উত্থান-পতনেও শীর্ষে সিটি ও মেঘনা

.

নিত্যপণ্যের বাজারে প্রতিবছর ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের উত্থান-পতন হচ্ছে। কেউ বাজার থেকে সরছে। আবার কেউ ফিরছে বাজারে। তবে উত্থান-পতনেও বাজারে শীর্ষস্থান ধরে রেখেছে সিটি গ্রুপ। প্রতিবছর বাজারের আকার বাড়ার সঙ্গে বাজারে এই গ্রুপের অংশীদারত্বও বাড়ছে। বাজার দখলের এই ক্রমতালিকায় দ্বিতীয় ও তৃতীয় অবস্থানে আছে মেঘনা এবং এস আলম গ্রুপের নাম।
আমদানিনির্ভর প্রধান সাতটি পণ্য আমদানির তথ্য ধরে এই হিসাব করা হয়েছে। সরকারি-বেসরকারি তথ্য যাচাই করে শিল্পগোষ্ঠীভিত্তিক আমদানির এই ক্রমতালিকা তৈরি। সাতটি পণ্য হলো সয়াবিন তেল, পাম তেল, গম, চিনি, মসুর, মটর ও ছোলা ডাল। এসব পণ্যের কোনোটির উৎপাদন কম বা কোনোটি উৎপাদন না হওয়ায় কম-বেশি আমদানি করে চাহিদা মেটাতে হয়।
চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে আমদানির তথ্য যাচাই করে দেখা যায়, সদ্য শেষ হওয়া ২০১৫-১৬ অর্থবছরে বেসরকারি খাতে ১২৭টি ছোট-বড় শিল্পগোষ্ঠী ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের নামে এই সাতটি পণ্য আমদানির পরিমাণ ৮৫ লাখ টন। এসব পণ্য কার্যত আনা হয় চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে। ব্যবসায়ীদের ঘোষণা অনুযায়ী, আমদানি হওয়া ৮৫ লাখ টন পণ্যের দাম ৩২৬ কোটি ৫৩ লাখ মার্কিন ডলার। শুল্ক করসহ এসব পণ্য আমদানিতে খরচ পড়েছে প্রায় ২৯ হাজার কোটি টাকা।
আবার স্থানীয় বাজারে পণ্যের দাম হিসাব করে দেখা যায়, খুচরা ক্রেতা পর্যন্ত পৌঁছাতে এই সাতটি পণ্যের বাজারের আকার দাঁড়ায় আনুমানিক ৪০ হাজার কোটি টাকা। আমদানির পর পরিশোধন বা প্রক্রিয়াজাত হয়ে পরিবেশক বা পাইকারি ব্যবসায়ীদের হাত ঘুরে ক্রেতার হাতে পৌঁছায় এসব ভোগ্যপণ্য। তবে স্থানীয় বাজার থেকে ভোগ্যপণ্য সংগ্রহের মাধ্যমে প্রক্রিয়াজাত করে যারা বাজারজাত করছে, তাদের হিসাব এই ক্রমতালিকায় রাখা হয়নি।
হিসাব করে দেখা যায়, শীর্ষস্থানে থাকা সিটি গ্রুপের হাতে আছে বাজারের ২৫ শতাংশ। সাতটি পণ্যের মধ্যে প্রতিষ্ঠানটি গত অর্থবছর গম, সয়াবিন, পাম তেল, চিনি, মটর ও মসুর ডাল—ছয়টি পণ্য আমদানি করেছে ২১ লাখ টনের বেশি। শুল্কায়ন মূল্যে এর পরিমাণ ৫ হাজার ৭৭৬ কোটি টাকা। পাঁচ বছর ধরেই শীর্ষস্থান এ গ্রুপের হাতে। এ সময়ের ব্যবধানে প্রতিষ্ঠানটির আমদানির পরিমাণ বেড়েছে দ্বিগুণ। অপরিশোধিত আকারে আমদানি পণ্য পরিশোধনের জন্য গ্রুপটি ভোজ্যতেল, চিনি ও ময়দা কারখানায় বড় বিনিয়োগ রয়েছে।
