কর্মসংস্থানের অবস্থা বেশি খারাপ হয়েছে ২০১৩ সালের পর

একটা জায়গায় এসে থেমে গেছে পোশাক খাত

দেশে কর্মসংস্থান তৈরিতে পোশাক খাত একটা জায়গায় এসে থেমে গেছে। বিশেষ করে, ২০১০ সালের পর থেকে কর্মসংস্থান তৈরির ক্ষেত্রে খাতটি আর আগের মতো ভূমিকা রাখতে পারছে না। অবস্থা বেশি খারাপ হয়েছে ২০১৩ সালের পর থেকে।
বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) সম্প্রতি প্রকাশিত ‘বাংলাদেশে শ্রম বাজার এবং দক্ষ মানবসম্পদের ঘাটতি’ শীর্ষক গবেষণা প্রতিবেদনে এ কথা বলা হয়েছে। প্রতিবেদনটি করা হয় অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থ বিভাগের ‘কর্মসংস্থান বিনিয়োগ কর্মসূচির জন্য দক্ষতা (এসইআইপি)’ শীর্ষক কর্মসূচির আওতায়।
কর্মসংস্থান তৈরিতে পোশাক খাতের অবদান নিয়ে ১৯৯০ থেকে ২০১৫ পর্যন্ত ২৫ বছরের একটি চিত্র তুলে ধরা হয়েছে প্রতিবেদনে। বলা হয়, ২৫ বছর আগে ১৯৯০ সালে পোশাক খাতে কর্মসংস্থান হয় ৫ লাখের মতো লোকের। আর ২০১৫ সালে কর্মসংস্থান হয় ৪০ লাখ লোকের, যার বড় অংশই নারী। তবে এই সময়ে একই গতিতে কর্মসংস্থানের প্রবৃদ্ধি হয়নি।
বলা হয়েছে, ১৯৯০-৯৫ সময়ে কর্মসংস্থান তৈরিতে পোশাক খাতের বার্ষিক প্রবৃদ্ধি ছিল ২৯ দশমিক শূন্য ৭ শতাংশ। কিন্তু পরের পাঁচ বছরে অর্থাৎ ১৯৯৫-২০০০ সময়ে প্রবৃদ্ধি নেমে দাঁড়ায় ৫ দশমিক ৯২ শতাংশে। ২০০০-০৫ সময়ে আরও কমে হয় ৪ দশমিক ৫৬ শতাংশ।
তবে ২০০৫-১০ সময়ে এ প্রবৃদ্ধি আবার ঘুরে দাঁড়ায়। এই পাঁচ বছরে বার্ষিক প্রবৃদ্ধি বেড়ে দাঁড়ায় ১১ দশমিক ৫০ শতাংশ। ২০১০ সালের পর থেকে কর্মসংস্থান তৈরিতে পোশাক খাতের বার্ষিক প্রবৃদ্ধি উল্লেখযোগ্য হারে কমে নেমে আসে ১ দশমিক শূন্য ২ শতাংশে।
বাংলাদেশ তৈরি পোশাক উৎপাদক ও রপ্তানিকারক সমিতির (বিজিএমইএ) সভাপতি সিদ্দিকুর রহমান গ্যাস-বিদ্যুতের সংকটে নতুন কারখানা গড়ে না ওঠাকে পোশাক খাতে কর্মসংস্থান তৈরির প্রবৃদ্ধি কমার অন্যতম কারণ বলে চিহ্নিত করেন।
সিদ্দিকুর রহমান প্রথম আলোকে বলেন, ‘কী বলব, একদিকে পোশাকের বিশ্ব চাহিদা কমে গেছে, অন্যদিকে কমে গেছে দাম। নতুন কারও পক্ষে কারখানা করে এখন মুনাফা অর্জন সত্যিই কঠিন। ফলে খুবই স্বাভাবিক যে কর্মসংস্থান তৈরিতে এ খাতের অবদান কমবে এবং আরও কমার শঙ্কা রয়েছে।’
পোশাক খাত কীভাবে দেশের প্রধান রপ্তানি আয়ের উৎস হয়ে উঠল—তারও একটা চিত্র তুলে ধরা হয়েছে প্রতিবেদনে। বলা হয়, ১৯৮৪ সালে দেশের মোট রপ্তানি আয়ে পোশাক খাতের অবদান ছিল মাত্র ৩ দশমিক ৮৯ শতাংশ। ছয় বছরের ব্যবধানে ১৯৯০ সালে রপ্তানি আয়ে এ খাতের অবদান বেড়ে দাঁড়ায় ৩২ দশমিক ৪৫ শতাংশ। এরপর ২০ বছরের ব্যবধানে রপ্তানি আয়ে পোশাক খাতের অবদান ২০১০ সালে ৭৫ দশমিক ৬১ শতাংশ এবং ২০১৬ সালে দাঁড়ায় ৮২ দশমিক শূন্য ৫ শতাংশে।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, নব্বইয়ের দশকের প্রথম পাঁচ বছরে পোশাক খাতের কর্মসংস্থান প্রবৃদ্ধিটা ভালো হলেও এর পরের ১০ বছরে গতিটা নিম্নমুখী হয়। তবে ২০০৫-১০ সময়ে এ গতি আগের ১০ বছরের তুলনায় ঊর্ধ্বমুখীই হয়নি শুধু, প্রায় দ্বিগুণ বেড়ে যায়। গতিটা একটা জায়গায় এসে আটকে যায় ২০১০ সালের পরে এবং সবচেয়ে খারাপ অবস্থা দাঁড়ায় ২০১৩-১৫ সময়ে।
