সরকারি সংস্থা

পরিসংখ্যানে পিছিয়ে বিবিএস

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস)
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস)

চলতি অর্থবছরে মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য ঠিক করেনি চীন। জিডিপির প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য নেই বলে গত মে মাসে ঘোষণা দিয়েছে দেশটির সরকার। কারণ, করোনার উৎপত্তিস্থলের দেশটির অর্থনীতি কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে, তা ঠিক করা সম্ভব হচ্ছে না। করোনার এই বেহাল অবস্থার মধ্যেও চীনের ন্যাশনাল ব্যুরো অব স্ট্যাটিসটিকস ত্রৈমাসিক জিডিপি গণনা থামিয়ে রাখেনি। জানুয়ারি-মার্চ সময়ে চীনের জিডিপি আগের বছরের একই সময়ের চেয়ে সংকুচিত হয়েছে। আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় প্রবৃদ্ধি ৬ দশমিক ৮ শতাংশ কমে গেছে। তারপরও চীন অর্থনীতির গতিধারার সঠিক তথ্য-উপাত্ত জানতে চায়।

অর্থনীতির গতিধারা জানতে পার্শ্ববর্তী ভারতও তিন মাস পরপর জিডিপি গণনা করে থাকে। এ ছাড়া মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্যসহ বিশ্বের উন্নত দেশগুলোতেও প্রান্তিকভিত্তিক জিডিপি গণনা করা হয়। কিন্তু বাংলাদেশে বছরে একবার জিডিপি গণনা করা হয়। ফলে অর্থবছরের শেষ প্রান্তিকে অর্থনীতিতে করোনার ধাক্কা লাগলেও সেটির প্রকৃত চিত্র উঠে আসেনি।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সাময়িক হিসাবে, গত ২০১৯-২০ অর্থবছরে জিডিপির প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৫ দশমিক ২৪ শতাংশ। অর্থনীতিবিদ ও গবেষণা সংস্থাগুলো বলছে, করোনার ক্ষয়ক্ষতির প্রকৃত চিত্র জিডিপির হিসাবে আসেনি। এ কারণে জিডিপির এ প্রবৃদ্ধিকে প্রশ্নবিদ্ধ বলা হচ্ছে। পরিসংখ্যান ব্যুরোর সক্ষমতা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন গবেষকেরা।

তাহলে প্রকৃত চিত্র কীভাবে পাওয়া সম্ভব? উত্তর হলো ভারত, চীনসহ উন্নত দেশের মতো প্রান্তিকভিত্তিক জিডিপি গণনা করা। বিবিএস সূত্রে জানা গেছে, তিন–চার বছর আগে বিবিএস প্রান্তিকভিত্তিক জিডিপির হিসাব দেওয়ার পরিকল্পনা করেছিল। এ জন্য যুক্তরাজ্যের উলস্টার বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক এস আর ওসমানীকে দিয়ে একটি পটভূমিপত্র তৈরি করা হয়েছিল। জিডিপির ভিত্তিবছর ২০১৫-১৬ করার পাশাপাশি প্রান্তিকভিত্তিক জিডিপি গণনারও উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু এরপর আর কোনো অগ্রগতি নেই। পরিকল্পনা মন্ত্রণালয় জিডিপি প্রান্তিকভিত্তিক হিসাব করার প্রস্তাব এখনো অনুমোদন দেয়নি। এদিকে অষ্টম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনার খসড়ায় প্রান্তিকভিত্তিক জিডিপির হিসাবের প্রস্তাব করা হয়েছে। একসময় জেলাওয়ারি জিডিপির হিসাব করত বিবিএস। এতে কোন জেলা এগিয়ে আছে, কোন জেলা পিছিয়ে আছে, তা জানা যেত। প্রায় দুই দশক আগে জেলাভিত্তিক জিডিপির হিসাব করাও বন্ধ করে দেওয়া হয়।

জানতে চাইলে অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেন প্রথম আলোকে বলেন, ‘নীতিনির্ধারকদের মধ্যে জিডিপির প্রান্তিকভিত্তিক হিসাবের চাহিদা নেই। ফলে বিবিএস কর্মকর্তাদের মধ্যেও তাগিদ নেই। নীতিনির্ধারকদের মধ্যে যদি হালনাগাদ তথ্য-উপাত্ত পাওয়ার উপলব্ধি না থাকে, তাহলে স্বজনতোষণ ও রাজনৈতিক বিবেচনায় প্রভাবিত হয়ে তথ্য-উপাত্ত তৈরি হবে। দারিদ্র্য ও কর্মসংস্থান পরিস্থিতি জানার ক্ষেত্রেও একই অবস্থা বিরাজমান। তিনি আরও বলেন, বিবিএসে যে দক্ষ কর্মী নেই, তা নয়। তবে দক্ষ নেতৃত্বের অভাব আছে। তাঁদের পেশাদারি মনোভাব নেই।

