চার নারীর উদ্যোক্তা হয়ে ওঠার গল্প

নারীদের নিয়েই এগিয়ে চলেছেন আছিয়া নীলা

১৯ নভেম্বর ছিল আন্তর্জাতিক নারী উদ্যোক্তা দিবস। উদ্যোক্তা হওয়ার যাত্রায় পিছিয়ে নেই এ দেশের নারীরাও। বিশেষ করে প্রযুক্তির কল্যাণে অনেক নারীই এখন ঘরে বসে উদ্যোক্তা হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছেন। নিজে কিছু করার স্বপ্ন থেকে কেউ যুক্ত হয়েছেন রন্ধনশিল্পের সঙ্গে। নানা পদের রান্নার রেসিপি দিয়ে আয় করছেন ঘরে বসে। আবার বিদেশের অভিজ্ঞতায় কেউ গড়ে তুলেছেন ভাগাভাগির অফিস বা কার্যালয় ব্যবসা। কেউ তৈরি করেছেন প্রশিক্ষণকেন্দ্র। আবার ঘরে বসেই মসলার জনপ্রিয় ব্র্যান্ডও তৈরি করে ফেলেছেন একজন। এ রকম চার নারীর উদ্যোক্তা হয়ে ওঠার গল্প নিয়ে এবারের আয়োজন।

কর্মীদের কাজ তদারক করছেন আছিয়া নীলা (দাঁড়ানো)
কর্মীদের কাজ তদারক করছেন আছিয়া নীলা (দাঁড়ানো)

ব্যবসায়ী আবুল খায়ের পাটোয়ারী এবং স্কুলশিক্ষিকা সৈয়দা তেহেরুন নাহার তাঁদের দুই মেয়ে ও এক ছেলেকে সমান স্নেহে বড় করেছেন। লক্ষ্মীপুরে রামগঞ্জ সরকারি বালিকা বিদ্যালয় ও রামগঞ্জ সরকারি কলেজ থেকে পাস করে তাঁদের বড় মেয়ে আছিয়া খালেদা। যদিও তিনি বেশি পরিচিত আছিয়া নীলা নামে। এরপর ভর্তি হন ঢাকার একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে। নীলা বলেন, ‘ক্লাস শুরুর প্রথম দিনেই বড় একটা ধাক্কা খাই। এদিক-ওদিক তাকিয়ে বুঝতে পারি, ক্লাসে আমি একাই মেয়ে।’ তবে শিক্ষক আর সহপাঠীদের সহযোগিতায় পরে এ নিয়ে আর মাথা ঘামাতে হয়নি তাঁকে। পড়ালেখা শেষ করে উদ্যোক্তা হয়ে ওঠা নীলার ‘উইমেন ইন ডিজিটাল’ নামের প্রতিষ্ঠানটি দেশে–বিদেশে তথ্যপ্রযুক্তি সেবা দেয়। প্রতিষ্ঠানটির উদ্যোক্তা ও প্রধান নির্বাহী আছিয়া নীলা। তাঁর প্রতিষ্ঠানের সব কর্মীই মেয়ে।

উদ্যোক্তা হিসেবে এখন দেশে-বিদেশে বেশ সুপরিচিত হলেও নীলা তাঁর কর্মজীবন উদ্যোক্তা হিসেবে শুরু করেননি। দ্বিতীয় বর্ষে পড়ার সময় একটি কাজের জন্য আবেদন করেই চাকরি পেয়ে যান। নীলা বলেন, ওই চাকরির মৌখিক পরীক্ষায় আমি দীর্ঘক্ষণ ধরে প্রশ্নের উত্তর দিচ্ছিলাম দেখে প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক জিজ্ঞেস করেছিলেন, ‘জীবনে আপনি কী হতে চান।’ উত্তরে তাঁর চেয়ার দেখিয়ে বলেছিলাম, ‘ওই চেয়ারে বসতে চাই।’ এমন জবাব শুনে তিনি উঠে গিয়ে নিজে আমার নিয়োগপত্র নিয়ে আসেন। এভাবে পড়া অবস্থাতেই আমার কর্মজীবন শুরু হয়ে যায়—বলেন নীলা। চাকরি শুরুর কয়েক বছরের মধ্যে নিষ্ঠা, অধ্যবসায় ও কর্মগুণে নীলা একটি তথ্যপ্রযুক্তি কোম্পানির প্রধান কারিগরি কর্মকর্তা পদে নিয়োগ পান। এরপর বিদেশে একটি বৃত্তির আবেদন করেন এবং পেয়েও যান।

