
করোনায় বিপর্যস্ত কুটির, ক্ষুদ্র, ছোট ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের (সিএমএসএমই) ঘুরে দাঁড়াতে ২০ হাজার কোটি টাকা তহবিল ঘোষণা করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। তবে সুদহার ৯ শতাংশ নির্দিষ্ট করে দেওয়ায় এই তহবিল থেকে কুটির, ক্ষুদ্র ও ছোট উদ্যোক্তারা চাহিদামতো ঋণ পাচ্ছেন না। কারণ, এসব ঋণে খরচ অনেক বেশি। তাই ব্যাংকগুলো আগ্রহী না।
এখন এসব ঋণের নিরাপত্তা সঞ্চিতির হার কমিয়ে দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এতে ব্যাংকগুলোকে আগের চেয়ে অনেক কম নিরাপত্তা সঞ্চিতি রাখতে হবে, ফলে বাড়বে মুনাফা। এর মাধ্যমে এই খাতে ঋণ বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক।
পাশাপাশি কুটির, ক্ষুদ্র ও ছোট উদ্যোক্তাদের ঋণ বিভিন্ন মানে খেলাপি হওয়ার সময় ৩ মাস থেকে ১৮ মাস পর্যন্ত বাড়িয়ে দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এর ফলে এসব উদ্যোক্তা আগের চেয়ে ঋণ পরিশোধে বেশি সময় পাবেন। এর মাধ্যমে ব্যাংক ও উদ্যোক্তা—দুই পক্ষকেই সুবিধা দেওয়ার চেষ্টা করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক।
সরকারে শিল্পনীতির ঘোষণা অনুযায়ী, ২০২৪ সালের মধ্যে কুটির, ক্ষুদ্র ও ছোট উদ্যোক্তাদের মধ্যে ২৫ শতাংশ ও মাঝারিদের মধ্যে ২৫ শতাংশ ঋণ দিতে চায় বাংলাদেশ ব্যাংক। এ ছাড়া করোনায় ক্ষতিগ্রস্তদের ঘুরে দাঁড়াতে ঋণ দিতে চায়।
এসব করেও সিএমএসএমই খাতে ঋণ বাড়ানো নিয়ে সন্দিহান অর্থনীতিবিদ ও ব্যাংকগুলো। পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের নির্বাহী পরিচালক আহসান এইচ মনসুর প্রথম আলোকে বলেন, এসব করে ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের ঋণ বাড়ানো যাবে না। মূল সমস্যা ঋণঝুঁকি ও সুদহার নিয়ে। সুদহার ৯ শতাংশ রেখে ঋণে গ্যারান্টি দিলে ঋণ বাড়ত। অন্য উপায় ছিল, ব্যাংকগুলোকে সুদ–ভর্তুকি দেওয়া। ব্যাংকগুলোর কী সমস্যা, তা কেন্দ্রীয় ব্যাংক শুনতে পারত। আলোচনা ছাড়াই সিদ্ধান্ত নিলে কারও উপকার হয় না।
বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রজ্ঞাপনে বলা হয়েছে, কুটির, ক্ষুদ্র ও ছোট উদ্যোক্তাদের চলমান, তলবি ও মেয়াদি ঋণের কিস্তি মেয়াদ শেষ হওয়ার ছয় মাস পর্যন্ত পরিশোধ না করা হলে তা নিম্নমান (এসএস) ঋণ হিসেবে চিহ্নিত হবে। এই ঋণ ১৮ মাস পর্যন্ত এসএস হিসেবে থাকবে। আগে ঋণ তিন মাসে শোধ না করলেই এসএসএস হিসেবে চিহ্নিত হতো।
একইভাবে ঋণের কিস্তির মেয়াদ শেষ হওয়ার ১৮ মাস পর্যন্ত পরিশোধ না করা হলে তা সন্দেহজনক হিসেবে চিহ্নিত হবে। এই ঋণ ৩০ মাস পর্যন্ত সন্দেহজনক হিসেবে থাকবে। আগে ঋণ নয় মাস শোধ না করলেই সন্দেহজনক হিসেবে চিহ্নিত হতো।
আবার ঋণের কিস্তির মেয়াদ শেষ হওয়ার ৩০ মাস অতিক্রম করলে তা মন্দ/ক্ষতিজনক মানে চিহ্নিত হবে। আগে ১২ মাস হলেই ঋণ ক্ষতিমানে চিহ্নিত হতো। আবার মেয়াদি ঋণ পরিশোধে ছয় মাস পর্যন্ত বাড়তি সময় পাওয়া যায়।
এদিকে ব্যাংকগুলোর খরচ কমাতে নিরাপত্তা সঞ্চিতির হার কমিয়ে দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। নিরাপত্তা সঞ্চিতি রাখতে হয় ব্যাংকগুলোর মুনাফা থেকে। আগে নিম্নমানের ঋণের বিপরীতে ২০ শতাংশ সঞ্চিতি রাখতে হতো, এখন তা কমিয়ে ৫ শতাংশ করা হয়েছে। সন্দেহজনক ঋণে সঞ্চিতি ৫০ শতাংশ থেকে কমিয়ে ২০ শতাংশ করা হয়েছে। আগের মতোই মন্দ/ক্ষতিজনক ঋণে ১০০ শতাংশ ও অশ্রেণীকৃত ঋণে দশমিক ২৫ শতাংশ নিরাপত্তা সঞ্চিতি বহাল রাখা হয়েছে।
ব্র্যাক ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) সেলিম আর এফ হোসেন এখনই এ নিয়ে কথা বলতে আগ্রহী না। তবে দ্য সিটি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মাসরুর আরেফিন প্রথম আলোকে বলেন, এসএমই খাতের মূল সমস্যা সুদহার। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সুবিধার ফলে ব্যাংকের আর্থিক স্বাস্থ্য কিছুটা ভালো হতে পারে। তবে মূল সমস্যার সমাধান হবে না।
করোনায় ক্ষতিগ্রস্ত কুটির, ক্ষুদ্র, ছোট ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের (সিএমএসএমই) চলতি মূলধন সুবিধার জন্য ২০ হাজার কোটি টাকা তহবিল গঠন করা হয়। এ ঋণের সুদহার ৯ শতাংশ, তবে গ্রাহকদের দিতে হচ্ছে ৪ শতাংশ। বাকি ৫ শতাংশ সরকার ভর্তুকি হিসেবে দিচ্ছে। তবে সুদহার ৯ শতাংশ বেঁধে দেওয়ায় এই তহবিল থেকে মাত্র ৫১৮ কোটি টাকা বিতরণ হয়েছে।