সিটি গ্রুপের মহাব্যবস্থাপক বিশ্বজিত সাহা গতকাল বৃহস্পতিবার প্রথম আলোকে বলেন, ভোগ্যপণ্যের বাজারে পণ্যের দামে প্রতিনিয়ত উত্থান-পতন হয়। এ কারণে শুধু একটি পণ্যের ওপর নির্ভর না করে একাধিক পণ্যের বাজারজাত করলে এই বাজারে টিকে থাকা সহজ। সিটি গ্রুপ শুধু একাধিক পণ্য আমদানিই নয়, বিশ্বখ্যাত সরবরাহকারীদের কাছ থেকে পণ্য এনে প্রক্রিয়াজাত করে নিজস্ব ব্র্যান্ডে বাজারজাতও করছে। প্রতিদিন সাত থেকে আট হাজার টন পণ্য কারখানা থেকে সরবরাহ দেওয়া হচ্ছে।
বাজারে ২০ শতাংশ অংশীদারত্ব নিয়ে দ্বিতীয় স্থানে আছে মেঘনা গ্রুপ; যেটি গম, চিনি, সয়াবিন ও পাম তেল আমদানি করে নিজস্ব ব্র্যান্ডের নামে বাজারজাত করছে। গত অর্থবছর এই গ্রুপ ৫ হাজার ৪১০ কোটি টাকার ১৬ লাখ ৮৮ হাজার টন পণ্য আমদানি করে। বন্দরে বড় জাহাজভর্তি পণ্য আনার পর নিজেদের লাইটার জাহাজে পণ্য পরিবহন করে পরিশোধন কারখানায় নিচ্ছে তারা। এরপর নিজস্ব কারখানায় প্রক্রিয়াজাত করে বাজারজাত করছে গ্রুপটি।
মেঘনা গ্রুপের চেয়ারম্যান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোস্তফা কামাল প্রথম আলোকে বলেন, অল্প পরিমাণে পণ্য আমদানি করে বাজারে টিকে থাকা কঠিন। এ জন্য মেঘনা গ্রুপ বিশ্বখ্যাত সরবরাহকারীদের কাছ থেকে গুণগত মানের পণ্য আমদানি করে বাজারজাত করছে। বড় গ্রুপগুলো বেশি পরিমাণে আমদানি করায় বাজারে পণ্যের সরবরাহও ঠিক থাকছে বলে তিনি মন্তব্য করেন।
তালিকায় তৃতীয় অবস্থানে আছে চট্টগ্রামের এস আলম গ্রুপ। গ্রুপটির আমদানির তালিকায় আছে গম, চিনি, সয়াবিন ও পাম তেল। গত অর্থবছর গ্রুপটি ১১ লাখ ২৮ হাজার টন পণ্য আমদানি করে। এসব পণ্যের শুল্কায়ন মূল্য ছিল ৩ হাজার ৬৩ কোটি টাকা। পাঁচ বছর আগেও গ্রুপটি নিত্যপণ্যের বাজারে শীর্ষস্থানে ছিল।
এস আলম গ্রুপের চেয়ারম্যান সাইফুল আলম মাসুদ প্রথম আলোকে বলেন, ‘একসময় শীর্ষস্থানে থাকলেও মাঝে নানা শিল্পে বিনিয়োগ বাড়ানোর কারণে পণ্য আমদানির পরিমাণ হয়তো সেই হারে বাড়েনি। তবে এখন আবার ভোগ্যপণ্যের বাজারে আমদানির পরিমাণ বাড়াচ্ছি। আমদানি বাড়িয়ে বাজারে শীর্ষে থাকার লক্ষ্য আমাদের। এস আলম গ্রুপ চিনি ও তেলের শোধন কারখানায়ও বিপুল পরিমাণ বিনিয়োগ করেছে। আর আমদানি বাড়লে ভোক্তাদের জন্যই সুবিধা।’
বাজারে নতুন আসা বসুন্ধরা গ্রুপও ধীরে ধীরে ক্রমতালিকায় ওপরের দিকে উঠছে। তিন বছর আগে বসুন্ধরা ফুড অ্যান্ড বেভারেজ ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেডের নামে গম আমদানি করে ভোগ্যপণ্যের বাজারে আসে বসুন্ধরা গ্রুপ। প্রথমবারই ক্রমতালিকায় ১২ নম্বরে ওঠে বসুন্ধরার নাম। পরের বছর ৯ এবং সর্বশেষ ৭ নম্বরে আছে গ্রুপটির নাম। অবশ্য শুধু এক পণ্য আমদানিতেই সীমাবদ্ধ প্রতিষ্ঠানটি।
নতুন আসা এ প্রতিষ্ঠানের ওপরে আছে চট্টগ্রামের টিকে গ্রুপ ও বিএসএম গ্রুপের নাম। টিকে এখন চতুর্থ ও বিএসএম গ্রুপ পঞ্চম অবস্থানে রয়েছে ক্রমতালিকায়। টিকে গ্রুপ গম, মটর ডাল, সয়াবিন ও পাম তেল আমদানি করে বাজারজাত করছে। বিএসএম গ্রুপ আমদানি করছে গম, মটর, মসুর ও ছোলা।