এবার নীলার বিদেশযাত্রায় বাদ সাধেন তাঁর বাবা। তিনি নীলাকে বলেন, এই দেশের দুর্ভাগ্য হচ্ছে এখানকার প্রকৌশলীরা সবাই বিদেশে চলে যান। তুমিও যাবা। বাবা হিসেবে আমি বলব, এ দেশে কাজের ক্ষেত্র না পেলে নিজে সেটা বানিয়ে নাও।

বাবার কথা শুনে নীলা বিদেশে যাওয়ার চিন্তা ভুলে দেশে কী করা যায়, তা নিয়ে ভাবতে শুরু করেন। তত দিনে দেশে সরকারের ডিজিটাল বাংলাদেশ কর্মসূচি শুরু হয়েছে। নীলা দেখলেন, ডিজিটাল বাংলাদেশের আয়োজনে মেয়েদের জন্য বিশেষ কোনো কর্মসূচি নেই। নীলা তাই ২০১২ সালে শুরু করলেন ‘উইমেন ইন ডিজিটাল’। তথ্যপ্রযুক্তিতে মেয়েদের আগ্রহী করার পাশাপাশি তাদের সক্ষমতা বাড়িয়ে একুশ শতকের উপযোগী করে গড়ে তোলাই তাঁর প্রতিষ্ঠানের কাজ। গত ৯ বছরে সারা দেশে প্রায় ১২ হাজার নারীকে প্রশিক্ষিত করেছে নীলার ‘উইমেন ইন ডিজিটাল’। এর মধ্যে ৭ হাজার ৬৫৪ জন নারী বর্তমানে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে চাকরি করছেন। বাকিদের বড় অংশই ফ্রিল্যান্সার হিসেবে কাজ করছেন। ঢাকা, রামগঞ্জ, লক্ষ্মীপুর, কুড়িগ্রাম ও ময়মনসিংহের পাঁচটি কার্যালয় ছাড়া নেপালেও তাদের কার্যালয় রয়েছে।

উইমেন ইন ডিজিটাল পরিচালিত ডিজিটাল এজেন্সি লুমিনাডেভের নারী কর্মীরা যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, জাপান ও অস্ট্রেলিয়ার গ্রাহকদের জন্য ওয়েব অ্যাপ্লিকেশন, মোবাইল অ্যাপ্লিকেশন, গেমিং সফটওয়্যার তৈরির কাজ করেন। বর্তমানে তাঁরা ব্লক চেইন প্রযুক্তি নিয়েও কাজ করছে, পাশাপাশি নারীদের প্রযুক্তিতে প্রশিক্ষণ কর্মসূচি চালিয়ে যাচ্ছে উইমেন ইন ডিজিটাল। করোনাকালেও ৫০০ নারীকে বিনা মূল্যে প্রশিক্ষণ দিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। ২০১৫ সালে দেশে প্রথম নারীদের জন্য উইমেন অ্যাকসেলেটর কর্মসূচি চালু করে। ২০১৭ দক্ষিণ এশিয়ায় প্রথমবারের মতো ন্যাশনাল ওমেন হ্যাকাথন ফর উইমেন আয়োজন করে। এ ছাড়া ই-কমার্স, সাইবার সিকিউরিটি, অ্যাগ্রোটেক, ডিজিটাল হেলথ নিয়েও কাজ করছেন নীলা। এ পর্যন্ত দেশে-বিদেশে ৩৮টি পুরস্কার জিতেছে নীলার প্রতিষ্ঠান। মোহাম্মদপুরের কার্যালয় থেকে নীলার সঙ্গে কথা বলে বিদায় নেওয়ার সময় আত্মপ্রত্যয়ী নীলা বলেন, ‘দেশের ৫০ শতাংশ নারী যেন প্রযুক্তি খাতে নিজেদের অবস্থান তৈরি ও ধরে রাখতে পারে, সে জন্য আগামী দিনগুলোতে কাজ করে যাব।’