যে পোশাক খাতকে কর্মসংস্থান তৈরির প্রধান উৎস হিসেবে ভাবা হয়, নীতিনির্ধারকেরা নিশ্চয়ই এ খবরে হতাশ হবেন বলে মন্তব্য করা হয় প্রতিবেদনে।
প্রতিবেদনে ২০০৫-১০ সময়ের প্রবৃদ্ধিকে ‘উল্লেখযোগ্য’ বলে উল্লেখ করা হয়েছে। কারণ, এই সময়টা হচ্ছে ২০০৫ সালে মাল্টি ফাইবার অ্যারেঞ্জমেন্টের (এমএফএ) আওতায় কোটাপ্রথা বাতিল হওয়ার পরের সময়। অনেকের আশঙ্কা কাটিয়ে এই সময়ে পোশাক খাত নিজের অবস্থান বরং আরও পোক্ত করেছে।
জেনারেল অ্যাগ্রিমেন্ট অন ট্যারিফ অ্যান্ড ট্রেডের (গ্যাট) টেক্সটাইল কমিটির অধীনে উন্নয়নশীল দেশগুলোর বাণিজ্য ঘাটতি পূরণে ১৯৭৪ সালে এমএফএ নামে একটা নীতি করা হয়। ১৯৯৫ সালে বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থা (ডব্লিউটিও) গঠিত হওয়ার পর নীতিটির মেয়াদ বাড়ে ২০০৫ পর্যন্ত। এই নীতির আওতায় শুল্ক ছাড়সহ উন্নত দেশে পণ্য রপ্তানিতে উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য কোটা বেঁধে দেওয়া হয়। তখন এই সুযোগটিই কাজে লাগায় বাংলাদেশ।
মূলত সস্তা শ্রমের সুযোগে দেশের পোশাক খাত যত দূর সম্ভব প্রতিযোগিতাসক্ষম হয় বলে বিআইডিএসের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। বলা হয়, ভবিষ্যতে সস্তা শ্রমের ওপর নির্ভর করে আর এগোনো সম্ভব হবে না। সরকারঘোষিত ৫০ বিলিয়ন ডলারের (পাঁচ হাজার কোটি ডলার বা চার লাখ কোটি টাকা) রপ্তানি লক্ষ্য পূরণ করতে গেলে তা আরও অসম্ভব হয়ে উঠবে। এ জন্য যে দক্ষ শ্রমশক্তির দরকার পড়বে, তা পাওয়াও একটা বড় চ্যালেঞ্জ।
মুক্তিযোদ্ধা এম নূরুল কাদের (দেশের প্রথম সংস্থাপন সচিব) ১৯৭৭ সালে প্রথম কোরিয়ার দাইয়ু কোম্পানির সঙ্গে যৌথভাবে গড়ে তোলেন রপ্তানিমুখী কারখানা দেশ গার্মেন্টস। দেশ গার্মেন্টসকেই পোশাক খাতের অগ্রগামী উদ্যোগ বলা হয়। পরের বছরই রপ্তানিমুখী কারখানা গড়ে ওঠে ৯টি। বিজিএমইএর হিসাবে বর্তমানে কারখানা ৪ হাজার ৩২৮টি।
বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) গবেষণা পরিচালক খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম প্রথম আলোকে বলেন, পোশাক খাতে কর্মসংস্থান প্রবৃদ্ধি কমে যাওয়ার আলোচনার সঙ্গে উৎপাদনশীলতার প্রবৃদ্ধিকেও রাখতে হবে। ২৫ বছরের মধ্যে ব্যতিক্রম দেখা গেছে শেষ পাঁচ বছরে (২০১০-১৫)। এই সময়ে উৎপাদনশীলতার প্রবৃদ্ধি বেশি বেড়েছে। এর কারণও আছে। এই সময়ে শ্রমিকদের দক্ষতা বেড়েছে ও কারখানায় উন্নত প্রযুক্তির ব্যবহার বেড়েছে।
উৎপাদনশীলতার ব্যাখ্যা দিয়ে গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, ‘একজন শ্রমিক ১৯৯৫ সালে উৎপাদন করতে পারতেন ১ হাজার ৮৫৬ ডলারের পণ্য, আর ২০১৫ সালে উৎপাদন করেন ৬ হাজার ৬৭৩ ডলারের পণ্য।’ কারখানায় আরও উন্নত প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়লে কর্মসংস্থান তৈরিতে পোশাক খাতের প্রবৃদ্ধি আরও কমবে বলে শঙ্কা তাঁর।