
তিন শূন্যের লক্ষ্য পূরণ করে পৃথিবীকে বদলে দেওয়ার স্বপ্ন দেখছেন সামাজিক ব্যবসা ধারণার প্রবক্তা ও শান্তিতে নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ ড. মুহাম্মদ ইউনূস। তাঁর মতে, এ তিন শূন্যের লক্ষ্য পূরণ হলে পৃথিবী হবে দারিদ্র্য, বেকারত্ব আর পরিবেশ ঝুঁকিমুক্ত। গত বুধবার জার্মানির বার্লিনে সপ্তম বৈশ্বিক সামাজিক ব্যবসা সম্মেলনের উদ্বোধনী বক্তব্যে তিনি এ স্বপ্নের কথা বলেন।
অসুস্থতার কারণে সশরীরে উপস্থিত থাকতে না পারায় ভিডিও বার্তার মাধ্যমে তিনি তাঁর উদ্বোধনী বক্তব্য দেন। সম্মেলনে অংশ নেওয়া পৃথিবীর ৭০টি দেশের আট শতাধিক প্রতিনিধি পিনপতন নীরবতায় মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে শোনেন ইউনূসের এ বার্তা।
ড. ইউনূস পৃথিবীকে যে তিন শূন্যের লক্ষ্য পূরণের স্বপ্ন দেখাচ্ছেন সেগুলো হলো শূন্য দারিদ্র্য, শূন্য বেকারত্ব ও শূন্য কার্বন নিঃসরণ। এ তিন লক্ষ্য পূরণ হলে জাতিসংঘ-ঘোষিত টেকসই উন্নয়ন বা এসডিজির লক্ষ্যগুলোও পূরণ হয়ে যাবে বলে অভিমত ইউনূসের। তিনি বলেন, ‘সম্প্রতি জাতিসংঘ সারা পৃথিবীর জন্য এসডিজির যেসব লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে, সেগুলোকে শুধু জাতিসংঘের লক্ষ্য ভাবলে চলবে না। এগুলো কোনো সংস্থার বা দেশের একার লক্ষ্য নয়। এগুলো আমাদের লক্ষ্য, আমাদের প্রত্যেকের নিজ নিজ জীবনের প্রয়োজনে এসব লক্ষ্য পূরণ করতে হবে। আর তাতে সামাজিক ব্যবসা বড় ভূমিকা রাখতে পারে। কারণ, সমাজের সমস্যা দূর করাই সামাজিক ব্যবসার মূল লক্ষ্য।’
বার্লিনের টেম্পলহোপ নামের পুরোনো অব্যবহৃত এক বিমানবন্দরে এবারের সম্মেলনের আয়োজন করা হয়। যেখানে এ সম্মেলনটি অনুষ্ঠিত হচ্ছে, তার অদূরেই খোলা হয়েছে শরণার্থী শিবির। যেখানে প্রাণ বাঁচাতে যুদ্ধবিধ্বস্ত সিরিয়া থেকে আসা শরণার্থীদের আশ্রয় দেওয়া হয়েছে। এবারের সম্মেলনেও এসব শরণার্থীর অনেকে অংশ নিয়েছেন।
সম্মেলন উপলক্ষে পুরোনো এ বিমানবন্দরটিকে সাজানো হয় ভিন্ন সাজে। হ্যাঙ্গার-৭ নামে বিমানবন্দরের যে জায়গাটিতে এ সম্মেলনটি হচ্ছে সেখানে একটি সময় আকাশ থেকে নেমে আসা বিমান রাখা হতো। আর সেখানে বসেই বিশ্বের আট শতাধিক বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার প্রতিনিধি পৃথিবী বদলের স্বপ্নের কথা শুনছেন।
জাতিসংঘ-ঘোষিত এসডিজি লক্ষ্য পূরণে সামাজিক ব্যবসা, বিশ্ব তারুণ্য আর প্রযুক্তি—এ তিনটি বড় শক্তি উল্লেখ করে ইউনূস বলেন, এ তিন শক্তিকে এক সুতোয় বাঁধতে হবে। তরুণ প্রজন্মকে উদ্দেশ করে তিনি তাঁর ভিডিও বার্তায় বলেন, প্রত্যেক মানুষই একজন উদ্যোক্তা। প্রত্যেকেরই রয়েছে অসম্ভব উদ্ভাবনী চিন্তাশক্তি। তাই চাকরির পেছনে ছুটে নিজের সেই ক্ষমতাকে নষ্ট না করে ভিন্ন চিন্তা করতে হবে। সামাজিক ব্যবসা ধারণা সেই চিন্তার পথ খুলে দেবে।
উদ্বোধনী দিনে স্বাগত বক্তব্য দিতে গিয়ে বাংলাদেশের ইউনূস সেন্টারের নির্বাহী পরিচালক লামিয়া মোরশেদ বলেন, ‘সামাজিক ব্যবসার মাধ্যমে অসম্ভবকে সম্ভব করতে কাজ করে যাচ্ছি আমরা।’
সম্মেলনের উদ্বোধনী দিনে আরও বক্তব্য দেন বৈশ্বিক সামাজিক ব্যবসা সম্মেলনের প্রধান হেনজ রিটজ, ফ্রান্সভিত্তিক ডানোনের প্রধান নির্বাহী অ্যামানুয়েল ফেবার, মনোবিজ্ঞানী তানিয়া সিনগার।
সম্মেলনে বাংলাদেশের বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার ৬৬ জন প্রতিনিধি অংশ নিচ্ছেন। যাঁদের মধ্যে রয়েছেন ব্যবসায়ী, শিক্ষক, সাংবাদিক, বেসরকারি উন্নয়নকর্মী, গবেষক ও শিক্ষার্থী।
এদিকে সম্মেলনের দ্বিতীয় দিন সকালেও অংশগ্রহণকারীদের উদ্দেশে ইউনূসের উদ্বোধনী বক্তব্যটি পুনরায় প্রচার করা হয়। এদিন বাংলাদেশ থেকে সারা বিশ্বে সামাজিক ব্যবসার প্রসার নিয়ে আলোচনায় অংশ নেন গ্রামীণ টেলিকম ট্রাস্টের ব্যবস্থাপনা পরিচালক পারভীন মাহমুদ, গ্রামীণ টেলিকমের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আশরাফুল হাসান, ইউনূস সেন্টারের মহাব্যবস্থাপক আমীর খসরু প্রমুখ।