
নিজের একটা পরিচয় দরকার—এই তাগিদ থেকেই শুরু হয়েছিল যশোরের সানজিদা খাতুনের লড়াই। পরিবারে অভাব ছিল না, বাবা কিংবা স্বামীর কাছে চাওয়ামাত্রই মিলে যেত সব। কিন্তু সানজিদার মন বলছিল, নিজের উপার্জনে বাঁচার আত্মতৃপ্তি অন্য কোথাও নেই। সেই ভাবনা থেকেই মাত্র ২ হাজার ২০০ টাকা মূলধন নিয়ে ২০২২ সালের নভেম্বরে শুরু হয় তাঁর অন্য রকম এক যুদ্ধ।
শুরুর পথটা মসৃণ ছিল না। সামাজিকভাবে কে কী ভাববে—সেই দ্বিধা থেকে পরিচয় গোপন রাখতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে ছদ্মনামে আইডি ব্যবহার করেন সানজিদা খাতুন। ‘ফারহানা জামান’ নামের সেই ছদ্মবেশী আইডি দিয়েই যুক্ত হন যশোরের স্থানীয় ‘আগামী উদ্যোক্তা’ নামের অনলাইন প্ল্যাটফর্মে। মায়ের কাছ থেকে নেওয়া সামান্য টাকায় ঘরে তৈরি ঢেঁকিতে ছাঁটা আতপ চালের গুঁড়া, খাঁটি হলুদ ও শুকনা মরিচের গুঁড়া—মাত্র এ তিনটি পণ্য দিয়ে শুরু হয় তাঁর অনলাইন কেনাবেচা; সঙ্গে যুক্ত করেন ঘি ও মধু।
লুকিয়ে শুরু করা সেই কাজ বেশি দিন আড়ালে থাকেনি। তবে বাধা নয়, পরিবার থেকে এল অভাবনীয় সাড়া। বিষয়টি জানার পর পরিবারের সদস্যরা সানজিদাকে স্পষ্ট জানিয়ে দেন, ‘কাজটি সম্মানের। লুকিয়ে কেন? নিজের নামেই শুরু করো, আমরা পাশে আছি।’
পরিবারের এমন সমর্থন সানজিদার আত্মবিশ্বাস এক ধাক্কায় বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়। ফেক আইডির খোলস ছেড়ে বের হয়ে আসেন তিনি। আত্মপ্রকাশ ঘটে ‘সানজিদা’স শপ’–এর। ছদ্মবেশ ছেড়ে নিজের নামেই শুরু হয় এক নতুন অধ্যায়।
ব্যবসাকে টেকসই ও মানসম্মত করতে এরপর সানজিদা মনোযোগ দেন দক্ষতা উন্নয়নে। ‘আগামী উদ্যোক্তা’ প্ল্যাটফর্ম থেকে পণ্য প্যাকেজিং ও অনলাইন বিপণনের কৌশল শেখার পর তিনি কৃষি বিপণন অধিদপ্তরের ১১ দিনের প্রশিক্ষণে অংশ নেন। সেখান থেকে হিসাবরক্ষণ, ফুড সেফটি, ব্যাংকঋণ ও ব্যবসা পরিচালনার প্রাতিষ্ঠানিক জ্ঞানার্জন করেন।
মাত্র পাঁচটি পণ্য নিয়ে শুরু করা ‘সানজিদা’স শপ’–এ এখন শোভা পাচ্ছে ৪০টির বেশি ধরনের নিরাপদ ও হোমমেড খাদ্যপণ্য। যশোর পৌরসভা থেকে পাওয়া ট্রেড লাইসেন্স নিয়ে পরিচালিত এই প্রতিষ্ঠানের মাসিক গড় বিক্রি ৬৫ থেকে ৭০ হাজার টাকা।
এখন সানজিদা শুধু নিজের খরচই চালান না, মা–বাবার হাতেও তুলে দেন টাকাপয়সা। স্বামী খরচের টাকা দিতে চাইলেও সানজিদা স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন নিজের কষ্টার্জিত আয়ে পথ চলতে।
ভবিষ্যতে নিজের প্রতিষ্ঠানকে দেশের অন্যতম জনপ্রিয় ফুড ব্র্যান্ড হিসেবে গড়ে তোলার স্বপ্ন দেখছেন এই তরুণী।
নতুন উদ্যোক্তাদের উদ্দেশে সানজিদা খাতুন বলেন, ‘অর্থনৈতিকভাবে সচ্ছল হলেও একজন নারীর নিজস্ব পরিচয়ের প্রয়োজন রয়েছে। শুরুটা ছোট হলেও ভয় না পেয়ে নিজের নামে শুরু করা উচিত। কারণ, নিজের উপার্জন শুধু টাকা নয়, আত্মমর্যাদার শক্তি দেয়।’
সানজিদা খাতুনের এগিয়ে চলার বিষয়ে জানতে চাইলে কৃষি বিপণন অধিদপ্তর যশোরের সিনিয়র কৃষি বিপণন কর্মকর্তা কিশোর কুমার সাহা প্রথম আলোকে বলেন, ‘নারী উদ্যোক্তা হিসেবে সানজিদা অনেক ভালো করছে। ব্যবসা পরিচালনার জন্য তার মতো অনেক উদ্যোক্তাকে প্রশিক্ষণ ও উপকরণ সরবরাহ করা হয়েছে। প্রশিক্ষণ নেওয়ার আগে সানজিদা যেভাবে ব্যবসা পরিচালনা করত, এখন তার ইতিবাচক অনেক পরিবর্তন এসেছে।’
সানজিদার পণ্য মূলত অনলাইনেই বিক্রি হয়। ব্যাংক কর্মকর্তা সাদিয়া তামান্না তিন বছর ধরে সানজিদার কাছ থেকে নারকেল তেল, ঘি, মধুসহ বিভিন্ন ধরনের পণ্য অনলাইনে অর্ডার করে কেনেন।
সাদিয়া তামান্না বলেন, ‘সানজিদা সব পণ্য নিজের হাতে তৈরি করেন। অন্যদের চেয়ে বিশ্বাসযোগ্যতা একটু বেশি। এ জন্য আমি তিন থেকে চার বছর ধরে বিভিন্ন ধরনের পণ্য অনলাইনে ও মুঠোফোনে অর্ডার দিই। পরে সেগুলো আমার বাড়িতে পৌঁছে দেওয়া হয়।’
সানজিদা খাতুন যশোর শহরের বকচর এলাকার বাসিন্দা। নিজের বাড়িতেই তিনি এসব খাদ্যপণ্য উৎপাদন করেন।