আড়তে কাঁচা চামড়ার স্তূপ, বিক্রি নেই

যশোরের চামড়া ব্যবসায়ীরা গেল কোরবানির ঈদে কেনা কাঁচা চামড়া এখনো বিক্রি করতে পারেননি। ন্যায্য দাম না পেয়ে আড়তে ফেলে রেখেছেন। ঈদের প্রায় এক মাস পর এখন এসব চামড়া পচে যাওয়ার আশঙ্কা করছেন ব্যবসায়ীরা।
এই অবস্থায় বিরাট অঙ্কের লোকসান থেকে বাঁচাতে সরকারের কাছে ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন শঙ্কায় থাকা মাঝারি ও ক্ষুদ্র চামড়া ব্যবসায়ীরা।
শঙ্কায় দিন কাটাতে থাকা এমনই একজন রাজারহাটের ব্যবসায়ী শেখ সেলিম। সাড়ে পাঁচ শতাধিক গরুর চামড়ায় লবণ মাখিয়ে তা আড়তে
রেখে ট্যানারি মালিকদের সঙ্গে ঈদের পর থেকে দর-কষাকষি করে চলেছেন তিনি। জানান, ট্যানারি মালিকেরা চামড়ার যে দাম বলছেন, তার চেয়ে বেশি দামে তিনি মৌসুমি ব্যবসায়ীদের কাছ থেকেই চামড়া কিনেছেন। লাভের আশায় কিনে তা লোকসানে বেচবেন না দেখে অপেক্ষায় থেকে থেকে এত দিন পেরিয়ে গেছে।
এই ব্যবসায়ী জানান, পচনের আশঙ্কায় গত রোববার চামড়াগুলো ঢাকার মোকামে পাঠিয়ে দিয়েছেন। কিন্তু সেখানেও ন্যায্য দাম নেই। যে কারণে তিনি ওই চামড়া বেচতে পারেননি।
গতকাল শুক্রবার ব্যবসায়ী শেখ সেলিম প্রথম আলোকে বলেন, ‘এবার চামড়া কিনে চরম ধরা খেলাম। যশোরে চামড়া বেচতে পারিনি। ভেবেছিলাম, ঢাকাতে পাঠালে হয়তো চালান বাঁচবে। কিন্তু সেখানেও একই অবস্থা। দেখা চোখে লাখ টাকা লোকসান হচ্ছে। তাই ওই চামড়া ফিরিয়ে আনতে হচ্ছে।’
বিভিন্ন ব্যবসায়ীর সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, শুধু শেখ সেলিম নন, তাঁর মতোই অবস্থা দক্ষিণাঞ্চলের সবচেয়ে বড় চামড়ার মোকাম যশোরের রাজারহাটের অন্তত দেড় শ ক্ষুদ্র ও মাঝারি চামড়া ব্যবসায়ীর।
গতকাল রাজারহাটে সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেছে প্রায় প্রতিটি আড়তে লবণ মাখানো চামড়ার স্তূপ। ব্যবসায়ীরা আড়তের সামনে দুশ্চিন্তাগ্রস্ত হয়ে অলস বসে আছেন। আজ শনিবার হাটের দিন। তাই শ্রমিকদের দিয়ে চামড়া ধুয়ে লবণ মাখানোর কাজ করানো হচ্ছে।
চামড়া ব্যবসার বর্তমান অবস্থা সম্পর্কে জানতে চাইলে রাজারহাট চামড়া ব্যবসায়ী কল্যাণ সমিতির সাধারণ সম্পাদক আবদুল মালেক বলেন, ‘৪০ বছর ধরে আমি এই ব্যবসা করছি। এ সময়ের মধ্যে এবারসহ মোট তিনবার চামড়া ব্যবসায় ধস নামতে দেখলাম। এর আগে ২০০৮ ও ১৯৯৮ সালে এমনটি হয়েছিল।’
আবদুল মালেক বলেন, ‘আমরা এবার যে দামে চামড়া কিনেছি; ট্যানারি মালিক সিন্ডিকেট তার চেয়ে অর্ধেকের বেশি দাম বলেনি। যে কারণে এ মোকামের সব ব্যবসায়ী এবার লোকসানে পড়েছেন। অনেক ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী এনজিও থেকে ঋণ নিয়ে চামড়া কিনে লোকসানে পড়ে এখন কিস্তি পরিশোধের চিন্তায় পালিয়ে বেড়াচ্ছেন।’
যশোর সদর উপজেলার চাউলিয়া গ্রামের বাসিন্দা বিকাশ দাস একজন ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী। রাজারহাট মোকামে ব্যবসা করেন তিনি। জানান, ঈদের আগে ভালো ব্যবসার আশায় একটি এনজিও থেকে ৫০ হাজার টাকা ঋণ নিয়ে ৫০০ ছাগলের চামড়া কিনেছিলেন। ২৯ দিন ধরে চামড়া পড়ে আছে। ন্যায্য দাম না পেয়ে বেচতে পারেননি। ১০ দিন পরপর শ্রমিক দিয়ে লবণ মাখাতে হচ্ছে। ওই চামড়া যে ঘরে রাখা হয়েছে, সে ঘরের ভাড়া গুনতে হচ্ছে। এনজিওর কিস্তির টাকা দিতে পারছেন না। এখন চরম বিপদের মধ্যে আছেন।
রাজারহাট ব্যবসায়ী কল্যাণ সমিতি সূত্রে জানা গেছে, এই মোকামে দেড় শর মতো মাঝারি ও আড়াই শ ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী রয়েছেন। প্রায় সবাই এ বছর লোকসানে পড়েছেন। তাঁদের বাঁচাতে তাঁরা সরকারকে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন। এখন সে অপেক্ষাতেই দিন গুনছেন।