বিবিএসের কার্যক্রম কতটা দক্ষতার সঙ্গে চলছে, তার কিছু উদাহরণ দেওয়া যেতে পারে। যেমন গত তিন বছরে দেশের শ্রমশক্তির নতুন কোনো জরিপ করতে পারেনি সংস্থাটি। ২০১৫-১৬ ও ২০১৬-১৭ অর্থবছরে পরপর দুই বছর ত্রৈমাসিক শ্রমশক্তি জরিপ করার পর তা বন্ধ হয়ে যায়। বিবিএস থেকে প্রান্তিকভিত্তিক শ্রমশক্তি জরিপ অব্যাহত রাখার প্রস্তাব পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হলেও তিন বছর ধরে তা আটকে থাকে। সম্প্রতি পরিকল্পনা মন্ত্রণালয় থেকে কিছু বিষয়ে বিস্তারিত জানতে চেয়ে ওই ফাইল আবার বিবিএসে ফেরত পাঠানো হয়েছে বলে জানা গেছে। ত্রৈমাসিক ভিত্তিতে শ্রমশক্তি জরিপ অব্যাহত থাকলে গত এপ্রিল থেকে জুনে করোনার কারণে কত মানুষ বেকার হয়েছেন, তা জানা যেত। কারণ, সবকিছু বন্ধ থাকায় ওই সময়ে বিভিন্ন খাতে বিপুলসংখ্যক মানুষ বেকার হয়েছেন।

এদিকে পাঁচ বছর পরপর খানা আয় ও ব্যয় জরিপ করে থাকে বিবিএস। সর্বশেষ ২০১৬ সালে এই জরিপ হয়েছে। পরবর্তী জরিপটি ২০২১ সালে করা হবে। করোনার কারণে গত এপ্রিল-জুন সময়ে দারিদ্র্য হার বেড়ে গেছে বলে বিভিন্ন বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠানের জরিপে উঠে এসেছে। কিন্তু বাংলাদেশ সরকারের একমাত্র পরিসংখ্যান সংস্থা হিসেবে বিবিএস এই নিয়ে কোনো জরিপ করেনি। ফলে গরিব মানুষের সংখ্যা কত বাড়ল, সংস্থাটির হাতে সে সম্পর্কে প্রকৃত কোনো তথ্য নেই। বিবিএস সূত্রে জানা গেছে, এখন সংস্থাটি কর্মসংস্থান ও দারিদ্র্য পরিস্থিতি নিয়ে একটি ত্বরিত জরিপ করার চিন্তাভাবনা করছে।

দেশের ধনী-গরিবের আয়-ব্যয়, জীবনযাত্রা কেমন, তার কোনো পরিসংখ্যান নেই। ন্যাশনাল হাউসহোল্ড ডেটাবেইস তৈরির জন্য ২০১৩ সালে একটি চার বছর মেয়াদি প্রকল্প নেওয়া হয়েছিল। এখনো সেই ডেটাবেইস তৈরি করা সম্ভব হয়নি। মাঠপর্যায় থেকেও কোনো তথ্য–উপাত্ত সংগ্রহ করা হয়নি। এ কারণে প্রকল্পটির মেয়াদ ২০২১ সাল পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে। অথচ এই ডেটাবেইস থাকলে করোনায় ক্ষতিগ্রস্তদের সরকার যে নগদ সহায়তা দেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছে, তা সঠিক লোকের হাতে পৌঁছে দেওয়া যেত।

পরিসংখ্যান ও তথ্য ব্যবস্থাপনা বিভাগের সাবেক সচিব রীতি ইব্রাহীম প্রথম আলোকে বলেন, পরিসংখ্যান ও তথ্য ব্যবস্থাপনা বিভাগ ভেঙে দেওয়া উচিত। বিবিএস যখনই কোনো উদ্যোগ নেয়, তাতে বাগড়া দেওয়াই যেন এই বিভাগের কাজ। বিবিএসকে গাইড করার লোক নেই। বিবিএসে পেশাদারি আনা উচিত। বিবিএসে পরিসংখ্যানবিদের সংখ্যা তুলনামূলক কম। সেখানে পরিসংখ্যানবিদের সংখ্যা বাড়ানো উচিত।

জানা গেছে, বিবিএসের বেশির ভাগ সমীক্ষা-জরিপ প্রকল্পভিত্তিক। নিয়মিতভাবে সমীক্ষা করার জন্য রাজস্ব বাজেট থেকে টাকা খুব একটা মেলে না। আবার মাঠপর্যায়ে তথ্য সংগ্রহ করে ফলাফল প্রকাশ করতে আরও এক–দুই বছর সময় লাগে। ফলে তথ্য-উপাত্তের সময়োপযোগিতা থাকে না। বিবিএসে জনবলের ঘাটতিও আছে।

সরকারের বিভিন্ন মেয়াদি পরিকল্পনা করে থাকে পরিকল্পনা কমিশনের সাধারণ অর্থনীতি বিভাগ (জিইডি)।এই বিভাগের সদস্য শামসুল আলম প্রথমআলোকে বলেন, ‘পরিকল্পনা করতে গিয়ে তথ্য–উপাত্তের ঘাটতি সবচেয়ে বেশি ভোগায়।হালনাগাদ তথ্য না থাকলে সঠিক পরিকল্পনা করা যায় না।বিবিএসের কাছ থেকে তিন–চার বছরের পুরোনো তথ্য-উপাত্ত পাওয়া যায়।কিন্তু এর মাঝে পরিস্থিতি বদলে যায়।’