
মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে বাজেটে তিন ধরনের পদক্ষেপ নেওয়া যেতে পারে। এগুলো হলো সরবরাহ ব্যবস্থাপনার উন্নতি করা, চাহিদার চাপ কমানো ও গরিব মানুষের জীবিকার সংকট মোকাবিলায় পদক্ষেপ নেওয়া। আর ডলারের সংকট কাটাতে এর দর বাজারের ওপর ছেড়ে দেওয়াই সর্বোত্তম বিকল্প, যা ইতিমধ্যে কেন্দ্রীয় ব্যাংক করেছে।
প্রথমেই আসি সরবরাহ ব্যবস্থাপনায় কী করা উচিত, সে প্রসঙ্গে। আন্তর্জাতিক বাজারে বিভিন্ন পণ্যের মূল্যবৃদ্ধির কারণে ইতিমধ্যে মূল্যস্ফীতি বেড়েছে। বাজারে পণ্যের সরবরাহব্যবস্থায় যেন বিঘ্ন না ঘটে, সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে। দেশের প্রধান আমদানি পণ্যগুলোর অন্যতম হলো সার, ডিজেল, এলএনজি, গম, ভোজ্যতেল। এসব প্রায় শতভাগ আমদানিনির্ভর পণ্য। এর বেশির ভাগই সরকারি সংস্থা আমদানি করে যেমন, সার, ডিজেল ও এলএনজি। এ জন্য সরকার বাজেটে বরাদ্দ রাখে। ভর্তুকি বরাদ্দও রাখে। কিন্তু আমলাতান্ত্রিক জটিলতার কারণে অনেক সময় অর্থ মন্ত্রণালয় থেকে সময়মতো অর্থ ছাড় করতে পারে না সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো। অর্থায়নের ঘাটতির কারণে যেন আমদানি আটকে না যায়, সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে। আমদানি কমে গেলে উৎপাদন ব্যাহত হবে।
আবার সংস্থাগুলো সরকারি অর্থায়নের মুখাপেক্ষী না হয়ে আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে সংগতি রেখে সার, ডিজেলের দাম সমন্বয় করার উদ্যোগ নিতে পারে। আন্তর্জাতিক বাজারে এসব পণ্যের দাম বাড়লে স্থানীয় বাজারেও দাম বাড়বে। এতে অবশ্য বিদ্যুৎ, কৃষিপণ্যসহ বিভিন্ন পণ্যের দাম বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা আছে, যা মূল্যস্ফীতি উসকে দিতে পারে। সার্বিকভাবে সরবরাহ ব্যবস্থাপনা নিয়ে একধরনের টানাপোড়েন আছে। এ নিয়ে সরকারের অবস্থা উভয়সংকটের মতো। এ দুটির মধ্যে ভারসাম্য রেখে পদক্ষেপ নেওয়া উচিত।
দ্বিতীয়ত, চাহিদার চাপ কমানো; এ জন্য চলতি অর্থবছরে বাজেট ঘাটতি যত হবে, আগামী বছরেও যেন এর চেয়ে না বাড়ে। তৃতীয়ত, মূল্যস্ফীতির চাপ সবচেয়ে বেশি কাদের ওপরে পড়ে, তা দেখতে হবে। সবচেয়ে বেশি মূল্যস্ফীতির চাপ অনুভব করেন গরিব মানুষ। এটি তাঁদের জীবিকার সংকট। আর মধ্যবিত্তের জন্য সঞ্চয়ের সংকট। কারণ, তাঁরা মূল্যস্ফীতি বাড়লে সঞ্চয় ভেঙে খান। আর বড়লোকের কাছে তা জীবিকা বা সঞ্চয়ের সংকট নয়, তাঁদের কাছে এটি বিরক্তির কারণ। দাম বাড়লে তাঁরা বিরক্ত হন। তাই বাজেটে সামাজিক সুরক্ষা কার্যক্রমে গরিব মানুষের জন্য ভাতা ও আওতা দুটোই বৃদ্ধি করতে হবে। যেমন, এখন যে প্রাথমিক শিক্ষাবৃত্তি দেওয়া হয়, তা সরাসরি ব্যাংক হিসাবে চলে যায়। এখনো গরিব শিক্ষার্থীদের প্রতি পাঁচজনে দুজন টাকা পায়। বাকি তিনজনকে দিতে পারলে ওই পরিবারের সাশ্রয় হবে। আবার বয়স্ক ভাতার মতো অন্যান্য ভাতার পরিমাণ ও আওতা বাড়ানো উচিত। আর শহরের নতুন গরিবদের জন্য নতুন কর্মসূচি নিতে হবে।
মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে ডলারের দাম স্থিতিশীল রাখতে হবে। আমদানি নিরুৎসাহিত করে ডলারের ওপর চাপ কমাতে বাজেটের পদক্ষেপ হিসেবে বিলাসপণ্যে অতিরিক্ত শুল্ক-কর বসানো যেতে পারে। আবার দেশীয় অর্থায়নে আমদানিনির্ভর অপেক্ষাকৃত কম প্রকল্পের আপাতত লাগাম টানা যেতে পারে।
ডলারের চাহিদা ও জোগানের মধ্যে ভারসাম্য না থাকায় সংকট বেড়েছে। ডলারের দাম বৃদ্ধির কারণে কয়েকটি ব্যাংক ঋণপত্র বা এলসি নিষ্পত্তি করতে পারেনি। এর ফলে বিদেশি ব্যাংক মনে করতে পারে, ডলার–সংকটের কারণে বাংলাদেশ এলসি নিষ্পত্তি করতে পারছে না, যা ভাবমূর্তির জন্য ক্ষতিকর। এ অবস্থায় বাজারের ওপর ডলারের দাম ছেড়ে দেওয়ার বিকল্প ছিল না। এখন চাহিদা ও জোগানের মধ্যে একধরনের ভারসাম্য তৈরি হবে। ডলারের দাম ৯৪, ৯৫ কিংবা ৯৭ টাকায় গিয়ে স্থিতিশীল হবে। বেশি দামের কারণে কম প্রয়োজনীয় পণ্য আমদানি নিরুৎসাহিত হলে ডলার সাশ্রয়ী হবে। আবার ডলারের অন্যতম জোগানদাতা প্রবাসীরা ব্যাংকিং চ্যানেলে অর্থ পাঠাতে উৎসাহিত হবেন। ডলারের দাম বাজারের ওপর ছেড়ে দিলে তা অর্থনীতিতে হঠাৎ ধাক্কা সামলানোর মতো কাজ করে।