
আইন লঙ্ঘনের জরিমানা দশ গুণ বৃদ্ধিসহ যুগোপযোগী ধারা যুক্ত করে ৬০ বছর পর নতুন বাণিজ্য সংগঠন আইন করছে সরকার। এ জন্য বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু মুনশি গত ২৩ জানুয়ারি জাতীয় সংসদে ‘বাণিজ্য সংগঠন আইন, ২০২২’ বিল আকারে উপস্থাপন করেছেন। সংসদীয় স্থায়ী কমিটিতে আলোচনার পর এটি পাসের জন্য জাতীয় সংসদে উঠবে।
দেশে বর্তমানে প্রচলিত রয়েছে বাণিজ্য সংগঠন অধ্যাদেশ, ১৯৬১। ওই অধ্যাদেশ অনুযায়ী বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন পরিচালক বাণিজ্য সংগঠন (ডিটিও) দেশের চেম্বার, অ্যাসোসিয়েশন ও মালিক সমিতিগুলোকে লাইসেন্স দিয়ে আসছে।
বাণিজ্য মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, প্রচলিত অধ্যাদেশে ২৩টি ধারা থাকলেও নতুন আইনে থাকবে ৩২টি। সংসদে উত্থাপিত বিলে বলা হয়েছে, শিল্প, বাণিজ্য, সেবা খাতসহ দেশের অর্থনৈতিক স্বার্থ সংরক্ষণ ও উন্নয়নে বাণিজ্য সংগঠনগুলোর ভূমিকা, কার্যক্রম, শৃঙ্খলা ও দায়বদ্ধতা সুসংহত করতে এবং সময়ের চাহিদা পূরণ করতে ১৯৬১ সালের অধ্যাদেশ বাতিল করে যুগোপযোগী আইন করা হচ্ছে। ১৯৮৪ সালে অধ্যাদেশটি একবার সংশোধন করা হলেও এর আইনি কাঠামো বাণিজ্য সংগঠনগুলো পরিচালনা ও ব্যবস্থাপনার জন্য অপ্রতুল।
বিলে বাণিজ্য সংগঠনের সংজ্ঞাকে তিনভাবে বর্ণনা করা হয়েছে আইনে। ১. কোম্পানি আইন অনুযায়ী সীমিত দায় কোম্পানি হিসেবে গঠিত হওয়ার যোগ্য কোনো প্রতিষ্ঠান; ২. লাইসেন্স নিয়ে ও কোম্পানি আইনে নিবন্ধিত হয়ে বিভিন্ন ব্যবসা, শিল্প, বাণিজ্য ও সেবা খাতের প্রতিনিধিত্বকারী অরাজনৈতিক ও অলাভজনক কোনো সংগঠন এবং ৩. আয় বা মুনাফা কোনো সদস্য বা পরিচালনা পর্ষদের কেউ ভাগ করে নিতে পারবেন না—এমন কোনো প্রতিষ্ঠান।
বিদ্যমান অধ্যাদেশ লঙ্ঘনের ক্ষেত্রে লঙ্ঘনকারীকে এক হাজার থেকে দশ হাজার টাকা পর্যন্ত জরিমানা করার বিধান আছে। এটা বাড়িয়ে ১০ হাজার থেকে ১ লাখ টাকা পর্যন্ত প্রস্তাব করা হয়েছে। কোনো প্রজ্ঞাপন বা আদেশ লঙ্ঘন করলে প্রতিদিনের জন্য জরিমানাও থাকবে এক হাজার টাকা করে। যদিও বাণিজ্য মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, লঙ্ঘনের দায়ে জরিমানা আদায় করার ঘটনা বিরল। কারণ, ডিটিওর তদারকব্যবস্থা দুর্বল।
প্রস্তাবিত আইনে ‘সুপ্ত বাণিজ্য সংগঠন’ নামে একটি ধারা রাখা হয়েছে। বলা হয়েছে, লাইসেন্স নেওয়ার ছয় মাসের মধ্যে কার্যালয় স্থাপন না করলে, পরপর দুই বছর বার্ষিক সাধারণ সভা না করলে এবং পর পর দুই বছর নিরীক্ষা প্রতিবেদন ও রিটার্ন দাখিল না করলে সংগঠনকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হবে। জবাব সন্তোষজনক না হলে মহাপরিচালক ওই সংগঠনকে সুপ্ত বলে ঘোষণা করবেন। সংশোধনের সুযোগ দিয়েও কোনো অগ্রগতি না হলে ওই সংগঠনের লাইসেন্স বাতিল করতে সরকারের কাছে সুপারিশ করবেন মহাপরিচালক।
