রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধকে ‘নয়া সাম্রাজ্যবাদী রাশিয়া ও পুঁজিবাদী ইউক্রেন—উভয় পক্ষ থেকেই একটি অন্যায্য যুদ্ধ’ আখ্যায়িত করেছেন জার্মানির মার্ক্সবাদী–লেনিনবাদী পার্টির নেতা মনিকা গার্টনার-এঙ্গেল৷ তিনি বলেছেন, সততার সঙ্গে শান্তির পক্ষে থাকা কোনো মানুষ রাশিয়া বা ইউক্রেন কারও পক্ষই নিতে পারে না।
আজ রোববার বিকেলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আধুনিক ভাষা ইনস্টিটিউট মিলনায়তনে ‘দ্য ইউক্রেন ওয়ার অ্যান্ড দ্য ওপেন ক্রাইসিস অব দ্য ইমপেরিয়ালিস্ট ওয়ার্ল্ড সিস্টেম’ শীর্ষক এক আলোচনা সভায় অংশ নিয়ে মনিকা গার্টনার-এঙ্গেল এসব কথা বলেন৷ বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ও বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিবি) সদস্য আবদুর রাজ্জাক খানের উদ্যোগে আয়োজিত এই সভায় মনিকা গার্টনার ছিলেন মূল বক্তা। মনিকা গার্টনার বিশ্বের ৪৭টি দেশের ৬২টি বামপন্থী দল-সংগঠনের জোট ইন্টারন্যাশনাল কো–অর্ডিনেশন অব রেভল্যুশনারি পার্টিজ অ্যান্ড অর্গানাইজেশনের (আইসিওআর) প্রধান সমন্বয়কের দায়িত্বে আছেন।
মনিকা গার্টনার-এঙ্গেল বলেন, ইউক্রেন যুদ্ধ বিভিন্ন সংকটকে ঘনীভূত করেছে। এগুলোর মধ্যে আছে পরিবেশগত সংকট, বিশ্ব অর্থনৈতিক সংকট, ঋণের সংকট, উচ্চ মুদ্রাস্ফীতি, বিশ্বজুড়ে ক্ষুধা এবং বুর্জোয়া শরণার্থী নীতির সংকট৷ পুতিন নয়া সাম্রাজ্যবাদী রাশিয়ার রাষ্ট্রপ্রধান। আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন এবং ইউক্রেনের আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার অস্বীকার করে তারা ইউক্রেন আক্রমণ করেছে। অপর দিকে যুক্তরাষ্ট্র নেতৃত্বাধীন সাম্রাজ্যবাদী জোট ন্যাটোও বিশ্বব্যাপী যুদ্ধের প্রধান প্ররোচনাদাতা। এই দুই ব্লকের যুদ্ধ একটি পারমাণবিক যুদ্ধে রূপ নিতে পারে, যা পুরো গ্রহে মানবজীবনের ভিত্তিকে ধ্বংস করে দিতে পারে।
জার্মান এই রাজনীতিকের মতে, ইউক্রেন যুদ্ধ এখন একটি নতুন পর্বে প্রবেশ করেছে৷ অত্যাধুনিক অস্ত্র ও প্রযুক্তির ব্যবহার এবং ন্যাটোর বিশেষ ইউনিটের প্রশিক্ষণ রাশিয়াকে প্রতিরক্ষামূলক প্রবণতায় নিয়ে গেছে৷ অন্যদিকে ইউক্রেনের অবকাঠামোর ওপর রাশিয়ার আক্রমণ সরবরাহব্যবস্থায় নিষ্ঠুর ঘাটতি তৈরি করেছে। এর ফলে শীতের শুরুতে জনজীবনে বিরূপ প্রভাব পড়েছে।
মনিকা গার্টনার বলেন, সশস্ত্র ও উন্মত্ত ইউক্রেন মার্কিন নেতৃত্বাধীন সাম্রাজ্যবাদী যুদ্ধজোট ন্যাটোর ‘প্রক্সি’ হিসেবে কাজ করছে। শ্রমিক শ্রেণির দৃষ্টিকোণ থেকে এ ক্ষেত্রে একমাত্র সঠিক দৃষ্টিভঙ্গি হচ্ছে, কোনো সাম্রাজ্যবাদী বা পুঁজিবাদী যুদ্ধবাজের পক্ষ না নিয়ে শ্রমিক শ্রেণি ও শ্রমজীবী জনগণের পাশে থাকা, যারা রাশিয়া ও ইউক্রেনে ফ্যাসিবাদী নিপীড়নের বিরুদ্ধে লড়াই করছে।
এই বামপন্থী নেতা আরও বলেন, রাশিয়ার প্রতিরক্ষামূলক প্রবণতায় যাওয়ার কারণ হচ্ছে, দেশটির জনগণ যুদ্ধকে সমর্থন করছে না৷ আর ইউক্রেনও তার ক্রিমিয়াসহ সব হারানো ভূখণ্ড পুনরুদ্ধার করা থেকে অনেক দূরে রয়েছে। এমন প্রেক্ষাপটে ইউক্রেন সরকারের বিষয়ে ন্যাটো ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে চিড় দেখা যাচ্ছে। এই পরিস্থিতি জনসাধারণের মধ্যে একটি আন্তর্জাতিক বিপ্লবী উত্থান এবং সর্বোপরি একটি সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের মধ্য দিয়ে সাম্রাজ্যবাদের অবসানের ভিত্তিভূমি হাজির করেছে।
সভার আয়োজক আবদুর রাজ্জাক খানের সভাপতিত্বে ও সিপিবি নেতা মঞ্জুর মঈনের সঞ্চালনায় এতে বামপন্থী বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও ছাত্রসংগঠনের নেতা-কর্মীরা অংশ নেন। অন্যদের মধ্যে সিপিবি নেতা মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম, বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দলের (বাসদ) নেতা খালেকুজ্জামান ও বজলুর রশীদ ফিরোজ, বাংলাদেশ জাসদের নেতা নাজমুল হক প্রধান প্রমুখ সভায় উপস্থিত ছিলেন৷ বক্তব্যের পর দর্শক-শ্রোতাদের নানা প্রশ্নের জবাব দেন মনিকা গার্টনার।