম বাড়তে শুরু করে করোনা মহামারির সময়। টিকিটের দাম তিন গুণ হয়ে যায় ওই সময়। দুই বছর পর কিছুটা কমলেও আগের দামে ফেরেনি। এর মধ্যে মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধ উড়োজাহাজে ব্যবহৃত জ্বালানি তেল জেট ফুয়েলের দাম বাড়িয়ে দিয়েছে। যুদ্ধ শুরুর পর অভ্যন্তরীণ উড়োজাহাজের জন্য মার্চে দুই দফায় ও এপ্রিলে এক দফায় জেট ফুয়েলের দাম বেড়েছিল। এতে দাম হয়েছিল ২২৭ টাকা ৮ পয়সা। মে মাসে দুই দফায় কমে এখন দাম ১৬৫ টাকা ৮৮ পয়সা। যুদ্ধ শুরুর আগে ফেব্রুয়ারিতে প্রতি লিটার জেট ফুয়েলের দাম ছিল ৯৫ টাকা ১২ পয়সা। একইভাবে বেড়েছে আন্তর্জাতিক ফ্লাইটের ক্ষেত্রেও। সীমিত গন্তব্যে বাড়তি চাহিদা ও তেলের বাড়তি দামের কারণে উড়োজাহাজের টিকিটের দাম চড়া।
বিদেশে যেতে নানা বাধার কারণেই দেশের ভেতরে বেড়ানোয় প্রতিবছর আগ্রহ বাড়ছে। এখানেও ভ্রমণের জায়গা সংকুচিত হয়ে আসছে। সিলেট ও মৌলভীবাজার অন্যতম জনপ্রিয় গন্তব্য। কিন্তু সড়কপথে যেতে আগের চেয়ে দ্বিগুণ সময় লাগে দুই বছর ধরে। এতে পর্যটকের আগ্রহ কমছে। এরপরও অনেকেই যাচ্ছে এসব এলাকায়। আরেক জনপ্রিয় গন্তব্য সুন্দরবনে পর্যটন বন্ধ থাকে জুন থেকে আগস্ট পর্যন্ত। পার্বত্য চট্টগ্রামের সাজেকে ভিড় হতে পারে এবারও। তবে সবচেয়ে বেশি ভিড় হবে কক্সবাজারে।
সরকারি দল বিএনপির নির্বাচনী ইশতেহারে বলা হয়েছে, প্রচুর সম্ভাবনা থাকার পরও বিশ্বে একটি পর্যটনপ্রিয় দেশ হয়ে উঠতে পারেনি বাংলাদেশ। দেশি-বিদেশি পর্যটকদের জন্য পরিচ্ছন্ন ও স্বাস্থ্যকর আবাসন, নিরাপদ ও আরামদায়ক ভ্রমণ নিশ্চিত করা হবে। পর্যটনবান্ধব দেশ হিসেবে গড়ে তুলতে পর্যটন নীতিমালা হালনাগাদ করা হবে।
আরেক জনপ্রিয় গন্তব্য সুন্দরবনে পর্যটন বন্ধ থাকে জুন থেকে আগস্ট পর্যন্ত। পার্বত্য চট্টগ্রামের সাজেকে ভিড় হতে পারে এবারও। তবে সবচেয়ে বেশি ভিড় হবে কক্সবাজারে।
পাটা বাংলাদেশ চ্যাপ্টারের মহাসচিব তৌফিক রহমান প্রথম আলোকে বলেন, এ ঈদে এমনিতেই পর্যটনে আগ্রহ কম থাকে। নির্বাচনের পর যে উন্নতির আশা করা হয়েছিল, তা হয়নি। বিদেশিরা আসছে না। বিদেশেও ভিসা জটিলতায় যেতে পারছে না অনেকে। উড়োজাহাজ টিকিটের দাম অনেক বেশি। গরমের সময় দেশের ভেতরেও আগ্রহ কম দেখা যাচ্ছে। কক্সবাজারের মতো কিছু এলাকায় পর্যটকদের ভিড় হতে পারে। তবে বিদেশি পর্যটক না এলে দেশের পর্যটন এগোবে না।