এত দিন লাইসেন্স নিতে কোনো মাশুল (ফি) দিতে হতো না। লাইসেন্স নবায়নও করতে হতো না। এখন বলা হয়েছে, সরকার নির্ধারিত মাশুল দিয়ে লাইসেন্স নিতে হবে এবং প্রতিবছর নবায়ন করতে হবে।
সার্বিকভাবে জানতে চাইলে বাংলাদেশ শিল্প ও বণিক সমিতি ফেডারেশনের (এফবিসিসিআই) সভাপতি মো. জসিম উদ্দিন প্রথম আলোকে বলেন, ‘প্রায় এক যুগ ধরে কাজ চলছে। আইনটি আসলে হওয়া দরকার। তবে এটির ৮০ শতাংশ ঠিক থাকলেও ২০ শতাংশ নিয়ে আপত্তি আছে ব্যবসায়ী সমাজের। কারণ, এতে নতুন করে লাইসেন্স মাশুল আরোপের কথা বলা হয়েছে, শুধু তা–ই নয়, লাইসেন্স নবায়নও করতে হবে। এ শর্ত ব্যবসাবান্ধব নয়।’
এফবিসিসিআই এখন কী করবে—এমন প্রশ্নের জবাবে জসিম উদ্দিন বলেন, ‘গত শনিবার আমরা সবাইকে নিয়ে বৈঠক করেছি। সংসদীয় কমিটির কাছে শিগগিরই আইনের অসংগতিগুলো নিয়ে একটা প্রতিবেদন পাঠানো হবে, যার অনুলিপি দেওয়া হবে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়কে।’
আরও কিছু নতুন ধারা
বর্তমানে পরিচালক বাণিজ্য সংগঠন (ডিটিও) সংগঠনগুলোকে লাইসেন্স দেন। তিনি যুগ্ম সচিব পদমর্যাদার কেউ। নতুন আইনে পদটিকে মহাপরিচালক (ডিজি) করা হচ্ছে। এর প্রস্তাব রাখা হয়েছে। মহাপরিচালক যুগ্ম সচিব পদমর্যাদারই কোনো সরকারি কর্মচারী হবেন বলে বলা হয়েছে। তবে সদ্য বিদায়ী পরিচালক সোলেমান খান ছিলেন একজন অতিরিক্ত সচিব।
নারী উদ্যোক্তা বা বিদেশে যাঁরা ব্যবসা করেন, এত দিন তাঁদের লাইসেন্স দেওয়া হলেও অধ্যাদেশে কোনো ধারা রাখা ছিল না। নতুন আইনে তাঁদের লাইসেন্স দেওয়ার বিষয়ে আলাদা ধারা রাখা হয়েছে।
বর্তমানে একই খাতের একাধিক লাইসেন্সধারী সংগঠন রয়েছে বলে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের নজরে এসেছে। এ প্রবণতা দূর করতে মহাপরিচালক থেকে নামের ছাড়পত্র নিতে হবে।
কোনো জটিলতা দেখা দিলে সংগঠনে এখন প্রশাসক বসানোর এখতিয়ার রয়েছে ডিটিওর। এখন বলা হয়েছে, মহাপরিচালক প্রশাসক বসাবেন এবং তাঁকে সহায়তা করার জন্য থাকবে একটি সহায়ক কমিটি।
মহাপরিচালককে আহ্বায়ক করে বাংলাদেশ শিল্প ও বণিক সমিতি ফেডারেশনের (এফবিসিসিআই) প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে যৌথ বাণিজ্য সংগঠন কার্যদল (জেটিডব্লিউসি) কমিটি নামে একটি কমিটি গঠনের বিধানও রাখা হয়েছে আইনে।
এফবিসিসিআইয়ের সভাপতির আপত্তির বিষয়গুলো সম্পর্কে বাণিজ্যসচিব তপন কান্তি ঘোষের দৃষ্টি আকর্ষণ করলে তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ‘তারা (এফবিসিসিআই) লিখিত কিছু পাঠাবেন বলে জানতে পেরেছি। সংসদীয় কমিটিতে যেহেতু আলোচনার কাজটি এখনো হয়নি, ফলে আইনে সংযোজন-বিয়োজনের সুযোগ আছে এখনো।’